কৌতূহলই হতে পারে উদ্ভাবনের চাবিকাঠি: এমব্রেস ইয়োর গীকনেস ডে
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ১৩ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘এমব্রেস ইয়োর গীকনেস ডে’। এটি কোনো রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; বরং মার্কিন দম্পতি, টমাস রয় ও রুথ রয়ের প্রতিষ্ঠিত একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। মানুষের তথাকথিত “অদ্ভুত” বা অত্যন্ত বিশেষায়িত শখ, গভীর আগ্রহ এবং জ্ঞানচর্চাকে কোনো রকম লোকলজ্জা ছাড়াই গর্বের সঙ্গে প্রকাশ করার সুযোগ করে দিতেই দিবসটির সূচনা করা হয়।
‘গীক’ শব্দটির ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় ইংরেজি ভাষায় এটি অদ্ভুত, বিচিত্র বা সামাজিকভাবে অপ্রচলিত ব্যক্তিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। এমনকি উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কিছু ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী ও সার্কাসের সঙ্গে শব্দটির সম্পর্ক ছিল। তবে তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শব্দটি তার নেতিবাচক অর্থ হারিয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও গভীর আগ্রহের ইতিবাচক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।
মানবসভ্যতার ইতিহাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রতিটি বড় পরিবর্তনের সূচনায় ছিল একটি প্রশ্ন, একটি কৌতূহল কিংবা কোনো বিষয়কে গভীরভাবে জানার অদম্য আকাক্সক্ষা। মানুষ আকাশের নক্ষত্রের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে, প্রকৃতির নিয়ম বুঝতে চেয়েছে এবং সমুদ্রের অজানা জগৎ অনুসন্ধান করেছে। চাকা থেকে কম্পিউটার, মুদ্রণযন্ত্র থেকে মহাকাশযান, বিদ্যুৎ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাÑপ্রতিটি আবিষ্কারের পেছনেই ছিল কিছু মানুষের অসাধারণ আগ্রহ ও নিরলস অনুসন্ধান। এমব্রেস ইয়োর গীকনেস ডে সেই মানবিক বৈশিষ্ট্যেরই প্রতীক, যা মানুষকে জ্ঞানস্রষ্টা ও উদ্ভাবকে পরিণত করে।
ইসলামের দৃষ্টিতেও জ্ঞানচর্চা ও চিন্তাশীলতা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। পবিত্র কুরআনের প্রথম ওহি ছিল ‘পড়’। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান?” (সূরা আয-যুমার: ৯)। হাদিসে এসেছে, “জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।” (সুনান ইবনে মাজাহ)। তাই কোনো উপকারী বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন, গবেষণা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয়। কুরআন মানুষকে সৃষ্টিজগত, প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের নিদর্শনসমূহ নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান জানায়। তবে ইসলাম একই সঙ্গে ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়; জ্ঞানচর্চা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষকে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং মানবকল্যাণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে বরং আরও সমৃদ্ধ করে।
ইসলামের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক দর্শনের সঙ্গে মিল রেখেই বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বও আজ কৌতূহলী মেধাবীদের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, সফটওয়্যার নির্মাতা ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তার সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে কোনো না কোনো বিষয়ে গভীর আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা, যা একসময় ‘গীক’ বৈশিষ্ট্য হিসেবেই বিবেচিত হতো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি এবং রোবোটিক্সের এই যুগে কৌতূহলী ও সৃজনশীল মানুষই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিজ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তিশিক্ষা এবং উদ্ভাবনী কর্মকা-ে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে এবং গবেষণাকে সম্মান করে, সেই সমাজই দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যায়।
এমব্রেস ইয়োর গীকনেস ডে নিছক কোনো মজার দিবস নয়; এটি মানুষের জ্ঞানান্বেষী মনন, সৃজনশীল প্রতিভা এবং স্বকীয় পরিচয়ের প্রতি এক আন্তরিক সম্মানজ্ঞাপন। আসুন, আমরা আমাদের কৌতূহল ও আগ্রহকে কেবল ব্যক্তিগত শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞান, উদ্ভাবন ও মানবকল্যাণের শক্তিতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করি।









