বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩

সাগরদাঁড়ী দত্তবাড়ির প্রাচীন স্থাপত্য সংস্কার না করায় জৌলুস হারাচ্ছে মধুপল্লী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
সাগরদাঁড়ী দত্তবাড়ির প্রাচীন স্থাপত্য সংস্কার না করায় জৌলুস হারাচ্ছে মধুপল্লী

এম আব্দুল করিম, কেশবপুর (যশোর): যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ীতে কপোতাক্ষ তীরে অবস্থিত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি বিজড়িত প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনগুলো দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় জৌলুস হারাচ্ছে মধুপল্লী, আর সরকার হারাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব।

প্রায় ৪ একর ৩৩ শতক জমির ওপর অবস্থিত মধুকবির জমিদার বাড়ির বিভিন্ন স্থাপত্য ও নিদর্শন নিয়ে স্থাপিত মধুপল্লী নানাবিধ সংকটে নিজের জৌলুস হারাতে বসেছে। পর্যটকদের বিনোদনের খোরাক মেটাতে এখানকার ছোট-বড় একাধিক স্থাপনা, মন্দির ও পুকুর ঘাট সংস্কার করা জরুরী হয়ে পড়েছে। ১৮৬৫ সালে তৎকালিন সরকার কবি ভক্তদের থাকার জন্যে চার শয্যা বিশিষ্ট একটি রেস্টহাউজ নির্মাণ করে। এই রেস্ট হাউজের একটি রুমেই করা হয় পাঠাগার।

 

১৯৬৬ সালে কবির বাড়িটি প্রতœতত্ত্ব বিভাগের কাছে সরকার ন্যস্ত করে। প্রতœতত্ত্ব বিভাগ জমিদার বাড়ি, পুকুর সংস্কারসহ পুরো এলাকাটি পাঁচিল দিয়ে ঘিরে ফেলে। ১৯৯৮ সালে এর পুনঃসংস্কার কাজ শুরু হয়ে ২০০১ সালে শেষ হয়। এরপর দীর্ঘ দিনে দত্তবাড়ি, মন্দিরসহ প্রাচীন নিদর্শনগুলো সংস্কার না হওয়ায় এর জানালা, দরজা ভেঙে যাচ্ছে। ছাদেও ফাটল ধরেছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সংরক্ষিত আসবাবপত্রগুলো। কবির প্রসূতিস্থান খ্যাত ঘরটি এখন তুলসি গাছের ঠিকানা।

মধুপল্লীর উন্নয়নে ১০ জুন ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিখিল রঞ্জন রায় স্বাক্ষরিত বিটিবি যশোর-পর্যটন/২০১৮(৬৪২)/১৯৮০ নং স্মারকে ১ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু অজানা কারনে বরাদ্ধ বাস্তবায়ন হয়নি। ৬/৭ মাস আগে মধুমেলাকে সামনে রেখে নামে মাত্র ঘষামাজার কাজ হলেও সংশ্লিষ্টদের নজর নেই মুল স্থাপনায়। যার ফলে জরাজীর্ণ এই স্থাপত্য শুধু সৌন্দয্যই হারাচ্ছে না সাথে সরকার, হারাচ্ছে লক্ষ-লক্ষ টাকার রাজস্ব। তাই দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সরকারি রাজস্ব আয়ের একমাত্র পর্যটন কেন্দ্রটি অতি দ্রুত সংস্কারের দাবি এই অঞ্চলের মানুষের।

মধুপল্লীর কাস্টডিয়ান হাসানানুজ্জামান বলেন, মধুমেলায় প্রতি বছর ৫ থেকে ৬ লাখ দর্শণার্থীর আগমন ঘটে থাকে। এছাড়া সারা বছরজুড়ে দেশী বিদেশী পর্যটকরা মধুপল্লী ভ্রমণ করে থাকে। নানা সমস্যার কারণে পর্যটকরা দিনের আলো থাকতেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়। দর্শণার্থীদের বিনোদন মেটাতে ও সরকারি রাজস্ব বাড়াতে মধুপল্লীর উন্নয়ন খুব জরুরী।

প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের রিজিওনাল ডাইরেক্টর (আরডি) মহিদুল ইসলাম বলেন, যশোরের সাগরদাঁড়ি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাড়ি প্রতি বছরেই জন্ম জয়ন্তীর আগে কিছু কাজ করা হয় তবে সাগরদাঁড়িতে যে ভবনগুলো রয়েছে ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরে সেগুলাতে সব ধরনের সংস্কার কাজ করা হবে, এছাড়া মধুপল্লীতে একটি প্রকল্প গ্রহণের কাজ অব্যহত রয়েছে, আশা করি এই মেঘা প্রকল্পের মাধ্যমে এর ব্যপক উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।

Ads small one

ভূমিকম্প রোধ: আগামী প্রজন্মের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতকল্পে দরকার সাজানো পরিবেশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ১০:২৮ অপরাহ্ণ
ভূমিকম্প রোধ: আগামী প্রজন্মের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতকল্পে দরকার সাজানো পরিবেশ

এম শফিকুল ইসলাম

আমাদের দেশে বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়টি ছোট ছোট ভূমিকম্পন অনুভূত হয়েছিল। এই ভূমিকম্পের মাত্রা কম হওয়ায় কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রায় উপরে কোন ভূমিকম্প হলে বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে গ্যাস লাইন, বিদ্যুৎ লাইন ও পানির লাইনে বিস্ফোরণসহ বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। ভূমিকম্পের লক্ষণ দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, বাংলাদেশে ও একদিন বড় ধরনের ভূমিকম্পে আক্রান্ত হয়ে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

অতীতেও এই অঞ্চলে বেশ বড় ধরনের কিছু ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল। প্লেট টেকটোনিক মতবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ টেকটোনিক প্লেটের ওপর অবস্থিত। ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট এর উপরে ইউরেশিয়ান প্লেট এবং পূর্বে বার্মিজ মাইক্রোপ্লেট অবস্থিত। ইন্ডিয়ার প্লেটটি ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরে তিব্বত ও হিমালয়ের দক্ষিণ কিনারায় বাঁকা হচ্ছে। এছাড়া বার্মিজ মাইক্রোপ্লেট প্রতিবছর ২০ মি.মি. গতিতে পশ্চিম দিকে এবং ইন্ডিয়ান প্লেট ৫০ মি.মি. গতিতে উত্তর পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে ইন্ডিয়ান প্লেট বার্মিজ প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে।

 

এ তিন প্লেটের পারস্পরিক সংঘর্ষের ফলেই বাংলাদেশ ভূমিকম্প হচ্ছে। বাংলাদেশের অতি কাছাকাছি রয়েছে ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ ইন্দো অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ান প্লেট। চট্টগ্রাম শহর, কক্সবাজার ও মায়ানমার অবস্থান করছে রাখাইন ফল্ট লাইন, যা এশিয়ান প্লেটের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে এ ফল্ট লাইনের অবস্থা বেশ নাজুক। এ ফল্ট লাইন জাপান ও চীনের প্লেটকে স্পর্শ করে বাংলাদেশের পাশ দিয়ে বঙ্গোপসাগর হয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্তে একবার ভূমিকম্প হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের ওয়াইড কর্পোরেশন নামে জাপানি একটি সংস্থার সঙ্গে ভূমিকম্প বিষয়ে কমপ্রিহেনসিভ ডিসস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম নামক একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্তে যে কোন সময় ৮ পয়েন্ট পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হবে। আর কম দূরত্ব হওয়াই চট্টগ্রামের প্রভাব পড়তে পারে ৭.৫ মাত্রা।

 

বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের কিছু অংশে প্রচন্ড শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হতে পারে। যদি বন্য অঞ্চলটির বিস্তর প্রায় ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। এতে প্রায় ১৪ কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় ১২ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের একদল বিজ্ঞানী গবেষণা করে এ তথ্য পেয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞরা ভূমিকম্পের ঝুঁকির মাত্রা হিসাব করে দেশকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। সে অনুযায়ী সিলেট, ময়মনসিংহ, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, রংপুরের একাংশ পড়েছে সর্বোচ্চ ঝূকিপূণ অঞ্চলের মধ্যে, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম পড়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোনে। বরিশাল খুলনাসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল পড়েছে কোন সুখীপূর্ণ জোনে।

 

কিন্তু তারা ঢাকাকে বিশ্বের কয়েকটি জনবহুল শহরের মধ্যে বিবেচনা করে ভূমিকম্পের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। চলতি মাসের ২২ দিনে অন্তত চারবার নানা মাত্রায় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। কয়েকদিনের মধ্যে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এরকম একাধিকবার ভূমিকম্পে সর্বসাধারণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সবশেষে বলবো জনগণকে সচেতন হতে হবে। আর জনগণ সতর্ক হলেই বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এজন্য সরকারকে বিভিন্ন কর্মসূচী পরিচালনা করতে হবে। আগামী প্রজন্মের বাসযোগ্য বাংলাদেশ আর নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতকল্পে ভূমিকম্পরোধী সাজানো পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

লেখক: নাট্যকর্মী

রোল নম্বরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত মানুষের গল্প

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ১০:২১ অপরাহ্ণ
রোল নম্বরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত মানুষের গল্প

আখলাকুর রহমান

খুব মধ্যরাতে যখন চারপাশ নিঝুম হয়ে আসে, তখন কখনো কি ভেবে দেখেছেন—পড়ালেখার মতো এত কঠিন এবং নিরস একটা বিষয়ে এত তীব্র রোমাঞ্চ কীভাবে লুকিয়ে থাকে? একটা ছেলে কিংবা একটা মেয়ে সারা বছর পড়াশোনা করল, দিনরাত এক করে পরীক্ষার খাতায় কী যেন সব লিখল, তারপর একটা খামবন্দি ফলাফলের জন্য দরদর করে ঘামতে লাগল। এই যে পুরো তীব্র উত্তেজনার একটা খেলা, এই খেলার মূল চাবিকাঠি কিন্তু লুকিয়ে আছে মাত্র গুটিকয়েক সংখ্যার ভেতর।

 

আমরা যাকে খুব সহজ ভাষায় বলি—রোল নম্বর। একটা খাতার ওপর কোনো নাম থাকে না, কোনো ধর্ম থাকে না, কোনো গোত্র থাকে না। অথচ আজ থেকে একশ বছর আগে এই উপমহাদেশে দৃশ্যটা এমন ছিল না। খাতার ওপর মস্ত বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকত পরীক্ষার্থীর নাম। আর সেই নামের আড়ালে চলত এক অদ্ভুত অন্ধকারের খেলা। সেই অন্ধকার তাড়িয়ে প্রতিটি খাতার ওপর সংখ্যার এক জাদুকরী আলো যিনি জ্বেলেছিলেন, তিনি সাতক্ষীরার নলতা গ্রামের এক অতি সাধারণ অথচ অতি অসাধারণ মানুষ—খান বাহাদুর আহছানউল্লা।

১৮৭৩ সালের এক কনকনে শীতের রাতে যখন তিনি এই পৃথিবীতে এলেন, নলতা গ্রামের মেঠোপথ তখনো জানত না যে এই ছেলেটি একদিন পুরো ভারতবর্ষের শিক্ষা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দেবে। তিনি বড় হলেন, পড়াশোনা করলেন এবং একসময় ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষা বিভাগে প্রথম মুসলিম ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিস’ অফিসার হিসেবে যোগ দিলেন। চাকরি পাওয়ার পর তিনি একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন।

 

