বল্লীতে আটক শিক্ষক গৌরাঙ্গকে মামলা দিয়ে কারাগারে
পত্রদূত রিপোর্ট: ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে মন্তব্য করার অভিযোগে সাতক্ষীরার বল্লী মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকারকে (৪৬) মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় লোকজন। মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে।
বুধবার ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে করা মামলায় তাঁকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া গৌরাঙ্গ সরকার সাতক্ষীরা সদর উপজেলার খেজুরডাঙি গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ মে নবম শ্রেণিতে ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার ধর্মীয় বিষয়ে কিছু মন্তব্য করেন। ক্লাসের দুই-তিনজন শিক্ষার্থী বিষয়টি বাইরে গিয়ে স্থানীয় লোকজনকে জানালে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বহিরাগত কয়েকজন যুবক বিদ্যালয়ে ঢুকে শিক্ষক মিলনায়তনে গৌরাঙ্গ সরকারকে মারধর করেন। পরে দুপুরের দিকে বিদ্যালয়ে আরও লোক জড়ো হলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিক্ষকেরা গৌরাঙ্গ সরকারকে বহিরাগতদের সামনে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেন। শিক্ষক ক্ষমা চাওয়ার একপর্যায়ে আবারও উত্তেজিত জনতা তাঁকে মারধর শুরু করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কাঁঠালতলা গ্রামের আব্দুর রউফ বাদী হয়ে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে একটি মামলা করেন।
তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অন্য শিক্ষক ও অভিযুক্ত শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে ঘটনাটির ভিন্ন পিঠও জানা গেছে। বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও অন্য এক শিক্ষকের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে দুটি পক্ষ রয়েছে। তাঁদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে এই ঘটনাকে বড় করা হয়ে থাকতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নবম শ্রেণির ‘খ’ শাখার কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, গত রোববার অংকের ক্লাস শেষে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মুসলিমদের কোরবানি বন্ধের বিষয়ে কথা তুলেছিলেন গৌরাঙ্গ স্যার। একপর্যায়ে এক সহপাঠীর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। পরে দুই-তিনজন সহপাঠী বাইরে গিয়ে কথাটি বাড়িয়ে বলায় এই ভুল বোঝাবুঝি ও সোমবার থেকে বহিরাগতদের আনাগোনা শুরু হয়।
ক্রীড়া শিক্ষক আনোয়ার হোসেন জানান, গতকাল সকালে ১০-১২ জন বহিরাগত যুবক শিক্ষক মিলনায়তনে ঢুকে গৌরাঙ্গ সরকারকে চড়-থাপ্পড় মারেন। পরে পরিস্থিতি শান্ত করতে গৌরাঙ্গ সরকারকে কান ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। কিন্তু তিনি মাইকে প্রকৃত ঘটনা বলতে গেলে আবারও মারধর শুরু হয়। পরে স্থানীয় জামায়াত নেতা মিজানুর রহমান বিদ্যালয়ে আসেন এবং পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
আদালত চত্বরে অভিযুক্ত শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার দাবি করেন, “আমি পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের কোরবানি বন্ধের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছিলাম এতে দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যালয়েরই এক শিক্ষক কয়েকজন ছাত্রকে ব্যবহার করে আমার কথা ঘুরিয়ে বাইরে ছড়ান। গতকাল ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে শিক্ষকদের কথায় আমি নিঃশর্ত ক্ষমাও চাই। কিন্তু এরপরও শুভ নামের এক যুবকের নেতৃত্বে আমাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দলাদলির বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে আমাকে।”
বল্লী মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জামিলুর রহমান বলেন, ধর্ম অবমাননাকর কথা বলায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মঙ্গলবার দুপুরে তাঁকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্ম ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে হেয় করার অভিযোগে আব্দুর রউফ নামের এক ব্যক্তি মামলাটি করেছেন। ওই মামলায় শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে।









