গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
রাজনীতি মানেই মতের ভিন্নতা। গণতন্ত্রে একজনের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে অন্যজনের মতের অমিল থাকবেই। সরকারের সমালোচনা হবে, বিরোধী দলের সমালোচনা হবে, রাজনৈতিক নেতাদের কর্মকা- নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এটাই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশ।
কিন্তু সমালোচনা আর অপপ্রচার এক জিনিস নয়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, মিথ্যা তথ্য, চরিত্রহনন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, অডিও ও ভিডিও তৈরির প্রবণতা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন কথা বলেছেন বা এমন কাজ করেছেন বলে দেখানো হচ্ছে বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই।
এটি শুধু একজন ব্যক্তির সম্মানহানির বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং সমাজের তথ্যব্যবস্থার জন্যও একটি বড় হুমকি। রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা কি গণতন্ত্রবিরোধী? কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা জনগণের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার অধিকার জনগণের আছে এবং সেই অধিকার গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সমালোচনার নামে মিথ্যা বক্তব্য বসিয়ে দেওয়া, এআই দিয়ে ভুয়া ভিডিও বানানো, কণ্ঠস্বর নকল করা কিংবা সম্পাদিত ভিডিওকে সত্য হিসেবে প্রচার করা কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বাভাবিক প্রয়োগ হতে পারে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিদের মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপমানজনক বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের আইন রয়েছে। তুরস্কে রাষ্ট্রপতিকে অপমানের জন্য দ-বিধিতে কারাদ-ের বিধান রয়েছে।
জার্মানিতেও ফেডারেল প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে অপমানের বিরুদ্ধে বিশেষ শাস্তির বিধান রয়েছে। আবার সিঙ্গাপুরে জনস্বার্থ, নির্বাচন বা জনশান্তিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারেÑএমন জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য অনলাইনে ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। তবে অন্য দেশের আইন হুবহু অনুসরণ করাই সমাধান নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতা, সংবিধান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব কার্যকর আইন প্রণয়নই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশের জন্য এখনই প্রয়োজন সুস্পষ্ট আইন বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অপরাধ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও স্পষ্ট ও কার্যকর বিধান প্রয়োজন। বিশেষ করে রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে অও-নির্মিত ভুয়া ভিডিও, অডিও বা ছবি তৈরি ও প্রচারের ক্ষেত্রে আইনের আওতা, অপরাধের সংজ্ঞা, তদন্তের পদ্ধতি এবং শাস্তির বিষয়টি সুস্পষ্ট হওয়া দরকার।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিজের দলের নেতাকে নিয়ে কটূক্তি হলে আমরা প্রতিবাদ করি, কিন্তু প্রতিপক্ষের নেতার বিরুদ্ধে একই ধরনের অপপ্রচার হলে অনেক সময় সেটিকে রাজনৈতিক বিনোদন হিসেবে দেখি। এই দ্বিমুখী নীতি বন্ধ করতে হবে। আজ যে প্রযুক্তি দিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা ভিডিও তৈরি হচ্ছে, আগামীকাল একই প্রযুক্তি অন্য দলের নেতা, সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধেও ব্যবহার হতে পারে। অতএব, ডিপফেকের বিরুদ্ধে অবস্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের পক্ষে অবস্থান নয়; এটি সত্যের পক্ষে অবস্থান।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুরুতর এআই ডিপফেক, পরিকল্পিত অপপ্রচার ও ডিজিটাল চরিত্রহননের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করুন। প্রয়োজনে প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করুন। অপরাধ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় অবস্থান কিংবা ক্ষমতার প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা। একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে, এই আইন যেন প্রকৃত রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যঙ্গ, মতপ্রকাশ কিংবা সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে অযথা সীমাবদ্ধ করার হাতিয়ার না হয়।