পরীক্ষার খাতা যখন পরীক্ষকদের টেবিলে যায়, তখন খাতার ওপর জ্বলজ্বল করতে থাকা নামগুলো দেখে পরীক্ষকদের মনস্তত্ত্বে এক প্রচ্ছন্ন পক্ষপাতিত্ব কাজ করে। কার নাম ‘রাম’, কার নাম ‘রহিম’, কে কোলকাতার বাবুদের ঘরের সন্তান আর কে সাতক্ষীরার কাদা-জল মাখা মফস্বলের ছেলে—তা খাতার নাম দেখেই আলাদা করা যেত। ফলে দেখা যেত, মফস্বলের এক প্রান্তিক কিশোর অসামান্য লিখেও কেবল নামের কারণে কম নম্বর পাচ্ছে, আর শহরের কোনো প্রভাবশালী ঘরের সন্তান সাধারণ লিখেও পার পেয়ে যাচ্ছে। মেধার এই অসম লড়াই খান বাহাদুর আহছানউল্লাকে ভীষণভাবে পীড়িত করত। তিনি ভাবলেন, এই প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের একটা শেষ হওয়া দরকার।

 

ঈশ্বরের তৈরি মানুষের মধ্যে জাত-পাত থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের তৈরি খাতার ভেতর মেধার কোনো জাত থাকতে পারে না। তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে এক অদ্ভুত এবং যুগান্তকারী প্রস্তাব পাঠালেন—পরীক্ষার খাতা থেকে পরীক্ষার্থীর নাম পুরোপুরি মুছে দিতে হবে। সেখানে থাকবে কেবল একটা গোপন ‘সংকেত নম্বর’ বা ‘রোল নম্বর’। পরীক্ষক খাতা কাটার সময় জানবেনই না তিনি কার ভাগ্য নির্ধারণ করছেন, তাঁর সামনে থাকবে শুধু মেধার নির্যাস। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ এবং খোদ ব্রিটিশ সরকারের বড় বড় কর্তারা এই প্রস্তাবে হেসেই খুন। তারা ভাবলেন, নাম ছাড়া আবার পরীক্ষা হয় নাকি! কিন্তু এই নরম স্বভাবের মানুষটি ভেতরে ভেতরে ছিলেন প্রচ- জেদি। তিনি একা হাতে সমস্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর তীব্র বিরোধিতার দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিলেন। অবশেষে ভারতবর্ষের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রথম চালু হলো পরীক্ষার খাতায় রোল নম্বর লেখার নিয়ম।

এই একটিমাত্র নিয়মের কারণে রাতারাতি বদলে গেল কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভাগ্য। নামহীন সেই খাতাগুলোর ভেতর দিয়ে মফস্বলের অবহেলিত ছেলেমেয়েরা তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে মেধার শীর্ষে উঠে আসতে লাগল। আজ আমরা যখন যেকোনো পরীক্ষার খাতায় নিজেদের রোল নম্বরটি লিখি, আমরা কেউ হয়তো মনে রাখি না যে এই ছয়-সাতটা সংখ্যার আড়ালে সাতক্ষীরার এক চিরস্মরণীয় মানুষের কতটা জেদ, কতটা লড়াই আর কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল। ১৯৬৫ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি তিনি যখন নলতার মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন হয়তো চারপাশের প্রকৃতিও নীরবে বলেছিল, এই মানুষটি চিরকাল বেঁচে থাকবেন প্রতিটি পরীক্ষার্থীর কলমের ডগায়, প্রতিটি নামহীন খাতার পাতায়। লেখক : উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা

সাতক্ষীরার জলবায়ু সংকট: উপকূলের আর্তনাদ ও অস্তিত্বের লড়াই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ১০:১৪ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরার জলবায়ু সংকট: উপকূলের আর্তনাদ ও অস্তিত্বের লড়াই

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রান্তিক জেলা সাতক্ষীরা আজ বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্মম ও প্রত্যক্ষ শিকার। সমুদ্র, প্রমত্তা নদী আর সুন্দরবন ঘেরা এই জেলা এখন লবণাক্ততা, সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার আর একের পর এক ধেয়ে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিদিন অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ করছে। এক সময়ের শস্যশ্যামল এই জনপদে এখন শুধুই লবণের গ্রাস আর ভাঙনের শব্দ।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ছে, যার অবধারিত প্রভাব পড়ছে আমাদের এই উপকূলে। এর সাথে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে আসা মিঠা পানির প্রবাহের অভাব। ফলে জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা পানি অনায়াসে ঢুকে পড়ছে সাতক্ষীরার বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদী ও খালগুলোতে। বিশেষ করে কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা বর্তমানে ২৫ ডেসিসিমেন্স/মিটার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।

