সাতক্ষীরা এক জেলা, সাতটি পর্যটন অভিজ্ঞতা
মো. মামুন হাসান
সাতক্ষীরাকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখে আসছি। কথাটি সত্য, কিন্তু পুরো সত্য নয়। একটি জেলার পরিচয় যদি কেবল একটি পর্যটন আকর্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই জেলার পর্যটন সম্ভাবনার বড় অংশ অদেখাই থেকে যায়। সাতক্ষীরার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সুন্দরবন আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে, অথচ সুন্দরবনের বাইরেও সাতক্ষীরার রয়েছে নদী, বন, ধর্মীয় ঐতিহ্য, গ্রামীণ জীবন, কৃষি, খাদ্য সংস্কৃতি, জলাভূমি এবং উপকূলীয় মানুষের সংগ্রাম ও অভিযোজনের অসাধারণ গল্প।সাতক্ষীরাকে তাই একটি পর্যটন স্থান হিসেবে নয়, একটি বহুমাত্রিক পর্যটন অভিজ্ঞতা হিসেবে ভাবার সময় এসেছে।
একটি জেলা, সাতটি উপজেলা। প্রতিটি উপজেলার রয়েছে আলাদা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, জীবনধারা ও সম্ভাবনা। এই বৈচিত্র্যকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সাতক্ষীরা একদিন এমন একটি গন্তব্যে পরিণত হতে পারে, যেখানে একজন পর্যটক শুধু সুন্দরবন দেখতে আসবেন না, বরং সাতক্ষীরাকে অনুভব করতে আসবেন।
শ্যামনগর হতে পারে প্রকৃতি ও উপকূলীয় জীবনের অভিজ্ঞতার কেন্দ্র। সুন্দরবন, নদী, খাল, গোলপাতা, ম্যানগ্রোভ, জেলে ও বনজীবীদের জীবন এবং উপকূলের মানুষের জলবায়ুর সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প এখানে পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। একজন পর্যটক শুধু নৌকায় সুন্দরবন দেখবেন না, সুন্দরবনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটিও জানতে পারবেন। প্রকৃতিকে দেখার পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকার শিক্ষা নিতে পারবেন।
কালিগঞ্জকে ভাবা যেতে পারে নদী, ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতার জায়গা হিসেবে। নদীকে শুধু যাতায়াতের পথ হিসেবে না দেখে পর্যটনের অংশ করা যায়। নৌভ্রমণ, নদীর পাড়ের জীবন, স্থানীয় খাবার, গ্রামীণ বাজার এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্র করে তৈরি হতে পারে ভিন্নধর্মী পর্যটন অভিজ্ঞতা।
সাতক্ষীরা সদর হতে পারে জেলার পর্যটন প্রবেশদ্বার ও নগরভিত্তিক অভিজ্ঞতার কেন্দ্র। একজন পর্যটক কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, কোথায় খাবেন, কোথায় থাকবেন, কী কিনবেন এবং কীভাবে পুরো জেলার সঙ্গে যুক্ত হবেন, তার একটি সুসংগঠিত তথ্যকেন্দ্র থাকতে পারে সদর শহরে। স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং জেলা ভিত্তিক পর্যটন তথ্যকে এখানে এক জায়গায় আনা গেলে সদর শহর শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র থাকবে না, পর্যটনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
তালা হতে পারে কৃষি ও গ্রামীণ অভিজ্ঞতার গন্তব্য। আমাদের গ্রামের কৃষি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি একটি জীবনধারা। ধানক্ষেত, মাছের ঘের, কৃষকের জীবন, মৌসুমি ফসল, স্থানীয় বাজার এবং গ্রামীণ খাবারকে কেন্দ্র করে কৃষি পর্যটনের নতুন মডেল তৈরি করা সম্ভব। শহুরে মানুষ সেখানে গিয়ে শুধু ছবি তুলবেন না, বরং কৃষকের সঙ্গে কথা বলবেন, মাঠ দেখবেন, স্থানীয় খাবার খাবেন এবং গ্রামীণ জীবনের কাছাকাছি যাবেন।
আশাশুনিকে কেন্দ্র করে তৈরি হতে পারে জলভূমি ও নদীভিত্তিক পর্যটনের অভিজ্ঞতা। পানি, নদী, খাল, বিল এবং জলজ জীববৈচিত্র্যকে পর্যটনের সম্পদ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পর্যটন পরিকল্পনায় নদী ও নৌভ্রমণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে এসব সম্পদকে পর্যটন পণ্যে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ এখনও সীমিত। পরিকল্পিত নৌপথ, নিরাপদ নৌযান এবং স্থানীয় গাইড তৈরি করা গেলে আশাশুনি একটি স্বতন্ত্র জলভিত্তিক পর্যটন গন্তব্য হতে পারে।
দেবহাটা হতে পারে সবুজ প্রকৃতি, সীমান্তবর্তী জীবন ও গ্রামীণ সংস্কৃতির অভিজ্ঞতার জায়গা। সীমান্তকে আমরা সাধারণত নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। কিন্তু সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, বাজার, প্রকৃতি ও ইতিহাসও পর্যটনের গল্প হতে পারে। অবশ্যই নিরাপত্তা ও আইনগত বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
