ধান ডুবলে কৃষকও ডুবে
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশের গ্রামবাংলার চিরচেনা এক সকাল। মাঠে সোনালি ধান, কাস্তে হাতে কৃষক, আর নতুন ফসলের আশায় বুকভরা স্বপ্ন-এই দৃশ্যই আমাদের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রাণ। কিন্তু সেই স্বপ্ন যখন এক নিমেষে পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন শুধু ফসলই নষ্ট হয় না; ভেঙে পড়ে মানুষের ভেতরের ভরসা, আশা, এমনকি জীবনের ইচ্ছাটুকুও। নাসিরনগরের গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের কৃষক আহাদ মিয়ার মৃত্যু সেই নির্মম বাস্তবতারই আরেকটি প্রতীক-যেখানে ধান ডোবে, মানুষও ডুবে যায়।
শনিবার সকালের ঘটনাটি নিছক একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বহুস্তরীয় সংকটের এক গভীর প্রতিফলন। ছয় বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে একজন কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো যথেষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এমন মৃত্যু কি সত্যিই ‘অপ্রত্যাশিত’? নাকি এটি একটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং কৃষকদের প্রতি কাঠামোগত বৈষম্যের অনিবার্য পরিণতি?
আহাদ মিয়ার মৃত্যু নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও চিকিৎসকদের বক্তব্যে একটি সাধারণ ব্যাখ্যা উঠে এসেছে-তিনি শোক সহ্য করতে পারেননি, সম্ভবত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা কি যথেষ্ট? একজন কৃষক কেন এমন এক অবস্থায় পৌঁছান, যেখানে ফসল নষ্ট হওয়ার শোক তার জীবনের শেষ হয়ে ওঠে? এখানেই আমাদের বিশ্লেষণের শুরু। কারণ কৃষকের মৃত্যু কেবল শারীরিক কারণে হয় না; এর পেছনে থাকে অর্থনৈতিক চাপ, ঋণের বোঝা, সামাজিক দায়িত্ব, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাব।
আহাদ মিয়া প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্রি-২৯ ধান আবাদ করেছিলেন। এই ঋণ কেবল একটি আর্থিক দায় নয়-এটি ছিল তার পরিবারের ভবিষ্যতের উপর নির্ভরশীল একটি বিনিয়োগ। সেই বিনিয়োগ একদিনে ধ্বংস হয়ে গেলে, তার সামনে যে অন্ধকার নেমে আসে, তা কেবল অর্থনৈতিক নয়-মানসিকও। বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল বরাবরই কৃষির জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং এলাকা। একদিকে প্রাকৃতিক উর্বরতা, অন্যদিকে অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা-সব মিলিয়ে এখানে কৃষি একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পেশা।
প্রতি বছরই আমরা দেখি-ধান কাটার আগ মুহূর্তে হাওরে পানি ঢুকে পড়ে। কৃষকেরা বছরের পর বছর একই দুর্ভোগের শিকার হন। তবুও তারা চাষাবাদ চালিয়ে যান, কারণ বিকল্প জীবিকা নেই। এখানে প্রশ্ন হলো-এই ঝুঁকি কি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক? নাকি এর সঙ্গে মানবসৃষ্ট কারণও জড়িত? বিভিন্ন গবেষণা বলছে, হাওর অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, বাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা টেকসই হয় না।
আবার কোথাও কোথাও সময়মতো সংস্কার করা হয় না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি ঢুকে পড়ে। আহাদ মিয়ার মতো অসংখ্য কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। কৃষি ঋণকে সাধারণত উন্নয়নের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক সময় কৃষকদের জন্য একটি ফাঁদে পরিণত হয়। ফসল নষ্ট হলে ঋণ পরিশোধের কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই।
সুদের চাপ বাড়তে থাকে, নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হয়, একসময় ঋণের চক্র থেকে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে, এই পরিস্থিতিতে কৃষক মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। আহাদ মিয়ার মৃত্যু সেই চাপেরই এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। গ্রামীণ বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এখনও খুবই কম। একজন কৃষক যখন তার সব ফসল হারান, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হয়-তা আমরা খুব কমই বিবেচনায় আনি। তিনি পরিবারকে কীভাবে চালাবেন? ঋণ কীভাবে শোধ করবেন?
সমাজে তার অবস্থান কী হবে? এই প্রশ্নগুলো তাকে ভিতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু এই মানসিক চাপ মোকাবিলার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেই। বাংলাদেশে কৃষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যত অনুপস্থিত। অথচ উন্নত দেশগুলোতে কৃষকদের জন্য বিশেষ কাউন্সেলিং, হেল্পলাইন এবং সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং তিন মাসের ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হবে। প্রশ্ন হলো-এই সহায়তা কি যথেষ্ট? যখন একজন কৃষক তার পুরো ফসল হারান, তখন তার ক্ষতি শুধু ওই মৌসুমের নয়; এর প্রভাব পড়ে পুরো বছরের উপর।
তিন মাসের ভর্তুকি কি সেই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে? এছাড়া সহায়তা পেতে যে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা অনেক সময় কৃষকদের জন্য একটি বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। অতিবৃষ্টি, অকাল বন্যা, অনিয়মিত আবহাওয়া-এসবই কৃষিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। হাওরাঞ্চলে এই প্রভাব আরও বেশি। ফলে প্রতি বছরই কৃষকের ঝুঁকি বাড়ছে। কিন্তু এই ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটা? ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কৃষকদের জন্য ফসল বীমা চালু রয়েছে। ফসল নষ্ট হলে কৃষকরা ক্ষতিপূরণ পান। এতে তাদের ঝুঁকি কমে।
বাংলাদেশেও ফসল বীমা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিছু পাইলট প্রকল্পও চালু হয়েছে। কিন্তু তা এখনও সার্বজনীন হয়নি। এছাড়া উন্নত দেশগুলোতে কৃষকদের জন্য:জরুরি তহবিল, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস ব্যবস্থা,বাজার সহায়তা এসব ব্যবস্থা রয়েছে। আহাদ মিয়ার মৃত্যু আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি আমরা এখনই ব্যবস্থা না নিই, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়বে। সবচেয়ে জরুরি হলো কৃষকদের জন্য কার্যকর ফসল বীমা ব্যবস্থা চালু করা। হাওর অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত নগদ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ পর্যায়ে কাউন্সেলিং ও সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঋণ মওকুফ বা পুনর্গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। আহাদ মিয়ার মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি কঠিন প্রশ্ন। আমরা কি আমাদের কৃষকদের যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পেরেছি? যে মানুষটি আমাদের খাবার জোগান দেন, তার জীবন যদি এতটা অনিশ্চিত হয়, তাহলে আমাদের উন্নয়ন কতটা অর্থবহ? ধান তলিয়ে গেলে শুধু ফসলই হারায় না-হারায় মানুষের স্বপ্ন, আত্মসম্মান, কখনও জীবনও। এই বাস্তবতা পরিবর্তন করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। এখন সময়-কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর, শুধু সহানুভূতি দিয়ে নয়, কার্যকর নীতি ও পদক্ষেপের মাধ্যমে।
লেখক: সংবাদকর্মী