 

কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ ধান যেখানে ৪ ডেসিসিমেন্সের বেশি লবণ সহ্য করতে পারে না, সেখানে এই মাত্রা কতটা ভয়াবহ তা সহজেই অনুমেয়। কালিগঞ্জের শ্রীকলা গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক শেখ মনিরুল ইসলাম ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, আগে বর্ষাকালের টানা বৃষ্টিতে মাটির উপরিভাগের লবণ ধুয়ে-মুছে নদী ও সাগরে নেমে যেত, কিন্তু এখন জলবায়ুর খামখেয়ালিপনায় বৃষ্টিপাত হয়ে পড়েছে অত্যন্ত অনিয়মিত। ফলে বছরের পর বছর লবণ জমেই থাকছে এবং কৃষিজমি চিরতরে অনাবাদী হয়ে পড়ছে।

 

একই সুর শোনা গেল শ্যামনগর উপজেলার যতীন্দ্রনগর গ্রামের কৃষক শেখ মাহফুজুর রহমান মুকুলের কণ্ঠেও, তিনি জানান যে ফসলি জমির বুক ফেটে যেমন নোনা চৌচির হয়ে যাচ্ছে, তেমনি সুপেয় পানির শেষ উৎস পুকুরগুলোর মাছ মরে ভেসে উঠছে এবং পুরো এলাকার স্যানিটেশন ও গৃহস্থালি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এমনকি এই তীব্র লবণাক্ততার বিষাক্ত প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী ফল চাষও বিপর্যস্থ, পুরাতন সাতক্ষীরার আম চাষী আবু জাফর দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান যে, মাটিতে নোনা পানির অবাদ অনুপ্রবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আমূল বদলে যাওয়ার কারণে আমগাছের শিকড় পচে যাচ্ছে, মুকুল আসার আগেই পাতা ঝরে যাচ্ছে এবং ফলন দিন দিন অর্ধেকে নেমে আসছে।

এই বিপর্যয় কেবল সনাতন কৃষি বা ফল চাষেই সীমাবদ্ধ নেই, সাতক্ষীরার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি চিংড়ি শিল্পকেও তা মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। সাতক্ষীরা সদরের জোড়দিয়া গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী ও চিংড়ি চাষী শেখ সাইফুর রহমান ও শেখ হাফিজুল ইসলাম বলেন, লবণাক্ততা বাড়লে চিংড়ি ভালো হয় এই ধারণাটি এখন সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। অতিরিক্ত এবং অনিয়মিত লবণাক্ততার কারণে ঘেরে নানা অজানা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটছে এবং অতিবৃষ্টি বা আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসে ঘের ভেসে গিয়ে কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে।

 

প্রকৃতপক্ষে, সাতক্ষীরা এখন বৈশ্বিক দুর্যোগের অন্যতম প্রধান হটস্পট। সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস কিংবা রেমালের মতো একেকটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের প্রতিরক্ষা বাঁধগুলোকে ল-ভ- করে দিয়ে গেছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা পানি ঢুকে গ্রামের পর গ্রাম মাসের পর মাস তলিয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ বেতনা, মরিচ্চাপ আর ঐতিহাসিক প্রাণসায়র খাল আজ পলি পড়ে প্রায় মৃত। নদীগুলো নাব্যতা হারানোয় নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে শুধু প্রত্যন্ত গ্রাম নয়, খোদ সাতক্ষীরা শহরও সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে। টানা এক সপ্তাহের মাঝারি বৃষ্টিপাতেই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা প্রকাশ পায় এবং আমন বীজতলা, আউশ ধান ও সবজি ক্ষেত মাইলের পর মাইল পানির নিচে তলিয়ে থাকে।