কলারোয়া হতে পারে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থানীয় সংস্কৃতির গন্তব্য। একটি অঞ্চলের পুরোনো স্থাপনা, ধর্মীয় স্থান, লোকসংস্কৃতি, স্থানীয় খাবার ও মানুষের স্মৃতি মিলেই তৈরি হয় একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়। এসব সম্পদকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন পথের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
এভাবে সাতক্ষীরার সাত উপজেলা সাতটি আলাদা অভিজ্ঞতা দিতে পারে। কোথাও প্রকৃতি, কোথাও নদী, কোথাও কৃষি, কোথাও ইতিহাস, কোথাও উপকূলীয় জীবন, কোথাও সংস্কৃতি, আবার কোথাও সুন্দরবনের গভীরতা। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সাতটি অভিজ্ঞতাকে আলাদা আলাদা রেখে দিলে হবে না। এগুলোকে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিটে আনতে হবে।
আজ একজন পর্যটক সাতক্ষীরায় এসে সুন্দরবন দেখে চলে গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে তার অবস্থান ও ব্যয়ের পরিধি সীমিত থাকে। কিন্তু যদি তাকে তিন দিনের একটি সাতক্ষীরা পর্যটন প্যাকেজ দেওয়া যায়, যেখানে একদিন সুন্দরবন, একদিন নদী ও গ্রামীণ জীবন, আরেকদিন ঐতিহ্য, কৃষি ও স্থানীয় খাবারের অভিজ্ঞতা থাকবে, তাহলে একই পর্যটক দীর্ঘসময় অবস্থান করবেন। বাড়বে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, নৌযান, গাইড, স্থানীয় পণ্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়।এখানেই পর্যটনের প্রকৃত শক্তি। তবে শুধু পর্যটনস্থানের তালিকা করলেই পর্যটন তৈরি হয় না। প্রয়োজন নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত সাইনেজ, প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড, মানসম্মত খাবার, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, ডিজিটাল তথ্যসেবা এবং পর্যটকবান্ধব স্থানীয় পরিবেশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের অংশীদার করা। কারণ পর্যটন যদি স্থানীয় মানুষের আয় ও জীবনমানের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
সাতক্ষীরার আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো স্থানীয় খাবার ও কৃষিপণ্য। সাতক্ষীরার আম, চিংড়ি, শুঁটকি, খেজুরের গুড়সহ নানা স্থানীয় পণ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। একজন পর্যটক যখন কোনো অঞ্চলের খাবার খান, স্থানীয় পণ্য কেনেন কিংবা একটি পরিবারের ঘরে তৈরি খাবারের স্বাদ নেন, তখন তিনি শুধু ভোক্তা থাকেন না, সেই অঞ্চলের অর্থনীতির অংশ হয়ে ওঠেন।
আমাদের এখন তাই ভাবতে হবে, সাতক্ষীরায় পর্যটক কতজন এলেন, শুধু সেই হিসাব দিয়ে পর্যটনের সাফল্য মাপা হবে না। বরং একজন পর্যটক কতদিন থাকলেন, কত টাকা খরচ করলেন, সেই অর্থের কতটা স্থানীয় মানুষের কাছে গেল এবং তিনি ফিরে গিয়ে সাতক্ষীরার কতটা গল্প নিয়ে গেলেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সাতক্ষীরা এক জেলা। কিন্তু এই এক জেলার ভেতরেই রয়েছে বহু বাংলাদেশ। রয়েছে বন, নদী, উপকূল, কৃষি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, গ্রামীণ জীবন এবং মানুষের টিকে থাকার গল্প। এই বৈচিত্র্যই হতে পারে সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় পর্যটন শক্তি।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সুন্দরবনের পর্যটক বাড়ানো নয়, সাতক্ষীরায় পর্যটকের অবস্থানের সময় বাড়ানো। শুধু পর্যটনস্থানে মানুষ পাঠানো নয়, মানুষের সামনে সাতক্ষীরার জীবনকে একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরা।সাতক্ষীরাকে তাই আর শুধু সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে নয়, সাতটি অভিজ্ঞতার একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে ভাবতে হবে। এক জেলা, সাত উপজেলা, সাত অভিজ্ঞতা। এই ধারণাটিই হতে পারে সাতক্ষীরার পর্যটনের নতুন ব্র্যান্ড পরিচয়।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট












