সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ আগামরা রোগে শুকিয়ে যাচ্ছে
প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষপ্রজাতি সুন্দরী গাছে আগামরা রোগের প্রকোপ বাড়ছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা পরিবেশগত চাপে সুন্দরী গাছের অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত সমস্যা। এ রোগের কারণে গাছের পাতা বিবর্ণ হয়ে যায়, ডালপালা শুকিয়ে যায় এবং ওপরের অংশ থেকে ধীরে ধীরে পুরো গাছটি মারা যায়। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক এক বহুমাত্রিক গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছ এ রোগে আক্রান্ত, যার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ।
২০২৪-২৫ সালে সুন্দরবনের সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা নিয়ে পরিচালিত ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার বন ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ১০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষপ্রজাতির মধ্যে সুন্দরী অন্যতম। বনের বৃক্ষবিন্যাস, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ গাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরী গাছ আগামরা বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে সুন্দরী গাছের সংখ্যা প্রায় ৩৩ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ গাছ এ রোগে আক্রান্ত।
গবেষক ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, সুন্দরী গাছের এ সংকটের পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং কয়েকটি পরিবেশগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে। ফারাক্কা বাঁধসহ উজানে বিভিন্ন কারণে নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে মিঠাপানির সংকট দেখা দিয়েছে। মিঠাপানির অভাব ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বনের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।
প্রতিকূল পরিবেশের কারণে গাছের ভেতরে উপকারী ও ক্ষতিকর ছত্রাকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। ফলে দুর্বল গাছে সহজেই রোগজীবাণুর আক্রমণ ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে একশ্রেণির অস্বাভাবিক পরজীবী লতা সুন্দরী গাছের মূল কাণ্ড পর্যন্ত জড়িয়ে ধরে রস শোষণ করছে, যা গাছকে দ্রুত দুর্বল করে দিচ্ছে। বনের তলদেশে অতিরিক্ত পলি জমে শ্বাসমূল ঢেকে যাওয়ার ফলে গাছের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হচ্ছে।
এ রোগের কারণে সুন্দরবনের সামগ্রিক কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের সক্ষমতা ১৫ শতাংশ কমে গেছে। ৩৬ বছরের ব্যবধানে প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরী গাছের চারা গজানোর ঘনত্ব হেক্টরপ্রতি প্রায় ৭১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরী গাছ মূলত মিঠা ও ঈষৎ লবণাক্ত পানিতে ভালোভাবে বাঁচতে পারে। কিন্তু উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে আসায় সুন্দরবনের সামগ্রিক লবণাক্ততা বাড়ছে। বিশেষ করে বনের সাতক্ষীরা ও খুলনা অংশে এ পরিস্থিতি বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এ বনের ভূমিকা অপরিসীম। বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী শুধু জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নয়, স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সুন্দরবনে পরজীবী উদ্ভিদের উপদ্রবের বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এ সমস্যা প্রতিকারে এবং সুন্দরী গাছ রক্ষায় পরজীবী উদ্ভিদ নিয়ে দ্রুত গবেষণা শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
সুন্দরী গাছ কমে যাওয়ার শূন্যস্থানে লবণসহিষ্ণু গেওয়া, বাইন ও কেওড়া গাছের বিস্তার বাড়ছে, যা বনের প্রাকৃতিক বিন্যাস বদলে দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও সাম্প্রতিক আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, গত চার দশকে সুন্দরবনে সামগ্রিকভাবে রোগাক্রান্ত গাছের হার ৬ শতাংশ কমেছে। নতুন কিছু এলাকায় সুন্দরী গাছের সংখ্যা ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় কার্বন ধারণক্ষমতাও আংশিক পুনরুদ্ধার হচ্ছে। সুন্দরবনের এ প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ রক্ষায় লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছেন বন বিভাগ ও পরিবেশবিদেরা।






