সাতক্ষীরার জলবায়ু সংকট: উপকূলের আর্তনাদ ও অস্তিত্বের লড়াই
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রান্তিক জেলা সাতক্ষীরা আজ বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্মম ও প্রত্যক্ষ শিকার। সমুদ্র, প্রমত্তা নদী আর সুন্দরবন ঘেরা এই জেলা এখন লবণাক্ততা, সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার আর একের পর এক ধেয়ে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিদিন অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ করছে। এক সময়ের শস্যশ্যামল এই জনপদে এখন শুধুই লবণের গ্রাস আর ভাঙনের শব্দ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ছে, যার অবধারিত প্রভাব পড়ছে আমাদের এই উপকূলে। এর সাথে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে আসা মিঠা পানির প্রবাহের অভাব। ফলে জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা পানি অনায়াসে ঢুকে পড়ছে সাতক্ষীরার বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদী ও খালগুলোতে। বিশেষ করে কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা বর্তমানে ২৫ ডেসিসিমেন্স/মিটার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।
কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ ধান যেখানে ৪ ডেসিসিমেন্সের বেশি লবণ সহ্য করতে পারে না, সেখানে এই মাত্রা কতটা ভয়াবহ তা সহজেই অনুমেয়। কালিগঞ্জের শ্রীকলা গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক শেখ মনিরুল ইসলাম ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, আগে বর্ষাকালের টানা বৃষ্টিতে মাটির উপরিভাগের লবণ ধুয়ে-মুছে নদী ও সাগরে নেমে যেত, কিন্তু এখন জলবায়ুর খামখেয়ালিপনায় বৃষ্টিপাত হয়ে পড়েছে অত্যন্ত অনিয়মিত। ফলে বছরের পর বছর লবণ জমেই থাকছে এবং কৃষিজমি চিরতরে অনাবাদী হয়ে পড়ছে।
একই সুর শোনা গেল শ্যামনগর উপজেলার যতীন্দ্রনগর গ্রামের কৃষক শেখ মাহফুজুর রহমান মুকুলের কণ্ঠেও, তিনি জানান যে ফসলি জমির বুক ফেটে যেমন নোনা চৌচির হয়ে যাচ্ছে, তেমনি সুপেয় পানির শেষ উৎস পুকুরগুলোর মাছ মরে ভেসে উঠছে এবং পুরো এলাকার স্যানিটেশন ও গৃহস্থালি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এমনকি এই তীব্র লবণাক্ততার বিষাক্ত প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী ফল চাষও বিপর্যস্থ, পুরাতন সাতক্ষীরার আম চাষী আবু জাফর দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান যে, মাটিতে নোনা পানির অবাদ অনুপ্রবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আমূল বদলে যাওয়ার কারণে আমগাছের শিকড় পচে যাচ্ছে, মুকুল আসার আগেই পাতা ঝরে যাচ্ছে এবং ফলন দিন দিন অর্ধেকে নেমে আসছে।
এই বিপর্যয় কেবল সনাতন কৃষি বা ফল চাষেই সীমাবদ্ধ নেই, সাতক্ষীরার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি চিংড়ি শিল্পকেও তা মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। সাতক্ষীরা সদরের জোড়দিয়া গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী ও চিংড়ি চাষী শেখ সাইফুর রহমান ও শেখ হাফিজুল ইসলাম বলেন, লবণাক্ততা বাড়লে চিংড়ি ভালো হয় এই ধারণাটি এখন সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। অতিরিক্ত এবং অনিয়মিত লবণাক্ততার কারণে ঘেরে নানা অজানা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটছে এবং অতিবৃষ্টি বা আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসে ঘের ভেসে গিয়ে কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, সাতক্ষীরা এখন বৈশ্বিক দুর্যোগের অন্যতম প্রধান হটস্পট। সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস কিংবা রেমালের মতো একেকটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের প্রতিরক্ষা বাঁধগুলোকে ল-ভ- করে দিয়ে গেছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা পানি ঢুকে গ্রামের পর গ্রাম মাসের পর মাস তলিয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ বেতনা, মরিচ্চাপ আর ঐতিহাসিক প্রাণসায়র খাল আজ পলি পড়ে প্রায় মৃত। নদীগুলো নাব্যতা হারানোয় নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে শুধু প্রত্যন্ত গ্রাম নয়, খোদ সাতক্ষীরা শহরও সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে। টানা এক সপ্তাহের মাঝারি বৃষ্টিপাতেই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা প্রকাশ পায় এবং আমন বীজতলা, আউশ ধান ও সবজি ক্ষেত মাইলের পর মাইল পানির নিচে তলিয়ে থাকে।
এই বহুমুখী সংকটের মাঝে সবচেয়ে মর্মান্তিক রূপ নিয়েছে সুপেয় পানির জন্য হাহাকার। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ইনভার্স ডিসটেন্স ওয়েইটিং (আইডিডব্লিউ) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাতক্ষীরার পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলে পিএইচ, ইসি, টিডিএস এবং লবণাক্ততার পরিমাণ সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানিতে অ্যামোনিয়ার মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি, অথচ জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লোরাইডের ভারসাম্য উধাও।
উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবারে খাবার পানি সংগ্রহের মূল দায়িত্ব পালন করতে হয় নারী ও কিশোরীদের। মাইলের পর মাইল হেঁটে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এক কলসি মিষ্টি পানি জোগাড় করতে গিয়ে নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, ব্যাহত হচ্ছে শিশুদের শিক্ষা। পানি ও যথাযথ স্যানিটেশনের অভাবে শিশুদের মাঝে ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ মহামারী আকারে ছড়াচ্ছে। জীবিকার তাগিদে এবং বাঁচার তাগিদে মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে, যা নগরের ওপর বাড়তি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন জেলা নাগরিক কমিটি স্থানীয় জনমানুষ ও বিশেষজ্ঞরা। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছর এবং বিগত সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সাতক্ষীরার পোল্ডারগুলোর বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নদী খননে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল নিয়ে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা পানি কমিটির নেতা মফিজুল ইসলাম এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড কাগজে-কলমে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দেখালেও বাস্তবে ভাঙনপ্রবণ বেড়িবাঁধগুলোর কোনো স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান হচ্ছে না। ঠিকাদারি ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে বর্ষা আসার আগে নামমাত্র কাজ হয়, যা প্রথম জোয়ারের চাপেই ভেসে যায়।
টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই বরাদ্দ কেবলই অপচয়। বিশিষ্ট উন্নয়নকর্মী স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত বলেন, সনাতন পদ্ধতিতে ড্রেজার দিয়ে নদী খনন করে পলি সরানো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। নদী বাঁচাতে এবং জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অববাহিকা ব্যবস্থাপনা বা টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) পদ্ধতি অবিলম্বে চালু করতে হবে। একই সাথে তিনি টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে উপকূলীয় ব্লক ও সিসি ব্লকের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
পরিবেশবিদ অ্যাডভোকেট মুনীরউদ্দীন বলেন, পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ঢালকে রক্ষা করতে হবে এবং উপকূলজুড়ে ব্যাপক হারে ম্যানগ্রোভ বনায়ন গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি, কৃষিকে বাঁচাতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত ব্রি ধান-৬৭, ৯২, ৯৩ এবং সর্বোচ্চ ১০ ডেসিসিমেন্স লবণ সহনশীল ব্রি ধান-৯৯ এর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। শুধু সনাতন কৃষির ওপর নির্ভর না করে উপকূলের মানুষকে বিকল্প জীবিকা হিসেবে হাঁস-মুরগি পালন, কাঁকড়া চাষ ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের দিকে ধাবিত করার সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাতক্ষীরার মানুষ আজ আর কেবল প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সাথে লড়ছে না, তারা লড়ছে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক জলবায়ু অপরাধের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক অসম লড়াইয়ে। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় প্রবীণ নেতা গাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে হলে দীর্ঘমেয়াদী ও আন্তর্জাতিক মানের টেকসই বেড়িবাঁধের কোনো বিকল্প নেই। এটি কেবল সাতক্ষীরার একার সমস্যা নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষক এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি এখনই সমন্বিত এবং শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে জলবায়ুর এই করাল গ্রাসে একদিন হয়তো বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে এই ঐতিহ্যবাহী উপকূলীয় জনপদ। আর সেই দায় এড়াতে পারবে না ইতিহাস।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার












