শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

সাতক্ষীরায় নাগরিক অধিকার সুরক্ষা নেটওয়ার্কের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৮ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় নাগরিক অধিকার সুরক্ষা নেটওয়ার্কের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিনিধি: নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর উদ্যোগে ‘নাগরিক অধিকার সুরক্ষা নেটওয়ার্কের সাধারণ সভা’ শনিবার সকালে সাতক্ষীরার পানসি রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ব্লাস্ট খুলনা ইউনিটের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট অশোক কুমার সাহা।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম মিনি, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কাশেম এবং ড. দিলীপ কুমার দেব। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন প্যানেল আইনজীবী ও সাংবাদিক খায়রুল বদিউজ্জামান।

সভায় প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে বক্তব্য দেন এ এম মনিরুজ্জামান জেলা প্রকল্প কর্মকর্তা, ব্লাস্ট ফ্রিড প্রকল্প। তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় ফেলোশিপ কর্মসূচি, সিভিল সোসাইটি ও মানবাধিকার কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় সিএসও সদস্যদের সমন্বয়ে ‘সিভিক ভয়েস অ্যান্ড রাইটস প্রোটেকশন নেটওয়ার্ক’ গঠন করা হবে। পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ডিজিটাল অধিকার, আইনগত সহায়তা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন অ্যাডভোকেট নাজমুন নাহার ঝুমুর, অ্যাডভোকেট মুহাঃ মনিরুদ্দীন, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ, অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলাম লিটিল, অ্যাডভোকেট সালমা আক্তার বানু, অ্যাডভোকেট ফারজানা ইয়াসমিন লিমা, সাংবাদিক আমিনা বিলকিস ময়না, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জোসনা দত্ত, সাংবাদিক আহসানুর রহমান রাজিব, মানবাধিকার কর্মী সাকিবুর রহমান বাবলা, মোঃ রনি হোসেন, ইবনুল নাসিরসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।

বক্তারা বলেন, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। এ ধরনের উদ্যোগ নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা মত প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ও আইনজীবী এস. এম. বিপ্লব হোসেন।

 

 

Ads small one

ঘুমানোর আগে স্ক্রিন নয়, বই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:২৩ অপরাহ্ণ
ঘুমানোর আগে স্ক্রিন নয়, বই

তারিক ইসলাম

‎আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমাদের দিন শুরু হয় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে, আর দিন শেষও হয় অনবরত স্ক্রলিংয়ের মধ্য দিয়ে। রাতের খাবার শেষে বিছানায় শুয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন চেক করা, ছোট ভিডিও দেখা কিংবা সংবাদের পাতায় চোখ বোলানো এখন দৈনন্দিন অভ্যাস। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, ঘুমানোর ঠিক আগের এই অভ্যাসটি আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কতটা ক্ষতি করছে?

‎ডিজিটাল কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে এবং একটি প্রশান্তিময় রাতের ঘুম নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা এখন আবার পুরোনো কিন্তু সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু—বইয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

‎‎ঘুমানোর আগে মোবাইলের পরিবর্তে বই পড়ার অভ্যাস কেন আমাদের জীবনের জন্য জরুরি, তা কিছু বৈজ্ঞানিক ও মানসিক দিক পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‎প্রাকৃতিক ঘুমের হরমোন উৎপাদন: ‎স্মার্টফোন বা যেকোনো ডিজিটাল ডিভাইসের পর্দা থেকে একধরনের নীল আলো (ব্লু লাইট) নির্গত হয়। এই আলো মস্তিষ্কে বিভ্রান্তি তৈরি করে ঘুম আনার হরমোন ‘মেলাটোনিন’ নিঃসরণে বাধা দেয়। ফলে সহজে ঘুম আসতে চায় না। স্ক্রিনের বদলে ছাপা বই হাতে নিলে মেলাটোনিন নিঃসরণে কোনো বাধা থাকে না; প্রাকৃতিকভাবেই চোখে নেমে আসে গাঢ় ঘুম।

