জিএম আমিনুল হক: সাতক্ষীরায় বৈশাখের শুরুতেই জনজীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে তীব্র দাবদাহে। একদিকে আগুনঝরা রোদ, অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। এতে বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিÑসবখানেই নাভিশ্বাস দশা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন জেলাবাসী।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, সাতক্ষীরায় তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করলেও বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় (৮৫-৯০%) অনুভূত তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছেছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, আগামী ৫-৬ দিনে বৃষ্টির সম্ভাবনা ক্ষীণ, ফলে গরমের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
গত এক সপ্তাহ ধরে সাতক্ষীরা সদরসহ সাতটি উপজেলায় দিনে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। রাতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ছে। সদরের ধুলিহর এলাকার কৃষক ইমরান হোসেন বলেন, “সারাদিন মাঠে কাজ করে রাতে যে একটু ঘুমাব, তার উপায় নেই। রাত ১২টায় কারেন্ট গিয়ে আসে ভোরে। হাতপাখা ঘুরিয়েই রাত পার করতে হচ্ছে।”
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। শহরের জজকোর্ট এলাকার দোকানদার আলতাফ হোসেন জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা আইসক্রিম ও কোল্ড ড্রিংকস গলে নষ্ট হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়ে ব্যবসা সামাল দেওয়ার উপায় নেই ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে। একই অবস্থা শহরের সেলুন, ওয়েল্ডিং ও কম্পিউটার কম্পোজের দোকানগুলোতেও।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকলেও লোডশেডিংয়ের সময় ওটি ও আইসিইউ ছাড়া কোথাও বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই। শিশু ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন সালমা বেগম বলেন, “বাচ্চার শ্বাসকষ্টের জন্য নেবুলাইজার দিতে গিয়ে দেখি কারেন্ট নেই। এই গরমে রোগীরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।” জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে হিট স্ট্রোক ও ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় চার্জার লাইট বা মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছে। ডিবি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এমাদুল ইসলাম বলেন, “স্কুলে সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও বিদ্যুতের অভাবে কিছুই ব্যবহার করা যাচ্ছে না।”
সাতক্ষীরার অর্থনীতির মূল ভিত্তি চিংড়ি ও বোরো চাষ এখন বড় ঝুঁকিতে। আশাশুনির ঘের মালিক ফারুক হোসেন জানান, তীব্র গরমে ঘেরের পানি শুকিয়ে অক্সিজেন সংকট দেখা দিচ্ছে। এয়ারেটর চালানোর মতো বিদ্যুৎ না থাকায় মাছ মরে ভেসে উঠছে। অন্যদিকে, সেচ পাম্পগুলো বন্ধ থাকায় বোরো ধান চিটা হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা।
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্যমতে, জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৩০ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮৫-৯০ মেগাওয়াট। সমিতির জেনারেল ম্যানেজার জানান, চাহিদার তুলনায় ৪০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট রুটিন মানা হচ্ছে না।
সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শেখ আজাদ বলেন, “লোডশেডিং হলেও যেন একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে করা হয়, যাতে মানুষ প্রস্তুতি নিতে পারে। বিশেষ করে হাসপাতাল ও সেচ পাম্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ দেওয়া প্রয়োজন।”
তীব্র গরমে একটু বৃষ্টির জন্য যখন হাহাকার চলছে, তখন অনিয়মিত লোডশেডিং জেলাবাসীর কষ্টকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আপাতত হাতপাখা আর বৃষ্টির প্রার্থনাই যেন সাতক্ষীরাবাসীর একমাত্র অবলম্বন।