প্লাস্টিকের দাপটে বিলীন হতে বসেছে পাটকেলঘাটার ঐতিহ্যবাহী মাদুরশিল্প
এম এম জামান মনি, পাটকেলঘাটা: সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা বাণিজ্য কেন্দ্রের অর্থনীতিতে একসময় বড় ভূমিকা রাখত স্থানীয় মাদুরশিল্প। এই শিল্প থেকে মাদুর কেনাবেচা ও সরবরাহের মাধ্যমে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় হতো। ‘মেলে’ নামক বিশেষ ঘাস দিয়ে তৈরি এসব মাদুরের বেশ সুনাম ছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, প্লাস্টিক পণ্যের দাপট ও সরকারি সহায়তার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প।
একসময় পাটকেলঘাটা হাটের মাদুরশিল্পের খ্যাতি ছিল অনেক। তালা উপজেলার খলিষখালী বাজার, দলুয়া বাজার, গাছা বাজার, মাগুরা বাজার, গোয়ালপোতা বাজার ও খেসরা ইউনিয়নের বহু পরিবার মাদুর বুনে জীবিকা নির্বাহ করত। গৃহস্থদের আঙিনায় নারী-পুরুষ মিলে শুকাতেন মেলে ঘাস। নিজেদের জমিতে কিংবা বর্গা নিয়ে অনেকেই এ ঘাসের চাষ করতেন।
স্থানীয় কারিগরদের অভিযোগ, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত মেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। আগে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি মাদুর তৈরি করে প্রতিটি ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করা যেত। বর্তমানে সেই মাদুর বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। খরচ বাদ দিলে খুব সামান্য টাকাই হাতে থাকে। ফলে বাধ্য হয়ে কারিগরেরা এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
মাদরা গ্রামের তারাজান বিবি জানান, জমি থেকে মেলে এনে চিরে রোদে শুকানো হয়। এরপর তা প্রক্রিয়াজাত করে মাদুর তৈরির জন্য সংরক্ষণ করা হয়।
গাচা গ্রামের পরিতোষ সরকার, বাগডাঙা গ্রামের নারায়ণ ম-ল, মাগুরা ইউনিয়নের মাদ্রা গ্রামের শ্যামল সরকার ও কলাগাছি গ্রামের স্বপন সরকার জানান, আগে ঘরে ঘরে মাদুর তৈরির প্রচলন ছিল। অধিকাংশ মানুষ এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যাংকিং ঋণের অপ্রতুলতা ও অনুকূল পরিবেশ না থাকায় এখন ব্যাংক থেকে ঋণ মিলছে না। ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
পাটকেলঘাটা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শেখ জহুরুল হক জানান, দক্ষ মাদুরশিল্পীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাঁদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। এতে দেশীয় এই হস্তশিল্প পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
একটি স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধি মনে করেন, সরকারি উদ্যোগে ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে মাদুর মেলার আয়োজন করা উচিত। এটি হস্তশিল্প ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
এ বিষয়ে তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, তিনি সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।