‎দ্রুত মানসিক ও পেশির চাপ হ্রাস : ‎সারাদিনের কাজের পর শরীরের পাশাপাশি স্নায়ুরও বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ছয় মিনিট মনোযোগ দিয়ে বই পড়লে রক্তচাপ ও পেশির টান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। এটি শরীরকে অন্যান্য যেকোনো পদ্ধতির চেয়ে দ্রুত শান্ত করে আরামদায়ক ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।

‎দুশ্চিন্তামুক্ত মন ও ‘কগনিটিভ শিফট’: ‎আগামীকালের কাজের চিন্তা বা সারাদিনের মানসিক ক্লান্তি মস্তিষ্ককে রাতে শান্ত হতে দেয় না। মন যখন কোনো নির্দিষ্ট দুশ্চিন্তার চক্রে আটকে থাকে, তখন বই চমৎকার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। বইয়ের পাতা মনকে সুনির্দিষ্ট কোনো গল্প বা বিষয়ের গভীরে নিয়ে যায় (যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘কগনিটিভ শিফট’ বলা হয়)। ফলে মস্তিষ্ক অনাকাঙ্ক্ষিত উৎকণ্ঠা থেকে সাময়িক মুক্তি পায়।

‎ওভারস্টিমুলেশন বা অতি-উত্তেজনা রোধ: ‎সোশ্যাল মিডিয়ার একের পর এক নোটিফিকেশন বা রিলস আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের অতিরিক্ত প্রবাহ ঘটায়। এটি মস্তিষ্ককে একধরনের অহেতুক উত্তেজনায় (ওভারস্টিমুলেশন) রাখে, যা ঘুমের পরিবেশ নষ্ট করে। অন্যদিকে বই পড়ার শ্লথ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এই উত্তেজনা কমিয়ে মনে গভীর প্রশান্তি আনে।
‎মনোযোগ ও স্মৃতির উন্নয়ন: ‎প্রতিনিয়ত ছোট ছোট কনটেন্ট স্ক্রলিংয়ের ফলে মানুষের মনোযোগের সময়সীমা (অ্যাটেনশন স্প্যান) মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। রাতে নিয়মিত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট বই পড়ার অভ্যাস এক জায়গায় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা পুনর্গঠনে সাহায্য করে। তাছাড়া ঘুমানোর ঠিক আগে যা পড়া হয়, ঘুমন্ত অবস্থায় মস্তিষ্ক তা স্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তর (কনসোলিডেট) করে।

চোখের সুরক্ষা ও সতেজ সকাল : ‎ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক স্বাভাবিকের চেয়ে কম পড়ে, যা চোখ শুষ্ক করে ফেলে এবং মাথাব্যথার কারণ হয়। বইয়ের পাতা চোখের পেশির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে না। তা ছাড়া মোবাইল দেখে ঘুমালে ঘুমের মান খারাপ হয় এবং সকালে ক্লান্তি অনুভব হয়। বই পড়ে ঘুমালে গভীর ঘুম নিশ্চিত হয়, যা পরদিন সকালে পূর্ণ শক্তি ও প্রফুল্লতা নিয়ে জেগে উঠতে সাহায্য করে।

‎প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে প্রযুক্তির দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার কৌশল জানতে হবে। সুস্থ দেহ ও শান্ত মনের জন্য রাতে বিছানায় যাওয়ার অন্তত আধঘণ্টা আগে মোবাইল বা ল্যাপটপ দূরে সরিয়ে রাখুন। বালিশের পাশে পছন্দের একটি বই রাখুন। এই একটি ছোট অভ্যাস আপনার জীবনের সামগ্রিক মান ও প্রশান্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

‎লেখক: ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

 

 

স্মরণীয় আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ণ
স্মরণীয় আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

প্রকাশ ঘোষ বিধান

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ভারতের রসায়নশাস্ত্রের জনক। তিনি প্রথম দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তা এবং একজন মহান সমাজসেবক হিসেবে স্মরণীয়। তিনি মার্কিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার এবং উপমহাদেশের প্রথম ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় মূলত বিজ্ঞান ও শিল্পক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বিশ্বজুড়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

