শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

সংস্কৃতির জাতীয় বাতিঘর : শিল্পকলা একাডেমির ইতিহাস ও সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক জাগরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৫১ অপরাহ্ণ
সংস্কৃতির জাতীয় বাতিঘর : শিল্পকলা একাডেমির ইতিহাস ও সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক জাগরণ

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, মননশীলতা এবং সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের এক জীবন্ত মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত পথ বেয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল বাঙালির সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাঙালি সংস্কৃতিই স্বৈরাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

 

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্গঠনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য, সংগীত, নাটক এবং চারুকলাকে অবদমিত ও বিকৃত করার যে সুগভীর ষড়যন্ত্র চলেছিল, স্বাধীন স্বদেশে তার অবসান ঘটিয়ে একটি প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও সৃষ্টিশীল সমাজ বিনির্মাণ ছিল সময়ের দাবি। এই মহান জাতীয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে, একটি স্বাধীন জাতির পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক চর্চার কোনো বিকল্প নেই।

 

তাঁরই দূরদর্শী নির্দেশনায় এবং অনুশাসনে ১৯৭৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে “বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আইন, ১৯৭৪” পাস করা হয়। এই ঐতিহাসিক আইন পাসের মাধ্যমে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের প্রথম এবং একমাত্র স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই একাডেমি বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি, নাটক, সংগীত, নৃত্য, চারুকলা, আবৃত্তি এবং আবহমান বাংলার অমূল্য লোকজ ঐতিহ্যকে সুসংগঠিতভাবে রক্ষা, বৈজ্ঞানিক উপায়ে চর্চা ও আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক মহান ব্রত গ্রহণ করে। এটি কোনো সাধারণ সরকারি দপ্তর বা কেবলই প্রশাসনিক ভবন নয়, বরং এটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ এবং সৃজনশীলতার এক অনন্য জাতীয় বাতিঘর।

শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন ও উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় উজ্জীবিত। ঢাকাকেন্দ্রিক উচ্চবিত্তের বিনোদনের গ-ি পেরিয়ে শিল্প-সংস্কৃতিকে দেশের আপামর জনসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং লোকসংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। দেশের নিজস্ব শিল্প ও সংস্কৃতির সামগ্রিক বিকাশ ঘটানো, বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ লোকজ ঐতিহ্য যেমন বাউল গান, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, পালাগান, গম্ভীরা, লাঠিখেলা, পুতুলনাচ সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

 

এর পাশাপাশি নাটক, সংগীত, নৃত্য, চারুকলা ও চলচ্চিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা বৃদ্ধি করা, তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা, নতুন নতুন প্রতিভাবান শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের হাজার বছরের গৌরবময় সংস্কৃতিকে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এই প্রতিষ্ঠান নিরলস কাজ শুরু করে। মূলত দেশের সমস্ত সৃজনশীল মাধ্যমকে এক ছাতার নিচে এনে একটি সমন্বিত “জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র” হিসেবে এই একাডেমিকে কল্পনা করা হয়েছিল, যা আজ বাস্তবে রূপ লাভ করেছে।

রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থল সেগুনবাগিচার এক মনোরম ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক জোনে এই একাডেমির প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। বর্তমানে এটি এক বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন আধুনিক কমপ্লেক্সে রূপান্তরিত হয়েছে, যা দেশের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। এই বিশাল শিল্পকলা কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের জাতীয় নাট্যশালা, সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র, জাতীয় চিত্রশালা, আধুনিক পরীক্ষণ থিয়েটার হল, উন্নত সেমিনার কক্ষ, বিশাল উন্মুক্ত মঞ্চ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, মহড়া কক্ষ, অত্যাধুনিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী সুবিধা এবং প্রশাসনিক ভবন।

 

যদিও স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠাকালীন ভবন নির্মাণের সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব একক নথিতে সহজলভ্য নয়, তবে এটি স্পষ্ট যে বিভিন্ন মেয়াদে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ধাপে ধাপে এই বিপুল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। প্রথমে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে এর যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে জাতীয় নাট্যশালা ও আধুনিক আর্ট গ্যালারি যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে এর পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে পুরো শিল্পকলা কমপ্লেক্সটি কয়েক একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত, যার আনুমানিক পরিমাপ প্রায় ৪ থেকে ৫ একরেরও বেশি।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য শুরু থেকেই বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত বিভাগ গড়ে তোলা হয়েছে। এই বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগ, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগ, চারুকলা বিভাগ, গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগ, লোকসংস্কৃতি বিভাগ, শিশু নাট্য ও প্রশিক্ষণ বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময় বিভাগ। এই বিভাগগুলোর মাধ্যমে সারা বছর ধরে দেশজুড়ে অসংখ্য জাতীয় উৎসব, উচ্চতর কর্মশালা, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের আধুনিক নাট্য আন্দোলনের বিকাশে এবং গ্রুপ থিয়েটার চর্চাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে জাতীয় নাট্যশালা এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে।

 

এই মঞ্চেই নিয়মিতভাবে পরিবেশিত হয়ে আসছে কালজয়ী সব মঞ্চনাটক, ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য, আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব, শিশু নাট্যোৎসব, জাতীয় আবৃত্তি অনুষ্ঠান এবং দৃষ্টিনন্দন নৃত্যনাট্য। দেশের শত শত নাট্যদল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এই একাডেমিকে কেন্দ্র করেই তাদের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও একাডেমি এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল পাঠানো এবং বহির্বিশ্বের প্রখ্যাত শিল্পীদের বাংলাদেশে এনে যৌথ প্রদর্শনীর মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের এক অনন্য সাংস্কৃতিক কূটনীতি পরিচালনা করছে।

এই মহান প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব প্রদানে ১৯৭৪ সালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত দেশের বহু বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও নাট্যজন মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একাডেমির গৌরবময় বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছেন।

 

১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব মোস্তফা মনোয়ার। তাঁর পর একে একে এই গৌরবময় পদে আসীন হন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নাট্যজন ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সংগঠক মোস্তফা মনোয়ার (দ্বিতীয় মেয়াদে), বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আশরাফ সিদ্দিকী, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সংস্কৃতিজন কামরুল হাসান, বিশিষ্ট অভিনেতা ও নাট্যজন মমতাজউদ্দীন আহমদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নাট্যব্যক্তিত্ব ইনামুল হক, সংস্কৃতিজন আতাউর রহমান, বরেণ্য নাট্যকার ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ, বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন, সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব লিয়াকত আলী লাকী, খ্যাতিমান নাট্যনির্দেশক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ জামিল আহমেদ। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে কবি ও লেখক রেজাউদ্দিন স্টালিন এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দায়িত্ব পালন করছেন। এই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে ভারপ্রাপ্ত ও পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী গুণীজনদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ মেধা ও মনন দিয়ে একাডেমিকে আজকের এই মহিরুহে পরিণত করেছেন।

জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার ছিল সংস্কৃতিকে ঢাকা কেন্দ্রিকতার বাইরে নিয়ে গিয়ে জেলা ও প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া। ১৯৭৪ সালের মূল আইনেই জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে শিল্পকলা পরিষদ গঠনের সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে জেলা শিল্পকলা পরিষদের সুনির্দিষ্ট গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হওয়ার পর সারা দেশে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে।

 

বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলাতেই জেলা শিল্পকলা একাডেমি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সাধারণত প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসক পদাধিকারবলে এই পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং একজন সার্বক্ষণিক কালচারাল অফিসার অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এর প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তদারকি করেন। জেলা পর্যায়ের এই একাডেমিগুলো জেলাভিত্তিক সংগীত শিক্ষা, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য শিক্ষা, আবৃত্তি প্রশিক্ষণ, নাট্যচর্চা, চিত্রাঙ্কন, লোকসংগীত সংরক্ষণ, জাতীয় দিবসসমূহের যথাযোগ্য উদযাপন এবং শিশু-কিশোরদের মাঝে সৃজনশীল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সজীব ও প্রাণবন্ত রাখছে।

এই দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক বিস্তারের ইতিহাসে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরার অবদান এবং সেখানকার জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত অত্যন্ত গৌরবময়, বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং এক অনন্য ঐতিহাসিক অধ্যায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সাল থেকেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সাতক্ষীরাতেও সীমিত পরিসরে এবং সাময়িকভাবে বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক কর্মকা- শুরু হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে যেখানে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন ওখানে একটি টিনশেডে শিল্পকলা একাডেমির কাজ পরিচালিত হতো।

 

তবে দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরার স্থানীয় সংস্কৃতি কর্মী, নাট্যজন এবং সাধারণ মানুষের দাবি ছিল একটি স্থায়ী ও সুর্দশন শিল্পকলা ভবন নির্মাণের। সেই স্বপ্ন পূরণের ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণটি আসে ২০০১ সালের দিকে। এ সময় জেলা শিল্পকলা ভবন নির্মাণের জন্য বাজেট এলেও স্থানাভাবে বাজেটের টাকা ফিরে যাবার উপক্রম হয়। এ সময় সাতক্ষীরার সংস্কৃতিজনরা একত্রে বসে একটি সুন্দর স্থান হিসেবে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের পূর্ব দিকের স্থানটি নির্ধারণ করেন। যেহেতু স্থানটি পৌরসভার, সে কারণে পৌরসভা হতে জায়গাটি স্থায়ীভাবে বরাদ্দ না পেলে শিল্পকলা ভবন নির্মাণ সম্ভব নয়।

