চাতুর্যের কাছে মেধার পরাজয়, কোথায় যাচ্ছে আমাদের রাজনীতি?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
রাজনীতি কোনো পাশাখেলা নয়, সাময়িক চাতুর্যেরও নাম নয়। রাজনীতি মানুষের কল্যাণ, রাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং জনস্বার্থ রক্ষার একটি বড় দায়িত্ব। অথচ দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কখনো কখনো মেধা, যোগ্যতা ও সততার চেয়ে কৌশল, ব্যক্তিস্বার্থ, চাটুকারিতা ও গোষ্ঠীগত প্রভাব বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়। এই প্রবণতা শুধু রাজনীতির মর্যাদাই ক্ষুণœ করে না, যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশের পথও সংকুচিত করে।
একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। তাই রাজনীতিতে কে কতটা কৌশলী তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত কে কতটা যোগ্য, সৎ, জনবান্ধব এবং দায়িত্বশীল। কারণ কৌশল দিয়ে সাময়িকভাবে পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করা সম্ভব হলেও জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তাদের বড় একটি অংশ শিক্ষিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবর্তনমুখী। তারা রাজনীতিতে নতুন চিন্তা, স্বচ্ছতা ও যোগ্য নেতৃত্ব দেখতে চায়। কিন্তু যখন তারা দেখে মেধার চেয়ে পরিচয়, যোগ্যতার চেয়ে তদবির কিংবা জনসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ বেশি কার্যকর, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতির প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যায়। এর প্রভাব শুধু রাজনৈতিক দলেই পড়ে না, দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপরও পড়ে।
রাজনীতিতে একজন নেতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হওয়া উচিত তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। দেশের ইতিহাস, সংবিধান, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, প্রশাসন ও জনজীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে যার স্পষ্ট ধারণা নেই, তিনি কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন দেখবেন? শুধু বক্তৃতার মঞ্চে জনপ্রিয় হওয়া আর রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের জটিল সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন চিন্তা, গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবভিত্তিক নীতি।
আজকের বাংলাদেশে কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্পায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন ও তরুণদের ভবিষ্যৎ এসব বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা জানতে চায়, সমস্যা সমাধানে বাস্তব পরিকল্পনা কী। তাই রাজনীতিতে বক্তৃতার চেয়ে নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা এবং স্লোগানের চেয়ে বাস্তব কাজের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। অবশ্য মাঠের রাজনীতির অভিজ্ঞতারও কোনো বিকল্প নেই।
একজন প্রকৃত নেতা মানুষের কাছে থাকেন, মানুষের সুখ-দুঃখ বোঝেন এবং সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ান। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে যিনি দীর্ঘদিন কাজ করেন, জনগণের আস্থা অর্জনের প্রকৃত ভিত্তি তাঁরই তৈরি হয়। কেবল নির্বাচনের সময় মানুষের দরজায় গিয়ে ভোট চাওয়া আর বছরের পর বছর মানুষের পাশে থাকা দুটিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
রাজনীতিতে সিন্ডিকেট, চাটুকারিতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাবের সংস্কৃতি যত বাড়বে, ততই যোগ্য নেতৃত্বের পথ সংকুচিত হবে। তাই দলীয় রাজনীতিতেও প্রার্থী কিংবা নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দেখতে হবে, তিনি কতটা সৎ, দক্ষ, কর্মঠ, জনসম্পৃক্ত এবং নীতিনিষ্ঠ। কার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ, সেটি যেন যোগ্যতার মাপকাঠি না হয়।
রাজনীতিতে কৌশল থাকতে পারে, কিন্তু কৌশল যেন যোগ্যতার বিকল্প না হয়। কারণ ক্ষমতা মানুষকে কিছু সময়ের জন্য পরিচিত করে, আর মেধা, সততা ও জনসেবা মানুষকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা









