সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ১২ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব হাতি দিবস। বিশ্বের বৃহত্তম স্থলচর প্রাণী হাতির সংরক্ষণ, সুরক্ষা এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১২ সাল থেকে এই আন্তর্জাতিক দিবসটি পালন করা হচ্ছে। ২০১১ সালে কানাডীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা প্যাট্রিসিয়া সিমস, কানাজওয়েস্ট পিকচার্সের মাইকেল ক্লার্ক এবং থাইল্যান্ডভিত্তিক এলিফ্যান্ট রিইন্ট্রোডাকশন ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি-জেনারেল সিভাপোর্ন দরদারানন্দ এই উদ্যোগের ধারণা দেন। পরে ২০১২ সালের ১২ আগস্ট এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের শতাধিক বন্যপ্রাণী সংস্থা এবং অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দিবসটি পালন করে আসছে।
বিশ্ব হাতি দিবস কেবল একটি প্রাণীকে ঘিরে সচেতনতার দিন নয়; এটি প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার একটি বৈশ্বিক উপলক্ষ। কারণ হাতি শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিজ্ঞানীরা হাতিকে “ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার” বা বাস্তুতন্ত্র নির্মাতা এবং “কী-স্টোন প্রজাতি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থাৎ, একটি বন বা প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তাদের অনুপস্থিতি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
হাতির দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রকৃতিকে নানা উপায়ে সমৃদ্ধ করে। তারা দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে এবং ফল ও উদ্ভিদ খাওয়ার পর মলের মাধ্যমে অসংখ্য বীজ বিস্তার করে। এর ফলে নতুন বন সৃষ্টি হয় এবং উদ্ভিদের জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। তাদের বিশাল দেহ ঘন ঝোপঝাড় ভেঙে বনভূমির মধ্যে চলাচলের পথ তৈরি করে, যা ছোট প্রাণীদের জন্য নিরাপদ চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে সূর্যের আলো বনভূমির নিচের স্তরে পৌঁছাতে সাহায্য করে, ফলে নতুন উদ্ভিদ জন্মানোর পরিবেশ তৈরি হয়।
খরার সময় হাতিরা মাটি খুঁড়ে পানির উৎস তৈরি করতে পারে, যা শুধু তাদের নয়, অসংখ্য প্রাণীর জীবনরক্ষার মাধ্যম হয়ে ওঠে। বনের মধ্যে তাদের তৈরি করা ফাঁকা স্থান নতুন চারাগাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে এবং বনকে অতিরিক্ত ঘন হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। হাতি হারিয়ে গেলে বহু উদ্ভিদের বীজ বিস্তার প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে, বনভূমির গঠন পরিবর্তিত হবে এবং অসংখ্য প্রাণী তাদের আবাসস্থল হারাবে। তাই সংরক্ষণবিদদের ভাষায়, “হাতিকে রক্ষা করা মানে প্রথিবীকে রক্ষা করা।”
হাতির গুরুত্ব কেবল জীববৈচিত্র্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৫ স্থলজ জীববৈচিত্র্য, বনভূমি ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়। হাতি সংরক্ষণ সেই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম কার্যকর উপায়। বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা, ভূমির অবক্ষয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে হাতি এসডিজি-১৫ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধেও হাতির অবদান উল্লেখযোগ্য। আফ্রিকার বৃষ্টিবনে হাতিরা দ্রুতবর্ধনশীল গাছপালা বেশি খাওয়ার ফলে ধীরগতিতে বেড়ে ওঠা শক্ত কাঠের গাছগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। এসব গাছ দীর্ঘমেয়াদে অধিক পরিমাণ কার্বন শোষণ ও সংরক্ষণ করে। ফলে সুস্থ হাতির উপস্থিতি বনভূমির কার্বন ধারণক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এ কারণেই অনেক গবেষক হাতিকে “প্রকৃতির জলবায়ু রক্ষক” হিসেবে অভিহিত করেন।
তবে আজ বিশ্বজুড়ে হাতির অস্তিত্ব নানা কারণে হুমকির মুখে। বিশ্ব হাতি দিবসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো অবৈধ চোরাশিকার ও হাতির দাঁতের বাণিজ্য বন্ধ করা। আন্তর্জাতিক বাজারে হাতির দাঁতের চাহিদা এখনও বহু অঞ্চলে অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার হাতি শিকারিদের হাতে প্রাণ হারায়। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী পাচারচক্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি বিশ্ব হাতি দিবসের অন্যতম বার্তা।
আরেকটি বড় সংকট হলো আবাসস্থল ধ্বংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বন উজাড়, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে হাতিদের প্রাচীন চলাচলের পথ বা ‘এলিফ্যান্ট করিডোর’ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে হাতিরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে এবং মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়ছে। এ সংঘাতে একদিকে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, অন্যদিকে হাতিরাও হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
বাংলাদেশে এই সংকট বিশেষভাবে দৃশ্যমান। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ এবং বন বিভাগের ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে স্থায়ী বন্য হাতির সংখ্যা ছিল মাত্র ২৬৮টি। এছাড়া ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে প্রায় ৯৩টি আন্তসীমান্তীয় হাতি চলাচল করে এবং বন্দি হাতির সংখ্যা ছিল ৯৬টি। বিভাগভিত্তিক জরিপে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে ৬৫টি, কক্সবাজার দক্ষিণে ৬৩টি, কক্সবাজার উত্তরে ৫৪টি, লামায় ৩০টি, বান্দরবানে ১১টি, পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণে ২৮টি এবং উত্তরে ১৭টি হাতির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। মোট হাতির মধ্যে ৬৫টি পুরুষ, ১৭২টি স্ত্রী এবং ২৯টি শাবক ছিল।
দুঃখজনকভাবে ২০১৬ সালের পর দেশে আর কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হাতি জরিপ পরিচালিত হয়নি। ফলে গত এক দশকে হাতির সংখ্যা কতটা বেড়েছে বা কমেছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। অথচ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ২৬টি বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা যায়। গুলি, বিষপ্রয়োগ এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়াও মৃত্যুর বড় কারণ।
বাংলাদেশে হাতির প্রধান আবাসস্থল কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, শেরপুর, নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে বিস্তৃত। কিন্তু এসব অঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ করিডোর এখন সংকুচিত বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। জরিপে বাংলাদেশে ১২টি প্রধান হাতি করিডোর শনাক্ত করেছিল, যার মধ্যে আটটি কক্সবাজার অঞ্চলে। রোহিঙ্গা শিবিরের সম্প্রসারণ, সড়ক নির্মাণ, কৃষি সম্প্রসারণ এবং বাউন্ডারি ওয়ালের কারণে অনেক করিডোর কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শেরপুর ও ময়মনসিংহ সীমান্ত অঞ্চলে কাঁটাতারের বেড়াও হাতির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষ ও হাতির সম্পর্ক একসময় ছিল পারস্পরিক নির্ভরতা, শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের। প্রাচীন সভ্যতায় হাতি ছিল শক্তি, জ্ঞান ও মর্যাদার প্রতীক। যুদ্ধক্ষেত্রে হস্তীবাহিনী ছিল সামরিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। দুর্গম বনাঞ্চল থেকে কাঠ পরিবহন, যোগাযোগ ও ভারী কাজেও হাতির ব্যবহার ছিল ব্যাপক। বিস্তীর্ণ বনভূমি থাকায় মানুষ ও হাতি নিজ নিজ পরিসরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত।
কিন্তু আধুনিক যুগে সেই সম্পর্ক ক্রমেই সংঘাতের সম্পর্কে রূপ নিয়েছে। বনভূমি দখল, খাদ্য সংকট এবং করিডোর ধ্বংসের ফলে হাতিরা লোকালয়ে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে হাতির দাঁতের বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক লোভ তাদের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত করেছে মানুষকেই। বহু স্থানে পর্যটন, বিনোদন কিংবা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বন্দি হাতিদের ওপর এখনও নির্যাতন চালানো হয়।
এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে হাতির খাদ্যোপযোগী গাছের বাগান এবং বাঁশবাগান তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বনাঞ্চলে নতুন জলাধার খনন, মরিচ ও লেবুগাছের পরিবেশবান্ধব বেড়া নির্মাণ, হাতির চলাচলের পথ পুনরুদ্ধার এবং নতুন হাতি শুমারির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর বন্দি হাতিদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বিশেষ প্রকল্পও শুরু হয়েছে।
এছাড়া মাঠপর্যায়ে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন, জিপিএস ট্র্যাকিং, ক্যামেরা ট্র্যাপিং এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সংঘাত নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে আন্তসীমান্তীয় করিডোর পুনরুদ্ধার নিয়েও আলোচনা চলছে।
বিশ্ব হাতি দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, হাতির ভবিষ্যৎ কেবল একটি প্রাণীর ভবিষ্যৎ নয়; এটি বনভূমি, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু এবং মানবসমাজের ভবিষ্যতের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রকৃতির দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাসে হাতি এক অনন্য স্থপতি, যাদের উপস্থিতি একটি সুস্থ পরিবেশের প্রতীক। তাদের হারিয়ে ফেলা মানে শুধু একটি প্রজাতিকে হারানো নয়, বরং একটি জটিল ও সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া।
তাই বিশ্ব হাতি দিবসের আহ্বান একটাইÑচোরাশিকার বন্ধ করতে হবে, করিডোর ও আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে, মানুষ-হাতি সংঘাত কমাতে হবে এবং হাতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ হাতি বাঁচলে বন বাঁচবে, বন বাঁচলে জীববৈচিত্র্য বাঁচবে, আর জীববৈচিত্র্য বাঁচলে টিকে থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রথিবী।