 

এই বহুমুখী সংকটের মাঝে সবচেয়ে মর্মান্তিক রূপ নিয়েছে সুপেয় পানির জন্য হাহাকার। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ইনভার্স ডিসটেন্স ওয়েইটিং (আইডিডব্লিউ) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাতক্ষীরার পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলে পিএইচ, ইসি, টিডিএস এবং লবণাক্ততার পরিমাণ সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানিতে অ্যামোনিয়ার মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি, অথচ জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লোরাইডের ভারসাম্য উধাও।

 

উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবারে খাবার পানি সংগ্রহের মূল দায়িত্ব পালন করতে হয় নারী ও কিশোরীদের। মাইলের পর মাইল হেঁটে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এক কলসি মিষ্টি পানি জোগাড় করতে গিয়ে নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, ব্যাহত হচ্ছে শিশুদের শিক্ষা। পানি ও যথাযথ স্যানিটেশনের অভাবে শিশুদের মাঝে ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ মহামারী আকারে ছড়াচ্ছে। জীবিকার তাগিদে এবং বাঁচার তাগিদে মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে, যা নগরের ওপর বাড়তি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন জেলা নাগরিক কমিটি স্থানীয় জনমানুষ ও বিশেষজ্ঞরা। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছর এবং বিগত সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সাতক্ষীরার পোল্ডারগুলোর বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নদী খননে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল নিয়ে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা পানি কমিটির নেতা মফিজুল ইসলাম এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড কাগজে-কলমে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দেখালেও বাস্তবে ভাঙনপ্রবণ বেড়িবাঁধগুলোর কোনো স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান হচ্ছে না। ঠিকাদারি ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে বর্ষা আসার আগে নামমাত্র কাজ হয়, যা প্রথম জোয়ারের চাপেই ভেসে যায়।

 

টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই বরাদ্দ কেবলই অপচয়। বিশিষ্ট উন্নয়নকর্মী স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত বলেন, সনাতন পদ্ধতিতে ড্রেজার দিয়ে নদী খনন করে পলি সরানো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। নদী বাঁচাতে এবং জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অববাহিকা ব্যবস্থাপনা বা টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) পদ্ধতি অবিলম্বে চালু করতে হবে। একই সাথে তিনি টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে উপকূলীয় ব্লক ও সিসি ব্লকের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

 

পরিবেশবিদ অ্যাডভোকেট মুনীরউদ্দীন বলেন, পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ঢালকে রক্ষা করতে হবে এবং উপকূলজুড়ে ব্যাপক হারে ম্যানগ্রোভ বনায়ন গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি, কৃষিকে বাঁচাতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত ব্রি ধান-৬৭, ৯২, ৯৩ এবং সর্বোচ্চ ১০ ডেসিসিমেন্স লবণ সহনশীল ব্রি ধান-৯৯ এর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। শুধু সনাতন কৃষির ওপর নির্ভর না করে উপকূলের মানুষকে বিকল্প জীবিকা হিসেবে হাঁস-মুরগি পালন, কাঁকড়া চাষ ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের দিকে ধাবিত করার সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

সাতক্ষীরার মানুষ আজ আর কেবল প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সাথে লড়ছে না, তারা লড়ছে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক জলবায়ু অপরাধের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক অসম লড়াইয়ে। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় প্রবীণ নেতা গাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে হলে দীর্ঘমেয়াদী ও আন্তর্জাতিক মানের টেকসই বেড়িবাঁধের কোনো বিকল্প নেই। এটি কেবল সাতক্ষীরার একার সমস্যা নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

 

সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষক এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি এখনই সমন্বিত এবং শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে জলবায়ুর এই করাল গ্রাসে একদিন হয়তো বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে এই ঐতিহ্যবাহী উপকূলীয় জনপদ। আর সেই দায় এড়াতে পারবে না ইতিহাস।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার