৭ নভেম্বর-বিপ্লব ও সংহতির অমর চেতনা
অসীম কুমার সরকার
৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর দিন, একটি জাতির আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার হত্যার পর যখন দেশ এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত, যখন স্বাধীনতার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হওয়ার পথে, ঠিক তখনই সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অস্থিরতার মধ্যে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নেতৃত্ব দেন।
জিয়াউর রহমান শুধু একজন সেনাপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বীর, একজন দেশপ্রেমিক, একজন রাষ্ট্রনায়ক। জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে তিনি যুদ্ধ করেছেন বুক চিতিয়ে। তাঁর বীরত্বের জন্য জাতি তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করেছে। একজন সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার এই যাত্রা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।
১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর দেশ চলছিল চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। চলছিল একের পর এক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান। শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল সেনাবাহিনীতে। ৩ নভেম্বর ভোরে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যুত্থান হয়। সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনরত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গৃহবন্দি করা হয়। দেশ তখন চরম অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছিল। চারদিকে গুজব, আতঙ্ক আর ক্ষমতা দখলের লড়াই। সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জমে উঠেছিল প্রচ- ক্ষোভ। তারা দেখছিল, মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনাপতি, যিনি তাঁদের কাছে সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং জনপ্রিয়, তাঁকে অন্যায়ভাবে বন্দি করে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে দেশ চলে যাচ্ছিল একদলীয় শাসনের দিকে। এই ক্ষোভ থেকে সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিক এবং জনগণের মধ্যে এক ঐক্য তৈরি হয়। সবার একটাই দাবি ছিলÑজিয়াকে মুক্ত করতে হবে, দেশকে বাঁচাতে হবে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ভোররাত থেকেই ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সিপাহিরা রাস্তায় নেমে আসেন। ‘সিপাহী-জনতা ভাই ভাই’Ñএই স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকা। জনগণও রাস্তায় নেমে সৈনিকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। এই বিপ্লব কোনো সাধারণ ক্ষমতা দখলের চেষ্টা ছিল না, এটি ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব। সেই রাতেই সিপাহিরা জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। ৭ নভেম্বর তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে শৃঙ্খলা ও স্থিতি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর নেতৃত্বে দেশে ফিরে এসেছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র, ফিরে এসেছিল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ফিরে এসেছিল মানুষের বাক্স্বাধীনতা। তিনি বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে একটি স্বনির্ভর, আত্মমর্যাদাশীল জাতিতে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা বাংলাদেশি’Ñএই পরিচয়ই ছিল জাতীয় ঐক্যের মূলমন্ত্র। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে এক পতাকার নিচে এনে তিনি জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল গ্রামের মানুষের উন্নয়নের কর্মসূচি, ছিল কৃষকের হাসি ফোটানোর কর্মসূচি। খাল খনন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তিনি গ্রামবাংলার চেহারা বদলে দিয়েছিলেন।
আজ ৭ নভেম্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জাতি যখনই সংকটে পড়বে, তখনই একজন জিয়াউর রহমানের আদর্শ আমাদের পথ দেখাবে। তাঁর সততা, দেশপ্রেম, সাহসিকতা আজকের প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। শহীদ জিয়া নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ মরে যায়নি। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, যত দিন লাল-সবুজের পতাকা উড়বে, তত দিন ৭ নভেম্বর আর জিয়াউর রহমানের বীরত্বগাথা বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। লেখক: অসীম কুমার সরকার, ইউপিইও, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা









