আশাশুনিতে চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে, হুমকির মুখে রপ্তানি বাণিজ্য
আশাশুনি সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও মাছ আড়তে চিংড়িতে জেলি ও বিভিন্ন অপদ্রব্য পুশ করে ওজন বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র সিরিঞ্জের মাধ্যমে চিংড়ির শরীরে জেলি, স্টার্চ ও রাসায়নিক পদার্থ প্রবেশ করিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এতে একদিকে যেমন সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে জনবস্বাস্থ্য ও দেশের চিংড়ি রপ্তানি খাতও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বুধহাটা, কাদাকাটি, দরগাপুর, মহিষকুড়, গোয়ালডাঙ্গা, প্রতাপনগর, আনুলিয়া, মহিষাডাংগা ও আশাশুনি সদর বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চিংড়ি কেনাবেচা হয়।
এসব বাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চিংড়ির শরীরে সিরিঞ্জ দিয়ে জেলি জাতীয় পদার্থ প্রবেশ করিয়ে কৃত্রিমভাবে ওজন বাড়াচ্ছেন। বাইরে থেকে মাছ স্বাভাবিক মনে হলেও রান্না বা কাটার পর ভেতরে জেলির মতো পদার্থ দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা। স্থানীয় গৃহিণী শিউলী রানী বলেন, “বাজার থেকে চিংড়ি কিনে বাসায় এনে পরিষ্কার করার সময় দেখি ভেতর থেকে সাদা জেলির মতো কিছু বের হচ্ছে।
পরে জানতে পারি এগুলো পুশ করা চিংড়ি।” মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিংড়িতে ব্যবহৃত এসব অপদ্রব্য মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে নিম্নমানের রাসায়নিক বা জেলি জাতীয় পদার্থ শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি, লিভার ও পাকস্থলীতে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা ও হরমোনজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
আশাশুনি উপজেলা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিংড়ি উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার হাজারো ঘের মালিক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী চিংড়ি শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাগদা ও গলদা চিংড়ি দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়। কিন্তু পুশকৃত চিংড়ির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির সুনাম ক্ষুণœ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মাছ ব্যবসায়ী আমিন উদ্দীন বলেন, “কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো খাত আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিদেশি ক্রেতারা এখন বাংলাদেশের চিংড়ির মান নিয়ে সন্দেহ করছে। এভাবে চলতে থাকলে রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগবে।” স্থানীয় চাষিদের অভিযোগ, বহুবার প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ পাওয়া যায়নি। মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হলেও তা নিয়মিত নয়।
ফলে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবার আগের মতো পুশ বাণিজ্য শুরু হয়। চিংড়ি চাষি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা যারা সৎভাবে চিংড়ি চাষ করি, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। পুশের কারণে বিদেশি বাজারে পুরো এলাকার চিংড়ির বদনাম হচ্ছে।” এদিকে, স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগÑপ্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি এই চক্রকে নীরবে সহযোগিতা করায় অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
আশাশুনি উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভেজাল ও পুশ প্রতিরোধে মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।সচেতন মহল বলছেন, চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশের মতো অপরাধ বন্ধে নিয়মিত বাজার তদারকি, নমুনা পরীক্ষা ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা জরুরি। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। অন্যথায় আশাশুনির সম্ভাবনাময় চিংড়ি শিল্প ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।






