রফিকুর রশীদ
সাদা-কালো।
উপন্যাসের নাম। লেখক ফেরদৌস হাসান। নাটকের মানুষ। সিনেমারও। আবার উপন্যাসেও দুর্দান্ত শক্তিমান। বছরে বছরে একটি করে জীবনঘষা আগুনের স্পর্শমাখা উপন্যাস আমরা পাই তাঁর কাছ থেকে। এবারেরটি সাদা-কালো। যথার্থই সাদা-কালো। কৃত্রিম রঙের কোনো ছোঁয়া নেই। পাঠকের চিন্তা বা দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করে গোলকধাঁধায় ফেলার কোনো চেষ্টা নেই। যা দেখেছেন, তা-ই বিশ্বস্তার সঙ্গে এঁকেছেন। তবু সেটা ফটোগ্রাফি নয়, আবার ইতিহাস লেখাও নয়; হয়েছে শিল্প। লেখকের উদ্দিষ্ট লক্ষ শিল্পের সুউচ্চ এবং আধুনিক মাধ্যম উপন্যাস রচনা করা। সেই কাজটি তিনি অতিশয় নিপুণ হাতে করেছেন সাদা-কালোতে। সময়কে পাঠ করার এবং মানুষকে বুকের ভেতরে ধারণ করার সংবেদনশীল এবং প্রখর দৃষ্টিভঙ্গি লেখকের আছে। মস্তিষ্কশাসিত নয়, শিল্পের প্রায় সব শাখার শ্রেষ্ঠ যা কিছু আমরা পেয়েছি, নিঃসন্দেহে তা মানবহৃদয়ের জারকরসে জারিত হয়ে এসেছে বলেই শ্রেষ্ঠ। হৃদয়শাসিত সাহিত্যই জয়ের পতাকা উড়িয়ে শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক অর্জন করে। ফেরদৌস হাসানের সাদা-কালো তেমনই ব্যঞ্জনাময় একটি উপন্যাস।
গল্প-উপন্যাস কিংবা নাটকের একটি কালপরিধি বা টাইমফ্রেম থাকে। সাদা-কালো উপন্যাসের জন্য লেখক এমন একটি ধোঁয়াশামাখা সময়কে ধরেছেন, যে সময়টা একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জন্য ছিল বিপুল সম্ভাবনাময়, আবার অপরিমেয় দুঃখ দারিদ্র্য দুর্নীতি ও হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত সময়। সম্ভাবনার এত বড় এত করুণ অপচয় বোধ করি আর কখনো হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তো সহসা একদিনের বাঁশি বাজানোর ফসল নয়, বাঙালির বহু বছরের সংগ্রামে সাধনায় রচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিত, ফলে বহুকালের বঞ্চিত বাঙালি স্বপ্নও দেখেছে অনেক বড় করে। যুদ্ধোত্তর সময়ে বাঙালি শক্তি সাহস শৌর্য এবং উদ্যমকে নতুন রাষ্ট্র যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি বলেই বাঙালির বহুযুগের স্বপ্ন চোরাবালিতে তলিয়ে গেছে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও স্বপ্নভঙ্গের কারণে হতাশ যুবসমাজ, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা এবং বিরোধিতাকারী বিভ্রান্ত রাজনীতির মধ্যে বেড়ে ওঠা সশস্ত্র যুবশক্তি রাষ্ট্রীয় নিষ্পেষণের ফলে একই সমতলে এসে দাঁড়ায়। সেই সময়ে গণপ্রত্যাশার অনুকূলে তারা অবস্থান গ্রহণ করে। ‘সাদা-কালো’ উপন্যাসের ভূগোল রচিত হয়েছে যে এলাকার প্রেক্ষাপটে সেখানকার কৃষিজীবী মানুষ তখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলছে খেতের কুশার ( আঁখ) সরকার নির্ধারিত অন্যায্য মূল্যে চিনিকলের কাছে বিক্রি করা না করার প্রশ্নে। এ উপন্যাসের নায়ক রবি ততোটা রাজনীতিসক্রিয় না হয়েও তার দুলাভাই কাজল মাস্টারের কারণে এ আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েছে। সত্যিকারের কথায় বাংলাদেশে নীল-আন্দোলন, চা-আন্দোলন, তামাক-আন্দোলনের মতোই কুশার-আন্দোলনও হয়েছে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে, কিন্তু এমন প্রেক্ষাপট নিয়ে উপন্যাস কিংবা নাটকের সম্ভাবনা থাকলেও শক্তিমান কোনো লেখক এগিয়ে আসেননি, এ ক্ষেত্রে ফেরদৌস হাসানের সাদা-কালো স্মারক মর্যাদা পেতেই পারে। হতে পারে পথিকৃৎ সূচকও। উপন্যাসের সূচনা হয়েছে রাজশাহীর আড়ানী অঞ্চলের কুশার-আন্দোলনকে ঘিরেই। এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত আরো সব শাখাপ্রশাখাবিস্তারী ঘটনাবলী লেখক সাদা চোখে দেখেছেন এবং কোনো রঙের আড়াল তৈরী না করে সাদা-কালো ভঙ্গিতেই তা উপস্থাপন করেছেন এই অসামান্য উপন্যাসে।
এ উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রে অসামান্য মুন্সিআনার পরিচয় দিয়েছেন লেখক। কাজল মাস্টার নয়ক নয়, উপন্যাসের খুব অল্প জায়গা জুড়ে তার অবস্থান, তবু এত বড় উপন্যাসের চৌম্বকশক্তির কেন্দ্রে তার শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও আদর্শিক উপস্থিতি এমনই অনতিক্রম্য যে তার শ্যালক রবি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হওয়া সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত কাজল মাস্টারের আদর্শের অনুগামী থেকেছে। ঘটনাচক্রে রবি নানান জটিল কুটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কাজল মাস্টারের ভক্ত নার্স নীরার সহানুভূতি লাভ করে, অযাচিত ভালোবাসা পায়। সরকারি বাহিনীর সম্ভাব্য রোষানল থেকে বাঁচাতে নীরাই প্রচ- ঝুঁকি নিয়ে তাকে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যেতে সহযোগিতা করে। সে বৈরী পরিবেশ থেকে নিজেকে আড়াল করতে গিয়ে আটকা পড়ে যায় মিন্টু চৌধুরীর মতো ধুরন্ধর দুর্বৃত্তের ফাঁদে। সেখানেও তার জন্য আশির্বাদ হয়ে দেখা দেয় তার আরাধ্য স্বপ্নের রানি স্বপ্না। মুক্তিযুদ্ধে সে তার বাবাকে হারিয়েছে, সর্বোপরি পাকিস্তানি সৈন্যের পাশবিক নির্যাতনে সম্ভ্রম হারিয়ে সে প্রিন্সেস রতœা হয়ে যাত্রাপালায় নিজেকে আড়াল করেছে। পিতৃপরিচয়হীন তার গর্ভজাত সন্তানের জন্য তার বুকের ভেতরে মাতৃত্বের যে হাহাকার গুমরে মরে, সেই ছবি লেখক এঁকেছেন অপরিসীম মমতায়। সেই সন্তানের জন্য নিজেকেই সে উৎসর্গ করতে উদ্যত হয়েছে। সে বীরাঙ্গনা হয়েও কোথাও কোনো মর্যাদা পায়নি। রবিকে সে ভালোবাসে, খুবই ভালোবাসে, তবু সুস্থ স্বাভাবিক গার্হস্হ জীবন দাবি করতে পারে না। রবি নিজে মুখে জানিয়েছে সে তাকে ভালোবাসে, তবু যেন ভরসা হয় না। তাদের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন। তবু কত অবলীলায় সে বলতে পারে, ‘ ভগবান যদি একজনই হন, তাহলে আমি আলাদা কীভাবে? ‘
আহা, বুক ভরা এত প্রেম, তবু দিনশেষে এ উপন্যাসে আমরা এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখে চমকে উঠি — রবির হাতেই ছবিকে আত্মাহূতি দিতে হয়েছে। মানবহৃদয়ের দৃশ্যাতীত রক্তক্ষরণের চিত্র সাদা-কালো উপন্যাসটিকে শেষপর্যন্ত প্রেমের উপন্যাসই করে তুলেছে।
উপন্যাসের শুরুতেই আমরা জেনেছি কাজল মাস্টারের স্ত্রী তাপসী গর্ভবতী। প্রথম পোয়াতি বলেই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে স্বামীর কানে সুসংবাদটি জানাতে পারেনি, কিন্তু এই মাতৃত্বে সে প্রবল অহংকার বোধ করে। মনে পড়ে যায়-সমরেশ মজুমদারের ‘গর্ভবতী’ উপন্যাসের নায়িকা জয়িতা সন্তানের আদলে তার গর্ভে ধারণ করেছিল সম্ভাব্য বিপ্লবকে। ভাবনা হয় তাপসীও কি তার গর্ভে কাজল মাস্টারের আদর্শকেই মাতৃস্নেহে লালন করে চলে? স্বামীর অবর্তমানে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় জোটেনি তার, কাজল মাস্টারের অনুসারী গ্রামবাসী তাকে পরম যতেœ ও মমতায় তাকে আশ্রয় দিয়েছে ; সে কি কাজল মাস্টারের আদর্শের প্রতি শুধুই শ্রদ্ধা দেখানোর জন্য, নাকি সেই আদর্শ সবাই মিলে লালন করার জন্য? উপন্যাসের অন্যতম এক উজ্জ্বল নারী চরিত্র রবি এবং তাপসীর মায়ের মা জোহরা। এই মাতৃচরিত্রটিতেও যেনবা শেষপর্যন্ত আদর্শিক উত্তরণ ঘটে, তাই তো সর্বহারাদের প্রবল চাপের মুখেও সে অসম্ভব দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে পারে।
ফেরদৌস হাসানের উপন্যাসের সব চেয়ে বড় ঐশ্বর্য হচ্ছে তাঁর নিজস্ব ভাষাভঙ্গি। ছোট ছোটো বাক্যে কী যে স্বাদু গদ্য তিনি নির্মাণ করেন, আমাদের অনেকের কাছেই তা ঈর্ষণীয়। দীর্ঘকাল নাটকের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি সংলাপ রচনায় অর্জন করেছেন জাদুকরী দক্ষতা। গতিময় এই গদ্যরীতি কথাসাহিত্যিক ফেরদৌস হাসানকে বাংলা কথাসাহিত্যে স্থায়ী আসন এনে দেবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। পাঠকসমাজ এরই মাঝে তাঁকে সেই মর্যাদা দিয়েছে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।