আজ পহেলা বৈশাখ: সাতক্ষীরায় জল-মাটির গানে ১৪৩৩-এর আবাহন
oplus_0
নিজস্ব প্রতিনিধি: সময়ের চাকা আরও এক পাক ঘুরে এল। পুব আকাশে উদিত নতুন সূর্য আজ ধুয়ে মুছে দিয়েছে ১৪৩২ বঙ্গাব্দের জরাজীর্ণ ধূসর স্মৃতি। সাতক্ষীরার রূপসী সীমান্তজুড়ে আজ নতুন প্রাণের স্পন্দন। কপোতাক্ষ, বেতনা আর মরিচ্চাপের ঢেউয়ে ঢেউয়ে আজ বাজছে নতুনের জয়গান। আজ পহেলা বৈশাখ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই প্রথম প্রভাতে সাতক্ষীরা জেলাবাসীর হৃদয়ে বেজে উঠেছে সেই অবিনাশী সুরÑ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।
বাঙালির জীবনে বৈশাখ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো নয়; এ এক চিরন্তন অসাম্প্রদায়িক চেতনার নবায়ন। সাতক্ষীরার মাটি ও মানুষের জন্য এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই জনপদ দুর্যোগের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকে, আর বৈশাখ আসে তাদের সেই লড়াইয়ে নতুন প্রাণশক্তি জোগাতে। আজ ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এক মোহনায় মিলিত হয়েছে।
আজ ১৪ এপ্রিল, মঙ্গলবার। সাতক্ষীরা শহরের প্রাণকেন্দ্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংলগ্ন কালেক্টরেট পার্ক। ভোরের স্নিগ্ধ আলো যখন সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে ঘাসের ওপর আলপনা আঁকছিল, ঠিক তখনই শুরু হচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা। সকাল ৭টায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে সম্মিলিত কণ্ঠে হবে জাতীয় সংগীত। এরপরই সেই কাক্সিক্ষত অবিনাশী সুর ‘এসো হে বৈশাখ’।
কালেক্টরেট পার্কের এই প্রভাতি অনুষ্ঠানে থাকছে নতুনত্বের ছোঁয়া। স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠে ‘আহীর ভৈরব’ রাগের বাঁশির সুর ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। বক্তাদের কথায় বারবার উঠে আসবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। প্রকৃতির রুদ্ররূপ ছাপিয়ে মানুষ ও মানবতার জয়গান গাওয়াই এবারের প্রতিপাদ্য। সাতক্ষীরার প্রান্তিক জনপদের প্রতিটি মানুষ যেন একটি সুন্দর ও প্রীতি উজ্জ্বল নির্মল জীবনে প্রবেশ করতে পারেÑ এটাই সবার সমবেত প্রার্থনা।
সকাল সোয়া ৭টা। কালেক্টরেট পার্ক থেকে শুরু হবে বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রাকে বলা যায় ‘বাঙালির আত্মপরিচয়ের মিছিল’। শোভাযাত্রার ড্রেসকোড নিখাদ বাঙালিয়ানা। পুরুষদের পরনে পাঞ্জাবি, পায়জামা কিংবা লুঙ্গি; নারীদের পরনে লাল-সাদা বা বৈশাখী শাড়ি। ছোট ছোট শিশুদের মাথায় জাতীয় পতাকার ব্যান্ড আর হাতে কাগজের তৈরি একতারা।
এবারের শোভাযাত্রায় সাতক্ষীরার নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মাটির সরা চিত্র, বড় আকারের হাতি, ঘোড়া আর লোকজ পুতুলের প্রতিকৃতিগুলো ছিল চারুকলার শৈল্পিক ছোঁয়ায় নান্দনিক। ইউনেসকোর ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃত এই শোভাযাত্রা সাতক্ষীরার রাজপথকে আজ এক টুকরো শিল্পকলায় পরিণত করেছে। মিছিলটি যখন শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে এসে থামবে, তখন মনে হবে সমগ্র জেলা আজ এক বিন্দুতে এসে মিশেছে।
সাতক্ষীরার প্রাণকেন্দ্র শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক। এখানে আজ থেকে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলা। সকাল ৮টায় জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই মেলার দ্বার উন্মোচন করা হবে। মেলা মানেই শৈশবের সেই নাগরদোলা, রঙিন বাতাসি আর মাটির পুতুলের মায়া।
