সম্পাদকীয়/ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজন কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগ
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য দিন দিন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। সম্প্রতি সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন এলাকায় বনকর্মীদের তৎপরতায় শিকারিদের ফাঁদ থেকে একটি চিত্রা হরিণ উদ্ধার এবং একই সঙ্গে ১২টি ছিটকা ফাঁদ জব্দের ঘটনাটি যেমন স্বস্তিদায়ক, তেমনই বনের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগায়। এর ঠিক পরপরই, তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আড়পাঙ্গাসিয়া নদীতে অবৈধভাবে মাছ শিকারের অভিযোগে পাঁচ জেলের গ্রেপ্তার ও কারাদ- প্রমাণের পাশাপাশি এটিও স্পষ্ট করে যে, কতিপয় অসাধু চক্রের কারণে সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতি কতটা অরক্ষিত।
সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান হলো বাঘ ও হরিণ। চোরা শিকারিরা বনের গভীরে ছিটকা বা মালা ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে তার মাংস লোকালয়ে চড়া দামে বিক্রি করছে। এই অপতৎপরতা কেবল হরিণের সংখ্যাই কমাচ্ছে না, বরং বাঘের প্রধান খাদ্যসংকট তৈরি করে বাঘকেও লোকালয়ে চলে আসতে বাধ্য করছে। শুধু তাই নয়, হরিণের জন্য পাতা এই মরণফাঁদ অনেক সময় বাঘের মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়ায়। খাদ্যশৃঙ্খল এভাবে ভেঙে পড়লে সুন্দরবনের চিরচেনা স্বরূপ ধ্বংস হতে বাধ্য। অন্যদিকে, জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনের সব নদী ও খালে মাছের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। এই নিষিদ্ধ সময়ে বিষপ্রয়োগ কিংবা কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ শিকার বনের মৎস্য ভা-ারকে চিরতরে উজাড় করে দেওয়ার শামিল।
নিষেধাজ্ঞা ও নিয়মিত টহল সত্ত্বেও চোরা শিকারি ও অসাধু জেলেদের এই দুঃসাহস বন্ধ না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বন বিভাগের বর্তমান জনবল দিয়ে প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটারের এই বিশাল বনের প্রতিটি কোণায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে সর্বাগ্রে বন বিভাগের লজিস্টিক সাপোর্ট, আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন ড্রোন ও স্মার্ট পেট্রোলিং) এবং টহল ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে।
তবে কেবল আইন প্রয়োগ বা সাজা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি, যাতে তারা বনের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে। একই সঙ্গে লোকালয়ে হরিণের মাংসের বেচাকেনা ও ব্যবহার বন্ধে কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন; কারণ চাহিদা বন্ধ না হলে জোগান বন্ধ করা কঠিন। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা কোনো একক সংস্থার কাজ নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। বনের বাঘ, হরিণসহ সামগ্রিক জলজ ও বনজ সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সচেতনতা ও প্রতিরোধই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।