তিনি ১৮৬১ সালের ২আগস্ট বর্তমান বাংলাদেশের খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন ভুবনমোহিনী দেবী ও স্থানীয় জমিদার হরিশচন্দ্র রায়ের পুত্র। তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার এবং বেঙ্গল কেমিক্যালস প্রতিষ্ঠা করেন। অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলায় জন্মগ্রহণ করা এই মহান মনীষী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন একাধারে বিশ্বখ্যাত বাঙালি, একজন বিজ্ঞানী, সফল শিক্ষক, ভারতীয় রসায়নশাস্ত্রের জনক, শিল্পোদ্যোক্তা এবং মানবদরদী মহান সমাজসেবক। তিনি পি. সি. রায় নামেও পরিচিত।

অধ্যাপনাকালে তার প্রিয় বিষয় রসায়ন নিয়ে তিনি নিত্য নতুন অনেক গবেষণাও চালিয়ে যান। ১৮৯৬ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রসায়ন বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। তিনি ল্যাবরেটরিতে সম্পূর্ণ নতুন এবং অত্যন্ত অস্থায়ী একটি যৌগ মার্কিউরাস নাইট্রাইট (ঐমঘঙ₂) তৈরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। তার স্মরণীয় কালজয়ী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের ফলে তাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি তৈরি হয় এবং বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করে। এ ছাড়া তিনি ১২টি যৌগিক লবণ এবং ৫টি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন। তার মোট গবেষণাপত্রের সংখ্যা ১৪৫ টি।

তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে ভারতীয়দের চিকিৎসায় শতভাগ বিদেশি আমদানিকৃত ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হতো। বাঙালিদের ব্যবসায় অনাগ্রহ ও হীনম্মন্যতা পর্যবেক্ষণে ১৮৯২ সালে ৭০০ টাকা বিনিয়োগে ও নিজ উদ্যোগে, নিজস্ব গবেষণাগার থেকেই বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীকালে ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে তা কলকাতার মানিকতলায় ৪৫ একর জমিতে স্থানান্তরিত করা হয়। তখন এর নতুন নাম রাখা হয় বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড। এটি ছিল সমগ্র ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক ওষুধ ও রাসায়নিক প্রস্তুতকারক কারখানা, যা ভারতীয়দের শিল্পায়নের পথ দেখায় এবং আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করে।

সমবায়ের পুরোধা স্যার পিসি রায় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে নিজ জন্মভূমিতে একটি কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি খুলনা টেক্সটাইল মিলও প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী পি সি রায় পিতার নামে আর,কে,বি,কে হরিশ্চন্দ্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বাগেরহাট জেলায় ১৯১৮ সালে তিনি পি.সি কলেজ নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। যা আজ বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারে বিশাল ভূমিকা রাখছে।

শিক্ষাবিদ ও আচার্য রূপে তার অবদান, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং পরে বিজ্ঞান কলেজে অধ্যাপনাকালে তিনি একদল বিশ্বমানের বিজ্ঞানী তৈরি করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে ভারতের প্রথম আধুনিক রসায়ন গবেষণা স্কুল। বিশ্বখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, এবং জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বরা সরাসরি তাঁর ছাত্র ছিলেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর এই পরম স্নেহ ও শিক্ষাদানের অনন্য গুণের কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে আচার্য উপাধিতে ভূষিত করেন।
ইতিহাস ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগতিনি কেবল ল্যাবরেটরিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং ভারতের প্রাচীন বিজ্ঞানচর্চার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন। তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ফসল এ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি গ্রন্থটি প্রাচীন ভারতের রসায়ন চর্চার এক প্রামাণ্য দলিল।

