সূর্যোদয়ের দেশে আশার সাতক্ষীরা
আখলাকুর রহমান
আশার আলো ঠিক তখনই জ্বলে ওঠে, যখন অন্ধকার সবচেয়ে গাঢ় হয়ে আসে, আর সাতক্ষীরা যেন সেই আলোরই আরেক নাম। ১২ জুলাই, বিশ্ব আশা দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এই দিনটিকে বেছে নিয়েছে কিরিবাতির জাতীয় দিবসের সঙ্গে মিলিয়ে, কারণ পৃথিবীতে সূর্যোদয়ের প্রথম আলো সেখানেই পড়ে। নতুন সূর্যের প্রথম কিরণ যেমন গোটা পৃথিবীর জন্য নতুন দিনের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি এই দিনটিও মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, ভবিষ্যৎ আজকের চেয়ে ভালো হতে পারে, যদি আমরা বিশ্বাস রাখি এবং কাজ করি।
এই আশার দিনে সাতক্ষীরার কথা না বললে বোধহয় অন্যায় হবে। কারণ সাতক্ষীরা নিজেই একটি জেলা, যে বারবার প্রকৃতির রুদ্র রূপের মুখোমুখি হয়ে, বারবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, সাতক্ষীরার নামকরণ নিয়ে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। কেউ বলেন সাত ঘরের সমষ্টি থেকে সাতঘরিয়া, পরে সাতক্ষীরা নাম হয়েছে। কেউবা বলেন সাতটি ক্ষীরা বা ক্ষুদ্র জনপদের মিলনে গড়ে উঠেছিল এই জনপদ। যে কথাই সত্যি হোক, এটুকু নিশ্চিত যে সাতক্ষীরা কোনো নতুন জনপদ নয়। ষোড়শ শতাব্দীতে বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজত্বকালে এই অঞ্চল ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যশোরেশ্বরী কালীমন্দির আজও সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে, যেখানে বহু মানুষ আজও আসেন শ্রদ্ধা জানাতে।
কালের গ্রোতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, সবকিছুর সাক্ষী এই মাটি। মুক্তিযুদ্ধে সাতক্ষীরার মানুষ যে সাহস আর আত্মত্যাগ দেখিয়েছিল, তা আজও এই জেলার মানুষের রক্তে মিশে আছে। কালিগঞ্জ, শ্যামনগর, দেবহাটা, আশাশুনি, তালা, কলারোয়ার প্রতিটি পথে ছড়িয়ে আছে সেই সংগ্রামের ইতিহাস।
কিন্তু সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় পরিচয় বোধহয় সুন্দরবন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে এই জেলা। শ্যামনগরের কোল ঘেঁষে যে সবুজ অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে, তা শুধু একটি বন নয়, এটি এক অভিভাবক। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান, প্রতিটি দুর্যোগে সুন্দরবন নিজের বুক পেতে দিয়েছে, যাতে ভেতরের মানুষগুলো বেঁচে থাকতে পারে। এই বন আমাদের জন্য আশার এক জীবন্ত প্রতীক, প্রকৃতি যেভাবে বারবার আঘাত সয়েও মানুষকে রক্ষা করে চলেছে।
ইছামতি, কালিন্দী, কপোতাক্ষ নদী এই জেলার শিরা উপশিরার মতো বয়ে চলেছে। কপোতাক্ষ নদের কথা উঠলে মনে পড়ে যায় মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সেই আবেগময় পঙক্তির কথা, যিনি এই নদীকেই তাঁর কবিতায় অমর করে রেখে গেছেন। নদী শুকিয়ে যায়, পলি জমে, তবু মানুষ নদীর পাড় ছেড়ে যায় না, কারণ এই নদীই তাদের জীবিকা, এই নদীই তাদের শেকড়।
কৃষির কথা বললে সাতক্ষীরার নাম আসবেই আম, ধান আর চিংড়ির জন্য। সাতক্ষীরার আম সুস্বাদু বলে সারা দেশে পরিচিত। এখানকার চিংড়ি ঘের, বাগদা আর গলদা চিংড়ি চাষ, দেশের রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপকূলীয় লবণাক্ততার সঙ্গে যুদ্ধ করেও এখানকার কৃষক নতুন নতুন পদ্ধতিতে চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন, লবণ সহনশীল ধানের জাত নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, মিষ্টি জলের সংকট মোকাবিলায় মানুষ নিজেরাই বের করছেন নতুন পথ। এই সংগ্রামই তো আশার আরেক নাম।
সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারী মৌয়ালরা প্রতি বছর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে প্রবেশ করেন। বাঘের ভয়, নদীর গ্রোত, সবকিছু উপেক্ষা করে তাঁরা ফিরে আসেন মধু নিয়ে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। এই মানুষগুলোর সাহসই আমাদের শেখায়, জীবনযুদ্ধে হার মানতে নেই।
ভোমরা স্থলবন্দর সাতক্ষীরাকে যুক্ত করেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যের এই পথ ধরে প্রতিদিন শত শত ট্রাক পণ্য আনা নেওয়া করে, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করছে। তরুণ প্রজন্ম এখন তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে, ঘরে বসেই বিশ্ববাজারে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরছে। ডিজিটাল অর্থনীতির এই নতুন জোয়ার সাতক্ষীরার তরুণদের জন্য খুলে দিচ্ছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
তবে আশার পথ কখনো মসৃণ নয়। বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি আজও এই অঞ্চলে পুরোপুরি দূর হয়নি। উপকূলীয় দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরবর্তী অনিশ্চয়তা, অনেক পরিবারকেই ঠেলে দেয় ভুল সিদ্ধান্তের দিকে। কিন্তু আশার কথা এই যে, স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল, সচেতন সমাজকর্মীরা একযোগে কাজ করে চলেছেন, মেয়েদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে, তাদের স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাতে। প্রতিটি কিশোরীর হাতে বই তুলে দেওয়া মানেই একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া, একটি জনপদের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া।
জনসংখ্যার এই বিপুল তরুণ শক্তি, এই জনমিতিক লভ্যাংশ, সঠিক পথে পরিচালিত হলে সাতক্ষীরাকে নিয়ে যেতে পারে অনেক দূর। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ আর সুযোগের সমন্বয় ঘটলে এই তরুণরাই হয়ে উঠতে পারে জেলার প্রকৃত সম্পদ।
সাতক্ষীরা তাই কেবল একটি ভৌগোলিক নাম নয়। এটি এক জীবন্ত গল্প, যেখানে নদী শুকিয়ে যায় কিন্তু মানুষ থেমে থাকে না, ঝড় আসে কিন্তু সুন্দরবন বুক পেতে রক্ষা করে, লবণাক্ততা বাড়ে কিন্তু কৃষক নতুন পথ খুঁজে নেয়। এই টিকে থাকার লড়াই, এই বারবার উঠে দাঁড়ানোর গল্পই সাতক্ষীরাকে করে তুলেছে আশার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আন্তর্জাতিক আশা দিবসে তাই আমরা বলতে পারি, কিরিবাতিতে যেমন প্রথম সূর্যের আলো পড়ে, সাতক্ষীরার মানুষের চোখেও তেমনি প্রতিদিন নতুন সূর্য ওঠে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে, নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। সুন্দরবনের সবুজ, নদীর জল, আমের মিষ্টতা আর মানুষের অদম্য জীবনীশক্তি, এই সব মিলিয়েই সাতক্ষীরা আমাদের কাছে থেকে যাবে চিরকালের আশার প্রতীক হয়ে।










