জমে উঠেছে ইউপি নির্বাচন: চায়ের দোকান থেকে হাটে-বাজারে প্রার্থীর জল্পনা
জিএম আমিনুল হক: আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা জেলায় রাজনৈতিক আমেজ ও উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। এখনো নির্বাচনের সময়সূচি (তফসিল) ঘোষণা না হলেও জেলার ৭টি উপজেলার ৭৮টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও মেম্বার (সদস্য) প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, গণসংযোগ ও শোডাউনে সরগরম হয়ে উঠেছে গোটা জনপদ।
গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ইউনিয়নের হাট-বাজার, মসজিদের প্রাঙ্গণ কিংবা খেলার মাঠÑসর্বত্রই এখন আলোচনার মূল বিষয়: কে হচ্ছেন আগামী দিনের মেম্বার ও চেয়ারম্যান? স্থানীয় নির্বাচনে সরাসরি ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এই নির্বাচন ঘিরে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সাতক্ষীরা সদরের ফিংড়ী, ধুলিহর, ব্রহ্মরাজপুর, বাঁশদহা, কুশখালী, লাবসা, আগরদাড়ী, ভোমরা ও আলীপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে একই উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। সকালে চায়ের কাপে আড্ডার পাশাপাশি কে কে নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সদরের ফয়জুল্যাপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান আক্ষেপ করে জানান, নির্বাচন এলে সাধারণ মানুষের গুরুত্ব বাড়ে। সবাই এসে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু ভোটের পর আর তাঁদের খোঁজ পাওয়া যায় না। বাঁশদহা বাজারের চা-দোকানি রফিকুল ইসলাম জানান, আগে সকালে মানুষ কৃষিকাজ বা ক্ষেত-খামারের গল্প করলেও এখন পুরো আলোচনাজুড়ে কেবল নির্বাচন, উন্নয়ন আর প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার বিষয়গুলোই স্থান পাচ্ছে।
ধুলিহরের প্রবীণ ভোটার আবুল হোসেন জানান, অতীতে রাস্তাঘাটের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেখে ভোট দিলেও এবার প্রধান বিবেচনা হবে জলাবদ্ধতা নিরসন। বিলের পানি আটকে ফসল নষ্ট হওয়ার সমস্যা যে সমাধান করতে পারবে, তাকেই ভোট দেবেন তারা।
এবারের নির্বাচনে নতুন সংযোজন তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। প্রবীণদের পাশাপাশি অনেক শিক্ষিত ও তরুণ মুখ এবার মাঠে নেমেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও এলাকার নানা সমস্যা তুলে ধরে মতামত প্রকাশ করছেন তাঁরা। শ্যামনগর এলাকার এক তরুণ প্রার্থীর সমর্থকেরা জানান, নাগরিক সনদ ও জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা যেন হয়রানিমুক্তভাবে পাওয়া যায়, তেমন এক ‘ডিজিটাল ইউনিয়ন’ গড়তে তরুণদের ওপর ভরসা রাখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বর্তমান জনপ্রতিনিধিরাও বসে নেই। বিগত মেয়াদের উন্নয়নকাজের হিসাব তুলে ধরে এবং ভিজিডি ও ভিজিএফ সুবিধা বিতরণের তথ্য জানিয়ে নতুন করে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন তাঁরা।
সাতক্ষীরার বিভিন্ন ইউনিয়নের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে প্রধান পাঁচটি দাবির কথা জানা গেছে। সেগুলো হলোÑ সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া, পাটকেলঘাটা, তালা ও আশাশুনির বিল এলাকায় অপরিকল্পিত মৎস্যঘেরের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসন করা। বর্ষাকালে কাদা ও পানি থেকে মুক্তি পেতে গ্রামীণ কাঁচা সড়কগুলো পাকাকরণ ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ ও নাগরিক সনদ গ্রহণে অতিরিক্ত টাকা লেনদেন ও হয়রানি বন্ধ করা। সীমান্তঘেঁষা এলাকা হওয়ায় মাদক বিস্তার রোধসহ চুরি-ছিনতাই বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ। সার ও বীজের সুষ্ঠু বণ্টন এবং বয়স্ক ও বিধবা ভাতা প্রকৃত দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ নিশ্চিত করা।
ফিংড়ী ইউনিয়নের সালমা খাতুন নামের এক নারী ভোটার জানান, জনগণের দুঃখ-কষ্টে পাশে থাকবে এবং সরকারি ভাতা বিতরণে দুর্নীতি করবে নাÑএমন জনপ্রতিনিধিকেই বেছে নিতে চান তাঁরা।
একই ইউনিয়নের সদস্য ও সাংবাদিক মো. আরশাদ আলী জানান, আগামী ডিসেম্বরে বর্তমান পর্ষদের মেয়াদ পূর্ণ হতে যাচ্ছে। বিগত মেয়াদের পুরোটা সময় মানুষের সেবায় কাটানোর পর এবার তিনি আর নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে নিশ্চিত করেছেন।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রস্তুত করার কাজ চলছে। সময়সূচি ঘোষণা না হলেও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জানান, উন্মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এবার প্রতিটি পদে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যেতে পারে। এতে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে ভোটাররা বাড়তি সুযোগ পাবেন।
তফসিল ঘোষণার আগেই সাতক্ষীরার ৭৮টি ইউনিয়নে যে নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছে, তা কেবল ভোটের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মানুষের অধিকার ও স্থানীয় উন্নয়নের এক বড় ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত ব্যালটের মাধ্যমে কার মুখে জয়ের হাসি ফোটে।