মেলার প্রতিটি স্টলে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সমাহার। সাতক্ষীরার ওল ও গুড় যেমন বিখ্যাত, মেলায় এসেছে সেই গুড় দিয়ে তৈরি মুড়ালি ও নাড়ু। মাটির তৈরি হাড়ি-পাতিল, সরা আর বাঁশ-বেতের তৈজসপত্র যেন আধুনিক প্লাস্টিকের যুগেও নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। মেলার এক কোণে বসেছে পিঠা উৎসবের আসর। ভাঁপা, পুলি আর তিল-পিঠার মৌ মৌ গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। গ্রামীণ নারীরা তাদের হাতের কাজের নকশিকাঁথা ও মৃৎশিল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন, যা মেলার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। সাত দিন ধরে চলা এই মেলা হবে সাতক্ষীরাবাসীর বিনোদন ও মিলনের প্রধান ক্ষেত্র।
বিকেল ৪টায় সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণের নীল আকাশে রঙের মেলা। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘ঘুড়ি উৎসব’। সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী ঘুড়িগুলো যখন আকাশের বুক চিরে উড়বে, তখন নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরদের উল্লাস ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে।
ঘুড়ি উৎসবের পাশাপাশি ছিল বীরত্বগাথা লাঠি খেলা। ঢোলের তালে তালে লাঠিয়ালদের কসরত এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করে। সাতক্ষীরার গ্রামাঞ্চল থেকে আসা দক্ষ লাঠিয়ালরা তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করেন। প্রাচীন এই লোকজ খেলাটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে আজও কতটা জনপ্রিয়, স্টেডিয়ামে আসা মানুষের ভিড় দেখলেই তা বোঝা যায়। এটি কেবল খেলা নয়, বরং অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়ার এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।
বিকেল ৫টায় মেলা প্রাঙ্গণে শুরু হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্থানীয় জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা পরিবেশন করবেন বাউল, ভাটিয়ালি ও গণসংগীত। গানের ফাঁকে ফাঁকে কবিতা আবৃত্তিতে থাকছে জীবনানন্দ দাশ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৈশাখী বন্দনা।
অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণী পর্বে অংশ নেবেন জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। চিত্রাঙ্কন ও কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। ‘সাংস্কৃতিক শক্তিই পারে মাদক, সন্ত্রাস ও মৌলবাদমুক্ত একটি সমাজ গড়তে।’ আজ সাতক্ষীরার এই মায়াবী সন্ধ্যায় যখন প্রদীপ প্রজ্বলন করা হবে, তখন মনে হবে এই আলোই পথ দেখাবে আগামী দিনের সমৃদ্ধির।
সাতক্ষীরার স্কুল-কলেজগুলোতেও পালিত হচ্ছে উৎসবমুখর প্রাণের বৈশাখ। জেলা শিশু একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হওয়া চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ছোট ছোট শিশুদের রং-তুলিতে ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার ম্যাপ, সুন্দরবনের হরিণ আর নদী তীরের মানুষের জীবন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই দিনটিকে ঘিরে থাকচে প্রবল উৎসাহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ‘হ্যাপী বেঙ্গলি নিউ ইয়ার’ নয়, বরং ‘শুভ নববর্ষ’ ধ্বনিতে মুখরিত ছিল সাতক্ষীরার ডিজিটাল জগত।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ ও সাতক্ষীরা সিটি কলেজ প্রাঙ্গণেও শিক্ষার্থীরা আয়োজন করেছে বৈশাখী আড্ডার। আধুনিকতার ভিড়েও তারা ভুলে যায়নি শেকড়ের কথা। মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ আর ভর্তার আসর বসেছে প্রতিটি ঘরে ঘরে। যদিও বর্তমান বাজারে ইলিশের আকাশচুম্বী দাম, তবুও ঐতিহ্যের টানে অনেকেই সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন বাঙালির চিরাচরিত স্বাদ নেওয়ার।
উৎসব কেবল সামর্থ্যবানদের জন্য নয়Ñএই ধারণা থেকে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন এবার গ্রহণ করেছে প্রশংসনীয় কিছু উদ্যোগ। জেলার সদর হাসপাতাল, কেন্দ্রীয় কারাগার ও সরকারি শিশু পরিবারগুলোতে (এতিমখানায়) পরিবেশন করা হয়েছে উন্নত মানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার। কারাবন্দিদের জন্যও আজকের দিনটি ছিল এক চিলতে মুক্তির আনন্দ। হাসপাতালে রোগীদের পাতে যখন বৈশাখী ব্যঞ্জন তুলে দেওয়া হয়, তখন তাদের মলিন মুখে ফুটে ওঠে এক চিলতে হাসি। এটিই বৈশাখের প্রকৃত সার্থকতাÑযেখানে কেউ বাদ পড়ে না।
বাংলা সনের প্রচলন নিয়ে রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। ১৫৫৬ সালে সম্রাট আকবরের শাসনামলে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ‘ফসলি সন’ হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। নক্ষত্র ‘বিশাখা’ থেকে নাম হয়েছে বৈশাখ। সম্রাট আকবর আমলের সেই রীতি আজ আর খাজনা আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এটি বাঙালির সর্বজনীন উৎসব।
সাতক্ষীরার ব্যবসায়ী মহলে আজও ‘হালখাতা’র ঐতিহ্য অমলিন। সুলতানপুর বড় বাজার থেকে শুরু করে শহরের ছোট-বড় সব দোকানেই লাল কভারের নতুন খাতা খোলা হয়েছে। পুরনো দেনা চুকিয়ে নতুন বছরের হিসেব শুরু করার এই রেওয়াজ সাতক্ষীরার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক। মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যকার সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার এই দিনটি আজও সমান জনপ্রিয়।
সাতক্ষীরা জেলার মানুষ নানা সমস্যায় জর্জরিত। নদী ভাঙন, লবণাক্ততা আর সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনযুদ্ধ সবসময়ই কঠিন। তবুও ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে তারা এক নতুন স্বপ্ন দেখছে। মেলা প্রাঙ্গণে কথা হয় স্থানীয় প্রবীণ এক শিক্ষকের সাথে। তিনি বলেন, “আমরা চাই আমাদের জেলার নদীগুলো খনন হোক, সুন্দরবন রক্ষা পাক এবং আমাদের সন্তানরা যেন একটি অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল পরিবেশে বড় হতে পারে।”
১৪৩৩ বঙ্গাব্দ সাতক্ষীরার জন্য নিয়ে আসুক সমৃদ্ধি। কৃষকের গোলা ভরে উঠুক বোরো ধানের সোনালী হাসিতে, বেতনা ও মরিচ্চাপ নদী ফিরে পাক তাদের পুরনো নাব্য। সাতক্ষীরা থেকে রাজধানী পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন ঘটুকÑএই প্রত্যাশা আজ জেলাবাসীর প্রতিটি মানুষের মনে।
‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’Ñ কবিগুরুর এই কালজয়ী পঙক্তিই ছিল আজকের সারাদিনের মূল সুর। সাতক্ষীরার কালেক্টরেট পার্ক থেকে রাজ্জাক পার্ক, স্টেডিয়াম থেকে প্রত্যন্ত গ্রামÑ সর্বত্রই একই সুর, একই উন্মাদনা।
আজ সূর্য ডোবার সাথে সাথে শেষ হচ্ছে না উৎসবের আমেজ। বরং আগামী সাত দিন মেলা প্রাঙ্গণে চলবে প্রাণের মেলা। সাতক্ষীরার আকাশে এখন যে নতুন সূর্য হাসছে, তা যেন কেবল আলোর উৎস না হয়ে হয়ে ওঠে প্রেরণার উৎস। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়ার শপথ নিয়ে সাতক্ষীরাবাসী আজ ঘরে ফিরছে। নতুন বছর সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি আর সমৃদ্ধি। সাতক্ষীরার প্রতিটি ঘর ভরে উঠুক অনাবিল আনন্দে। প্রগতির এই যাত্রা চলুক অনন্তকাল। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩!