মানবতাবাদ ও আত্মত্যাগআচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় অত্যন্ত সাদাসিধে ও মিতব্যয়ী জীবনযাপন করতেন। তার নাস্তার দাম তৎকালীন ১ টাকার বেশি হলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন। নিজের জন্য তিনি মাসিক ৪০ টাকা রাখতেন। ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত তিনি নিজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা দান করেন। তাঁর উপার্জনের সিংহভাগই তিনি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের তহবিল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের বিভিন্ন দুর্যোগে অকাতরে দান করে দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর দেখা যায়, বেঙ্গল কেমিক্যালে তাঁর নিজের কোনো শেয়ার ছিল না, যার সুফল ভোগ করেছিল অনাথ ও বিধবারা।

রসায়ন বিজ্ঞানের বৈশ্বিক অগ্রগতি এবং ভারতের আত্মনির্ভরশীলতার ভিত্তি গড়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি তাঁকে ইউরোপের বাইরে প্রথম কেমিক্যাল ল্যান্ডমার্ক প্লেক দিয়ে সম্মানিত করে। তাঁকে ভারতীয় রসায়নশাস্ত্রের জনক এবং মাস্টার অব নাইট্রেড বলা হয়।

শিক্ষকতার জন্য তিনি সাধারণ্যে আচার্য হিসেবে আখ্যায়িত। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তৃতীয়বারের মত তিনি ইংল্যান্ড যান এবং সেখান থেকেই সি আই ই লাভ করেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে এই ডিগ্রি দেয়। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রিটিশ সরকারের থেকে নাইট উপাধি লাভ করেন। এছাড়া ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীকালে মহীশুর ও বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি ডক্টরেট পান।

বাঙালি রসায়নবিদ ও উদ্যোক্তা পি সি রায় আজীবন অবিবাহিত বা চিরকুমার ছিলেন। তিনি তাঁর উপার্জিত অর্থের সিংহভাগই মানুষের সেবায় বিলিয়ে দেন। দুর্ভিক্ষ, বন্যা বা মহামারীর সময় তিনি নিজে তহবিল গঠন করে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি একটি সাধারণ কামরায় অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে কাটিয়েছেন। ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন তিনি পরলোকগমন করেন। তবে বাঙালি বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই অনন্য ত্যাগের জন্য সবচেয়ে বেশি স্মরণ করা হয় আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

প্রেসক্লাবের সংখ্যা নয়, বাড়ুক সাংবাদিকতার মান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৪ অপরাহ্ণ
প্রেসক্লাবের সংখ্যা নয়, বাড়ুক সাংবাদিকতার মান

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একটি ঘর, কয়েকটি চেয়ার, একটি সাইনবোর্ডÑএগুলো দিয়ে একটি প্রেসক্লাবের অবকাঠামো তৈরি হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতা তৈরি হয় না সেখানে। সাংবাদিকতা তৈরি হয় মানুষের মধ্যে, তাঁর চিন্তায়, তাঁর অনুসন্ধানে, তাঁর কলমে এবং সত্য প্রকাশের সাহসে। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক এলাকায় প্রেসক্লাবের সংখ্যা বাড়লেও সাংবাদিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একসময় প্রেসক্লাব ছিল সাংবাদিকদের প্রাণের ঠিকানা। দিনের সংবাদ সংগ্রহ শেষে সাংবাদিকরা সেখানে বসে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতেন, সংবাদ নিয়ে আলোচনা করতেন, পেশাগত সংকটে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতেন। প্রেসক্লাব ছিল সাংবাদিক ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক জায়গায় সেই চিত্র বদলে গেছে।

 

এখন কোথাও কোথাও প্রেসক্লাব যেন সাংবাদিকতার চর্চাকেন্দ্র না হয়ে পরিচয়ের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। একটি উপজেলায় একাধিক প্রেসক্লাব থাকা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কোথাও ব্যক্তিগত মতবিরোধ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, পদ-পদবি নিয়ে বিরোধ কিংবা সাংগঠনিক বিভাজনের কারণে নতুন নতুন প্রেসক্লাব তৈরি হচ্ছে। এতে সাংবাদিকতার প্রকৃত উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, সেই প্রশ্ন উঠছে। কারণ সাংবাদিকদের শক্তি বিভক্তিতে নয়, ঐক্যে।প্রেসক্লাবের মূল উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না পরিচয়পত্র বিতরণ করা। এটি ছিল সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠন। কিন্তু দুঃখ জনক ভাবে কিছু ক্ষেত্রে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, প্রেসক্লাবের সদস্য হলেই সাংবাদিক হওয়া যায়। অথচ বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকতা কোনো সদস্যপদ নয়, এটি একটি অর্জন।

