ভূমিকম্প রোধ: আগামী প্রজন্মের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতকল্পে দরকার সাজানো পরিবেশ
এম শফিকুল ইসলাম
আমাদের দেশে বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়টি ছোট ছোট ভূমিকম্পন অনুভূত হয়েছিল। এই ভূমিকম্পের মাত্রা কম হওয়ায় কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রায় উপরে কোন ভূমিকম্প হলে বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে গ্যাস লাইন, বিদ্যুৎ লাইন ও পানির লাইনে বিস্ফোরণসহ বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। ভূমিকম্পের লক্ষণ দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, বাংলাদেশে ও একদিন বড় ধরনের ভূমিকম্পে আক্রান্ত হয়ে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অতীতেও এই অঞ্চলে বেশ বড় ধরনের কিছু ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল। প্লেট টেকটোনিক মতবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ টেকটোনিক প্লেটের ওপর অবস্থিত। ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট এর উপরে ইউরেশিয়ান প্লেট এবং পূর্বে বার্মিজ মাইক্রোপ্লেট অবস্থিত। ইন্ডিয়ার প্লেটটি ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরে তিব্বত ও হিমালয়ের দক্ষিণ কিনারায় বাঁকা হচ্ছে। এছাড়া বার্মিজ মাইক্রোপ্লেট প্রতিবছর ২০ মি.মি. গতিতে পশ্চিম দিকে এবং ইন্ডিয়ান প্লেট ৫০ মি.মি. গতিতে উত্তর পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে ইন্ডিয়ান প্লেট বার্মিজ প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে।
এ তিন প্লেটের পারস্পরিক সংঘর্ষের ফলেই বাংলাদেশ ভূমিকম্প হচ্ছে। বাংলাদেশের অতি কাছাকাছি রয়েছে ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ ইন্দো অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ান প্লেট। চট্টগ্রাম শহর, কক্সবাজার ও মায়ানমার অবস্থান করছে রাখাইন ফল্ট লাইন, যা এশিয়ান প্লেটের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে এ ফল্ট লাইনের অবস্থা বেশ নাজুক। এ ফল্ট লাইন জাপান ও চীনের প্লেটকে স্পর্শ করে বাংলাদেশের পাশ দিয়ে বঙ্গোপসাগর হয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্তে একবার ভূমিকম্প হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের ওয়াইড কর্পোরেশন নামে জাপানি একটি সংস্থার সঙ্গে ভূমিকম্প বিষয়ে কমপ্রিহেনসিভ ডিসস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম নামক একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্তে যে কোন সময় ৮ পয়েন্ট পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হবে। আর কম দূরত্ব হওয়াই চট্টগ্রামের প্রভাব পড়তে পারে ৭.৫ মাত্রা।
বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের কিছু অংশে প্রচন্ড শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হতে পারে। যদি বন্য অঞ্চলটির বিস্তর প্রায় ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। এতে প্রায় ১৪ কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় ১২ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের একদল বিজ্ঞানী গবেষণা করে এ তথ্য পেয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞরা ভূমিকম্পের ঝুঁকির মাত্রা হিসাব করে দেশকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। সে অনুযায়ী সিলেট, ময়মনসিংহ, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, রংপুরের একাংশ পড়েছে সর্বোচ্চ ঝূকিপূণ অঞ্চলের মধ্যে, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম পড়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোনে। বরিশাল খুলনাসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল পড়েছে কোন সুখীপূর্ণ জোনে।
কিন্তু তারা ঢাকাকে বিশ্বের কয়েকটি জনবহুল শহরের মধ্যে বিবেচনা করে ভূমিকম্পের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। চলতি মাসের ২২ দিনে অন্তত চারবার নানা মাত্রায় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। কয়েকদিনের মধ্যে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এরকম একাধিকবার ভূমিকম্পে সর্বসাধারণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সবশেষে বলবো জনগণকে সচেতন হতে হবে। আর জনগণ সতর্ক হলেই বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এজন্য সরকারকে বিভিন্ন কর্মসূচী পরিচালনা করতে হবে। আগামী প্রজন্মের বাসযোগ্য বাংলাদেশ আর নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতকল্পে ভূমিকম্পরোধী সাজানো পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
লেখক: নাট্যকর্মী












