মাদক চোরাচালান রোধে প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ
সম্পাদকীয়
বাংলাদেশকে মাদকের মরণকামড় থেকে রক্ষা করতে সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার কোনো বিকল্প নেই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের সীমান্ত এলাকাগুলো মাদক চোরাচালানিদের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই বাস্তবতায় সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মাদকের বিরুদ্ধে যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে, তার প্রতিফলন আবারও দেখা গেল সাতক্ষীরায়। সম্প্রতি বিজিবি সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন (৩৩ বিজিবি) সদর দপ্তরে জনসম্মুখে প্রায় ৭৩ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধ্বংস করেছে। সীমান্ত সুরক্ষায় এবং তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে বিজিবির এই কঠোর অবস্থান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া সীমান্ত এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ চোরাচালানি পণ্য ও মাদক জব্দ করা হয়েছে, যার মোট মূল্য ১২৬ কোটি টাকারও বেশি। ধ্বংসকৃত মাদকদ্রব্যের তালিকায় ফেনসিডিল, মদ বা গাঁজার মতো প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি এলএসডি, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) কিংবা আফিম তৈরির কেমিক্যালের মতো উচ্চমূল্যের ও অতি ভয়াবহ সিনথেটিক মাদকের উপস্থিতি চরম উদ্বেগের জন্ম দেয়। এসব আধুনিক ও মারাত্মক মাদক আমাদের সমাজ ও তরুণ সমাজকে কতটা নিঃশব্দে গ্রাস করছে, তা এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। সীমান্ত দিয়ে এসব মাদকের প্রবেশ যদি কঠোরভাবে রোধ করা না যায়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের মাদক ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার যথার্থই বলেছেন, মাদক কেবল একটি সীমান্ত অপরাধ বা আইনি সমস্যা নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ব্যাধি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সীমান্ত গলিয়ে আসা মাদক জব্দ করছে, চোরাকারবারিদের গ্রেপ্তার করছেÑএটি সমস্যার একদিকের সমাধান। কিন্তু মাদকের এই বিশাল বাজার এবং এর অভ্যন্তরীণ চাহিদা যদি বন্ধ করা না যায়, তবে কেবল সীমান্ত পাহারা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
মাদকের এই অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য। প্রতিটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবিকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা অত্যন্ত জরুরি।
আমরা মনে করি, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি তখনই পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে, যখন মাদকের সরবরাহ লাইনের পাশাপাশি এর অভ্যন্তরীণ চাহিদাও শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। বিজিবির এই ধারাবাহিক ও কঠোর তৎপরতা অব্যাহত থাকুক। একই সঙ্গে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে একটি টেকসই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেনÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।












