সম্পাদকীয়/ সার কালোবাজারি ও কৃত্রিম সংকট
সরকারি গুদামে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সারের মজুদ থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট ও আকাশচুম্বী দামের খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রোপা আমন মৌসুমের এই ব্যস্ত সময়ে সারের জন্য কৃষকদের দ্বারে দ্বারে ঘোরা এবং বস্তাপ্রতি চার থেকে সাড়ে চার শ’ টাকা অতিরিক্ত গুনতে বাধ্য হওয়া কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও মনিটরিং ব্যবস্থার চরম স্থবিরতারই প্রতিফলন। যখন প্রান্তিক কৃষক চড়া দামে না কিনলে সার পাচ্ছেন না, তখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘কাগজে-কলমে উদ্বৃত্ত মজুদের’ পরিসংখ্যান কার্যত তাদের জন্য এক উপহাস ছাড়া আর কিছু নয়।
চলতি বছর প্রকৃতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট কৃষকের অনুকূলে ছিল না। বিদ্যুতের লোডশেডিং এবং ডিজেল-সংকটের কারণে সেচ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে আমনের বীজতলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা সামলে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে যাঁরা ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, তাঁদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। সার বিতরণের নতুন নীতিমালা নিয়ে পুরোনো ডিলারদের অসহযোগিতা, গুদাম থেকে খোলাবাজারে সার পাচার এবং রাজনৈতিক প্রভাবে সার স্থানান্তরের যে অভিযোগ উঠে এসেছে, তা কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের ভাষ্যমতেÑগুদামে মজুদ থাকা আর কৃষকের হাতে সুলভে সার পৌঁছানো এক কথা নয়। সারে প্রদত্ত সরকারি কোটি কোটি টাকার ভর্তুকি যেন কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর পকেটে না যায়, তা নিশ্চিত করার দায়ভার পুরোপুরি সরকারের।
কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবেÑএ স্রেফ কোনো স্লোগান হতে পারে না। চাল উৎপাদনের সিংহভাগ জোগানদাতা ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকেরা এভাবে শোষিত হলে তার প্রভাব শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং শহরের খাদ্যনিরাপত্তা ও চালের বাজারে তা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। প্রশাসনিক শিথিলতা ঝেড়ে ফেলে অনতিবিলম্বে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের টহল জোরদার করতে হবে। অসাধু মজুতদার ও পাচারকারী ডিলারদের লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে সরাসরি কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোর বিকল্প নেই। জরুরি ভিত্তিতে বিতরণ ব্যবস্থার এই গলদ দূর না করলে সামগ্রিক আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন যে সুদূরপরাহত হবেÑতা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।