সাতক্ষীরা জেলা শিল্পকলা একাডেমির আধুনিক ও স্থায়ী ভবন নির্মাণের ইতিহাসে যাঁদের অবদান সবচেয়ে অগ্রগণ্য, এবং যাঁরা পৌর চেয়ারম্যান বরাবর ০৮.০১.২০০২ সালে শিল্পকলা ভবনের জন্য জায়গা চেয়ে আবেদন করেছিলেন তাঁরা হলেন সৈয়দ ইফতেখার আলী, মুনসুর আহমেদ, মুস্তফা লুৎফুল্লাহ, শেখ আজাদ হোসেন বেলাল, মোস্তফা নুরুল আলম, আনিছুর রহিম, অধ্যাপক মোজাম্মেল হোসেন, সরদার আমজাদ হোসেন, নাসরীন খান লিপি, শেখ মমিনুর রহমান, আমজাদ হোসেন, সৈয়দ এখলেছার আলি বাচ্চু, আবু আফফান রোজবাবু, মঞ্জুরুল হক প্রমুখ। এঁদেরই অক্লান্ত পরিশ্রম, আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের ফলে সাতক্ষীরায় স্থায়ী শিল্পকলা ভবন নির্মাণের পথ সুগম হয়।

 

২০০২ সালের দিকে তৎকালিন সাতক্ষীরা পৌরসভার মেয়র শেখ আশরাফুল হকের পক্ষ থেকে এবং তাঁর আন্তরিক সহযোগিতায় সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে শিল্পকলা ভবনের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। এই জমি গ্রহণের ক্ষেত্রে তৎকালীন স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্য তথা জামায়াতে ইসলামীর সদর আসনের এমপি আব্দুল খালেক মন্ডল মহোদয়ের বিশেষ অনুমতি এবং আনুষ্ঠানিক সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। ১১.০২.২০০২ তারিখে আইন-শৃঙ্খলা মিটিং এ প্রতিমন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুলু’র উপস্থিতিতে পৌরসভার চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেন সেই মর্মে চেয়ারম্যান তার সকল কাউন্সিলরদের নিয়ে ১৮.০২.২০০২ মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ২৫.০২.২০০২ তারিখে ০.৩৩ শতক (এক বিঘা) জমি জেলা প্রশাসক/ সভাপতি বরাবর দানপত্র দলিল করে দেন।

সংসদ সদস্যের সেই লিখিত সুপারিশ ও অনুমোদনের প্রেক্ষিতে এবং শিল্পকলা একাডেমির জন্য পৌরসভার শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের পূর্ব-দক্ষিণ কোণের সেই নির্দিষ্ট ০.৩৩ একর জায়গার ওপর জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে গতি পায়। পরবর্তীতে সেই নির্ধারিত ভূমির ওপরই আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয় সাতক্ষীরা জেলা শিল্পকলা একাডেমির বহুতল ভবন, অডিটোরিয়াম এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। আজ সাতক্ষীরার শিল্পকলা ভবনটি জেলার সমস্ত নাটক, সংগীত, চারুকলা, সাহিত্য চর্চা এবং প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলনের প্রধান মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তার কেন্দ্রীয় কমপ্লেক্স এবং ৬৪ জেলার শাখাগুলোর মাধ্যমে বছরে অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান অত্যন্ত সফলতার সাথে আয়োজন করে চলেছে। এর মধ্যে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে আয়োজিত হচ্ছে জাতীয় নাট্যোৎসব, লোকসংস্কৃতি উৎসব, জাতীয় শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক উৎসব, চারুকলা প্রদর্শনী, জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসব এবং রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী।

 

এছাড়াও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মহান স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের মতো সমস্ত জাতীয় ও ঐতিহাসিক দিবসে একাডেমি দেশব্যাপী বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে নতুন প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আজ কেবল ইট-পাথরের কোনো অট্টালিকা নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, মেধা, মনন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিনশ্বর জাতীয় প্রতীক যা যুগ যুগ ধরে বাঙালির আত্মপরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে সমুন্নত রাখছে।

 

জেলা শিল্পকলা একাডেমির সদস্য সচিব ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এ পর্যন্ত যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁরা হলেন :-
বাবু বিজয় দেবনাথ (সার্বিক দায়িত্ব প্রাপ্তি) ১৯৭৬, আব্দুল মোতালেব ১৯৮০, মো আজিজার রহমান ১৯৮১, মীর মুনজুর আলী সাধারণ সম্পাদক, শফিকুল ইসলাম এনডিসি সদস্য সচিব, বাবু পরেশ চন্দ্র রায় এনডিসি সদস্য সচিব, মুস্তফা লুৎফুল্লাহ সাধারণ সম্পাদক, জাকির হোসেন কামাল এনডিসি সদস্য সচিব, দেলোয়ার হায়দার এনডিসি সদস্য সচিব, আবুল হাসান হাদী সাধারণ সম্পাদক, শাব্বির ইকবাল এনডিসি সদস্য সচিব, একেএম আজাদুর রহমান এনডিসি সদস্য সচিব, মো তবিবুর রহমান এনডিসি সদস্য সচিব, এ টি এম আজহারুল ইসলাম এনডিসি সদস্য সচিব, মো সাদেকুর রহমান এনডিসি সদস্য সচিব, মো আবু নাসার উদ্দীন এনডিসি সদস্য সচিব, খন্দকার মো রেজাউল করিম এনডিসি সদস্য সচিব, বাবু পিন্টু ব্যাপারী এনডিসি সদস্য সচিব, অবদিয় মার্ডী এনডিসি সদস্য সচিব, খন্দকার মো রেজাউল করিম এনডিসি সদস্য সচিব, মো রবিউল হাসান এনডিসি সদস্য সচিব, নূুর আহমেদ মাসুম এনডিসি সদস্য সচিব, শেখ মোসফিকুর রহমান মিলটন সদস্য সচিব ২০.১২. ২০১৩, শেখ মোসফিকুর রহমান মিলটন সাধারণ সম্পাদক ১৯.১০.২০২০ হতে ০৫.০৮.২০২৪ পর্যন্ত।

 

দেশের পট পরিবর্তনের পর অদ্যাবধি জেলা শিল্পকলা একাডেমির কোনো নির্বাহী কমিটি নাই। তবে দেশের বিভিন্ন জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ‘কালচারাল অফিসার’ নিয়োগ দেওয়ায় তারই ধারাবাহিকতায় সাতক্ষীরা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে কালচারাল অফিসার হিসেবে ফাইজা হোসেন অন্বেষাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি প্রায় দু’বছর যাবত সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের বিকাশ সাধনে যথাযথ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

লেখক: সাবেক ব্যাংকার, সমাজকর্মী ও গবেষক। সুত্র: নেট, আবু আফফান রোজবাবু ও শেখ মুশফিকুর রহমান মিলটন।

 

Ads small one

সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

এম শফিকুল ইসলাম: পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। অসতর্কতার কারণে শিশুদের অকাল মৃত্যু নিয়ে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ডিজাস্টার ফোরাম জেলা ভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। পরিসংখ্যানে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে।

 

পরিসংখ্যানে তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ দেবাহাটা উপজেলার দক্ষিণ সখিপুর গ্রামের একটি মাছের ঘেরের পানিতে পড়ে আসমাউল হুসনা (২) নামে এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ১৪ জুলাই তালা উপজেলার ধামসা ঢ্যামসাখোলা গ্রামের বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে রুমানা খাতুন (৫) নামক এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে পৃথক দুটি ঘটনায় শান্ত (৫) এবং ফাহিম (৩) নামের দুটি শিশুর পুকুর ও বেতনা নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

 

২২ মে কালীগঞ্জ উপজেলার মাগরি গ্রামে পুকুরে গোসল করতে নেমে জান্নাতুল (১১) নামে এক শিশু প্রাণ হারায়। একই উপজেলার ২৩ মার্চ সন্ন্যাসীচক গ্রামের নানা বাড়িতে এসে মাছের ঘেরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনি, কলারোয়া, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে একই দিনে পৃথক ঘটনায় ৪টি শিশু ও ১ জন কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ডিজাস্টার ফোরামের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ জন শিশু প্রান হারিয়েছে। ডুবে মৃত্যুর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন ছেলে ও কন্যাশিশু রয়েছে। ডিজাস্টার ফোরামের আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১ হাজার ৩১১ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৮৪ জন। যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন।

 

মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই দেশব্যাপী ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়েছে। যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল,’ ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইট’ বাস স্্েরাতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান”।

 

ডব্লিউএইচও এর পরিসংখ্যান বলেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞমহলের দাবি, গ্রাম, শহর ও নগরকেন্দ্রীক পরিবারদের সচেতনতার অভাব, গাফিলতি, অন্যমনস্ক এবং অজ্ঞতার অভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

 

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী