তালায় কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধেও ভাঙন, অস্তিত্ব সংকটে জালালপুরের কয়েকটি গ্রাম
পত্রদূত ডেস্ক: সাতক্ষীরার তালা উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদের অব্যহত বেড়িবাঁধ ভাঙনের মুখে অস্তিত্ব সংকটে জালালপুর ইউনিয়নের কয়েকটি জনপদ। অবিলম্বে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না হলে ওইসব এলাকার বাসিন্দাদের নতুন করে আশ্রয়হীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে সোমবার সকালে তালা উপজেলার জেঠুয়া বাজার, জহুরুল গাজীর ইটভাটা, মালোপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় যেয়ে দেখা গেছে, জেঠুয়া বাজার থেকে কপিলমুনিমুখি কপোতাক্ষ নদের পূর্ব পাশের মালোপাড়া মহাশ্মশান পর্যন্ত বেড়িবাঁধের দেড় কিলোমিটারের বেশি ভাঙনের কবলে। তিনটি স্থানে ৮০ থেকে ১০০ ফুট করে বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। জোয়ারের পানির সঙ্গে কচুরিপানা বিলের মধ্যে ঢুকছে। কয়েকটি স্থানে এক থেকে দেড় হাত বেড়িবাঁধ দেখা যাচ্ছে। মালোপাড়ার মধ্যে ১৯৯৬ সালে সৃষ্ট নতুন নদ এর অস্তিত্ব বিদ্যমান। বেড়িবাঁধের পাশে জেঠুয়া মহাশ্মশান।
জানতে চাইলে মালোপাড়ার বাসিন্দা শিক্ষক দীলিপ কুমার অধিকারী বলেন, ১৯৮০ সালের পরবর্তী হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের শাসনামল থেকে কপোতাক্ষ নদের পূর্ব পাশে জেঠুয়া বাজার থেকে মহাশ্মশান পর্যন্ত কয়েকবারের ভাঙন তিনি দেখেছেন। এ পর্যন্ত বাপ কাকাদের ৩০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙতে ভাঙতে পাঁচ বার বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একপর্যায়ে ঢাকায় চলে যান তিনি। সেখানেই পাড়াশুনা শেষে শিক্ষকতার চাকুরি। নাড়ির টানে জন্মভিটার কথা মনে পড়তেই মাঝে মাঝে ছুঁটে আসেন মালোপাড়ায়। সর্বশেষে আবারো পাকা বাড়ি তৈরি করছেন। বানাচ্ছেন একটি সার্বজনীন মন্দির।
খর¯্রােতার কারণে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদের দুই পারের লক্ষাধিক বাসিন্দাদের বছরে সাত থেকে আট মাস জলাবদ্ধতার সাথে লড়াই করে জীবনযাপন করতে হতো। ১৯৯৬ সালে তালা উপজেলার জেঠুয়া বাজার থেকে জেঠুয়া মহাশ্মশান পর্যন্ত দেড় কিলোমিটারের মধ্যে কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভাঙনে কপোতাক্ষ নদ মালোপাড়া, ঠাকুরপাড়া, পালপাড়া, বেনেপাড়া, পরামানিকপাড়া ও ঘোষপাড়ার মালিকানা জমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
এতে ওইসব এলাকার তিন হাজার বিঘার বেশি জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় চার শতাধিক পরিবার পেশা পরিবর্তণ করে সাতক্ষীরা শহর, খুলনা ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চলে গেছে। মূল নদের ভাঙন কবলিত স্থান সংস্কার করা হলেও মালোপাড়ায় আগ্রাসনের চিহ্ন আজো বিদ্যমান। ফলে পরিবর্তিত হয়েছে মানচিত্র। অপরদিকে জেঠুয়ার বিপরীতে কপোতাক্ষের অপর পার খুলনার পাইাকগাছার হরিঢালী ইউনিয়নের রহিমপুর গ্রামের নতুন করে চর জেগে বাড়ছে বাবলা বাগান। ২০১০ সাল থেকে পাঁচ রছর মেয়াদী কপোতাক্ষ খনন হওয়ায় তালাবাসি জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়। এরপরও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে জেঠুয়া বাজার থেকে জেঠুয়া মহাশ্মশান পর্যন্ত বেড়িবাঁধে নতুন করে ফাঁটল শুরু হয়। এক সপ্তাহ আগে জেঠুয়া বাজার সংলগ্ন হাজির ভাটার পাশে তিনটি স্থানে ৪০ থেকে ৫০ ফুট করে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জোয়ারভাটা অব্যহত রয়েছে।