 

একজন সাংবাদিক প্রতিদিন মানুষের কাছে যান। তিনি কৃষকের মাঠে যান, শ্রমজীবী মানুষের কথা শোনেন, সাধারণ মানুষের সমস্যাকে তুলে ধরেন। তিনি সরকারি দপ্তরে তথ্য খোঁজেন, ঘটনার সত্যতা যাচাই করেন, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য নেন। তাঁর লেখা যখন সমাজে পরিবর্তনের প্রশ্ন তোলে, তখনই তিনি সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি পান।একটি পরিচয়পত্র কখনো একজন সাংবাদিকের বিকল্প হতে পারে না। যেমন গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে কেউ চিকিৎসক হয়ে যান না, তেমনি গলায় প্রেস কার্ড ঝুলালেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যান না। একজন চিকিৎসকের পরিচয় তাঁর চিকিৎসাসেবা, একজন শিক্ষকের পরিচয় তাঁর জ্ঞান বিতরণ, আর একজন সাংবাদিকের পরিচয় তাঁর সংবাদ ও সততা।উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকতায় এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গ্রামের মানুষের সমস্যা, দুর্নীতি, অনিয়ম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশসহ নানা বিষয় প্রথমে স্থানীয় সাংবাদিকদের হাত ধরেই সামনে আসে।

 

একজন দায়িত্বশীল স্থানীয় সাংবাদিক একটি এলাকার মানুষের চোখ ও কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।কিন্তু যখন সাংবাদিকতার জায়গায় পরিচয়ের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। কারণ সংবাদ মাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে পুরো সাংবাদিক সমাজকেই তার দায় বহন করতে হয়। তাই এখন প্রয়োজন প্রেসক্লাবের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে সাংবাদিকতার গুণগত মান বাড়ানো। প্রেসক্লাবগুলোকে হতে হবে পেশাগত উন্নয়নের জায়গা। সেখানে নতুন সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, সংবাদ লেখার কৌশল, তথ্য যাচাই, সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে হবে।একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়া।

 

শুধু পরিচিতি বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, একজনের কাজ, দক্ষতা ও পেশাগত আচরণ বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নির্ভর করে তার সদস্যদের মানের ওপর। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শক্তিশালী প্রেসক্লাব গড়ে ওঠে শক্তিশালী সাংবাদিকদের নিয়ে। উল্টোভাবে কোনো দুর্বল পেশাগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে একটি সাইনবোর্ড একটি প্রতিষ্ঠানকে মর্যাদাপূর্ণ করতে পারে না।

 

সাংবাদিকতা হলো মানুষের আস্থা অর্জনের পেশা। এখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস অর্জন করতে হয় সত্য, সাহস ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে। কোনো কার্ড, পদবি বা সাইনবোর্ড সেই বিশ্বাস কিনে দিতে পারে না। তাই সময় এসেছে সাংবাদিকতার মূল চেতনায় ফিরে যাওয়ার। প্রেসক্লাব থাকবে, সংগঠন থাকবে, পরিচয় থাকবেÑকিন্তু সবার আগে থাকতে হবে সাংবাদিকতা। কারণ প্রেসক্লাব একটি জায়গা হতে পারে, একটি প্রতিষ্ঠান হতে পারে; কিন্তু সাংবাদিকতা হলো একজন মানুষের বিবেক, দায়িত্ব এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। প্রেসক্লাবের সংখ্যা নয়, বাড়ুক প্রকৃত সাংবাদিকের সংখ্যা। তাহলেই শক্তিশালী হবে গণমাধ্যম, সমৃদ্ধ হবে সমাজ এবং প্রতিষ্ঠিত হবে মানুষের আস্থা। লেখক-সংবাদকর্মী