আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরীক্ষা বিরোধী দিবস
সাকিবুর রহমান বাবলা
পারমাণবিক শক্তির অহংকার নয়, মানবতার নিরাপত্তার অঙ্গীকারÑ ‘পারমাণবিক পরীক্ষা কোনো জাতির শক্তিমত্তার পরিচয় নয়। বরং এটি দেশগুলোর মধ্যে আস্থা ভেঙে দেয়, পাল্টাপাল্টি পরীক্ষার ঝুঁকি বাড়ায়, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে ত্বরান্বিত করে এবং অতীতের পারমাণবিক পরীক্ষার ক্ষত বহনকারী জনগোষ্ঠীর প্রতি গভীর অবিচার করে।”-আন্তোনিও গুতেরেস, মহাসচিব, জাতিসংঘ।
মানবসভ্যতা বিজ্ঞানের অসাধারণ অগ্রগতির মাধ্যমে অনেক বিস্ময়কর অর্জন করেছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির কিছু অধ্যায় মানবজাতির জন্য গভীর উদ্বেগ ও অনুশোচনার কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র ও তার পরীক্ষা তেমনই এক বাস্তবতা। শক্তির প্রদর্শন, সামরিক আধিপত্য কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে পরিচালিত পারমাণবিক পরীক্ষাগুলো পৃথিবীর পরিবেশ, মানবস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিতেই প্রতি বছর ২৯ আগস্ট পালিত হয় আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরীক্ষা বিরোধী দিবস।
২০০৯ সালের ২ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ৬৪/৩৫ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে দিবসটি ঘোষণা করা হয়। ২০১০ সাল থেকে এটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। কাজাখস্তানের উদ্যোগে গৃহীত এই দিবসের লক্ষ্য হলো পারমাণবিক পরীক্ষার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা এবং একটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত ও নিরাপদ বিশ্বের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা।
২৯ আগস্ট তারিখটি নির্বাচনের পেছনে রয়েছে ইতিহাসের গভীর তাৎপর্য। ১৯৯১ সালের এই দিনে কাজাখস্তানের সেমিপালাতিনস্ক পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্র স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ একই স্থানে ১৯৪৯ সালের ২৯ আগস্ট সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা পরিচালনা করেছিল। ফলে এই দিনটি একদিকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনার স্মারক, অন্যদিকে সেই বিপজ্জনক পথ থেকে ফিরে আসার প্রতীক।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অফিশিয়ালি বা প্রকাশ্যে পারমাণবিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে বিশ্বের ৮টি দেশ। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো মরুভূমিতে ‘ট্রিনিটি টেস্ট’-এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষা পরিচালিত হয়। এরপর শুরু হয় এক নতুন যুগ—পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার যুগ। গত আট দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ২,০৫০-এরও বেশি পারমাণবিক পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। ইতিহাসে সর্বাধিক পরীক্ষা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার সংখ্যা এক হাজার ত্রিশ এরও বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বর্তমান রাশিয়া। এছাড়া ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান এবং উত্তর কোরিয়াও প্রকাশ্যে পারমাণবিক পরীক্ষা পরিচালনা করেছে।
ইসরাইল ও ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ভিন্ন ও জটিল বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার না করলেও আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী তাদের কাছে প্রায় ৯০টি ওয়ারহেড রয়েছে এবং তাদের নিজ ভূখ-ে কোনো প্রকাশ্য পরীক্ষা না চালালেও ১৯৭৯ সালের ভেলার ঘটনাকে একটি যৌথ গোপন পরীক্ষা হিসেবে সন্দেহ করা হয়। অন্যদিকে ইরান তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে তাদের অতীতে গোপন সামরিক প্রকল্পের উপাদান ছিল। যদিও ইরান বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, তবে দেশটির কোনো পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালানোর রেকর্ড নেই এবং খামেনির ফতোয়া অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ।
প্রথমদিকে পারমাণবিক অস্ত্রকে বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতা ও সামরিক শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত মূল্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় বিকিরণ শুধু পরীক্ষার মুহূর্তেই ক্ষতি করে না; এর প্রভাব বহু বছর, এমনকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের শরীর ও পরিবেশে বিরাজমান থাকে। ক্যানসার, জন্মগত ত্রুটি, জিনগত পরিবর্তন, বন্ধ্যাত্ব এবং নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের সঙ্গে পারমাণবিক বিকিরণের সম্পর্ক বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন পরীক্ষাস্থলের আশপাশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী আজও সেই ক্ষতির ভার বহন করছে।
পরিবেশগত ক্ষতিও কম নয়। পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হয়। বহু অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কিছু এলাকা দীর্ঘ সময়ের জন্য মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সেমিপালাতিনস্ক, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, নেভাদা মরুভূমি কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপ আজও সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালে গৃহীত হয় ‘সার্বিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি’। চুক্তিটির উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর যেকোনো স্থানে, যেকোনো দেশের দ্বারা পরিচালিত সব ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা। যদিও চুক্তিটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি, তবুও এটি একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মানদ- প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে গত কয়েক দশকে পারমাণবিক পরীক্ষার সংখ্যা বেশ কমে এসেছে। একবিংশ শতাব্দীতে প্রকাশ্যে পারমাণবিক পরীক্ষা পরিচালনা করেছে মূলত উত্তর কোরিয়া, যা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
চুক্তিটি কার্যকর করতে এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের অনুমোদন বা অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তবে এর মধ্যেই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাভিত্তিক ‘সিটিবিটিও’ বিশ্বজুড়ে উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা পৃথিবীর যেকোনো স্থানে সংঘটিত পারমাণবিক বিস্ফোরণ শনাক্ত করতে সক্ষম। আধুনিক বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আজ প্রমাণ করেছে যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হওয়া অপরিহার্য নয়।
২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরীক্ষা বিরোধী দিবস বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এ বছর সিটিবিটি স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার ৩০ বছর এবং সেমিপালাতিনস্ক পরীক্ষাকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ৩৫ বছর পূর্তি পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব; সকল পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রকে পরীক্ষার ওপর বিদ্যমান স্থগিতাদেশ বজায় রাখা এবং সিটিবিটি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
আজকের বিশ্বে যখন বিভিন্ন অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন পারমাণবিক পরীক্ষার বিরুদ্ধে এই দিবসের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। কারণ একটি মাত্র পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরিণতি সীমান্ত মানে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র মানবজাতির ওপর। তাই পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি মানবতা, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরীক্ষা বিরোধী দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—শান্তি কখনো অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় আস্থা, সংলাপ, সহযোগিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে। আসুন, আমরা এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি যেখানে কোনো শিশু তেজস্ক্রিয়তার ভয় নিয়ে বড় হবে না, কোনো জনগোষ্ঠী পারমাণবিক পরীক্ষার ক্ষত বহন করবে না এবং কোনো রাষ্ট্র শক্তি প্রদর্শনের নামে মানবতার ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে না। পারমাণবিক পরীক্ষার অবসান ঘটিয়ে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলাই হোক এই দিবসে আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।