আরো কয়েকটি স্থানের বাঁধ এক থেকে দেড় হাতের মত চিকন হয়ে গেছে। জোয়ারের তীব্রতা বাড়লে যে কোন মুহুর্তে ওইসব দুর্বল বাঁধ ভেঙে জেঠুয়া, শ্রীমন্তকাটি, কানাইদিয়া, নেহালপুর, কৃষ্ণকাটিসহ সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে কয়েক হাজার বিঘার আমন ধানের খেত, সবজি খেত, মাছের ঘের ও বসতবাড়ি ডুবে যাওয়ার আশাঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আক্ষেপের সঙ্গে দীলিপ অধিকারী আরো বলেন, তার এলাকায় এক সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। তাদের মধ্যে শিক্ষার হার কম থাকায় নদী গর্ভে হারানো মালিকানা জমি খাস খতিয়ানভুক্ত হয়ে অন্যরা ডিসিআর নিলেও তারা ওই জমি উদ্ধারে কোন মামলা করেননি। সরকারীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের জন্য কোন ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। নদী ভাঙনে এলাকার মানচিত্র পরিবর্তণ হয়ে যাওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে ভাঙন কবলিত বেড়িবাঁধ তাদের নয়। তাই সংস্কারের দায়িত্বও তাদের এখতিয়ারে পড়ে না। তাহলে ভাঙন কবলিত এলাকার লোকজনকে রক্ষার দায়িত্ব কার?
মালোপাড়ার সুরতী রানী ঘোষ বলেন, স্বামী ও শ^শুরদের ২০ বিঘার বেশি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। তিন তিন বার বাড়ি বানিয়ে তা ছাড়তে হয়েছে। কোন প্রকারে ছাপড়া ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে তার উল্লেখ করে সুরতী রানী বলেন, মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন কোন রকমে। ছেলে বিশ^নাথ ঘোষ পেটের দায়ে এলাকা ছেড়ে খুলনার একটি মিষ্টির দোকনে কাজ করে। তাদের এ কষ্ট দেখার কেউ নেই।
ঘোষপাড়ার সুকুমার ঘোষ বলেন, তার ১০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জমির জন্য কোন সরকারি অনুদান পাননি। ভৌগলিক কারণে তারাও রয়েছেন অস্তিত্ব সঙ্কটে। একইভাবে ঠাকুরপাড়ার রবীন্দ্র নাথ চক্রবর্তী বলেন, তার ও তার পূর্ব পুরুষদের ১৮ বিঘা জমি কপোতাক্ষ গ্রাস করেছে। বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা ঢাকায় চলে গেছে কর্মসংস্থানের জন্য। জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া কার্তিক পরামানিক, অরুণ দত্তসহ কয়েকজন পানি উন্নয়ন বোর্ডের অব্যবহৃত অথচ জমির মালিকানা বহির্ভুত লোকদের ডিসিআর না দিয়ে মালিকদের ডিসিআর দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানান। আগামি এক সপ্তাহের মধ্যে বেড়িবাঁধ সংস্কার না করা হলে এই এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আমন ধানের খেত, সবজি খেত, মাছের ঘের ও বাড়িঘর ভেসে যেতে পারে। তাই দ্রুত বেড়িবাঁধ সংস্কারের দাবি জানান তারা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডেও সাতক্ষীরা-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া জানান, জেঠুয়ার ভাঙন কবলিত এলাকায় তাদের কোন বেড়ি বাঁধ নেই। এরপরও উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। অনুমতি না পাওয়ায় কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।









