মোঃ দেলোয়ার হোসেন
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ বনভূমি, নদ-নদী, খাল-বিল, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ জেলার শ্যামনগর উপজেলায় অবস্থিত। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, নদী-খাল দখল, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ ও বৃক্ষনিধনের কারণে জেলার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবন। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা ও পদ্মপুকুরসহ উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা এ বনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর, বানর, কুমির, উদবিড়ালসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া ও পশুরসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ এ বনের বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে।
সুন্দরবন শুধু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল বাতাসের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি মাছ, কাঁকড়া, মধু ও বনজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে বহু মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবে কাজ করছে।
জেলার প্রকৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে ইছামতী, কপোতাক্ষ, বেতনা, মরিচ্চাপ ও খোলপেটুয়াসহ বিভিন্ন নদ-নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একসময় এসব নদীতে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ছিল। নদীর পানি কৃষিকাজ, নৌযান চলাচল ও মৎস্য আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমানে পলি জমে নদীর নাব্যতা হ্রাস, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ ও দূষণের কারণে অনেক নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সাতক্ষীরার ইছামতী, কপোতাক্ষ ও বেতনা নদীর ৩০২ জন অবৈধ দখলদার শনাক্তের তথ্য উঠে এসেছে। নদীর জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, কৃষিজমি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
সাতক্ষীরা শহরের প্রাণসায়ের খালও দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণের শিকার। বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর সঙ্গে সংযুক্ত এ খাল শহরের পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শহরের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠছে।
উপকূলীয় সাতক্ষীরার অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকট লবণাক্ততা। শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও দেবহাটার বিভিন্ন এলাকায় মাটি ও পানির লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদন এবং সুপেয় পানির প্রাপ্যতাকে প্রভাবিত করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কৃষি বিভাগের তথ্যের বরাতে বলা হয়, সাতক্ষীরার প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। এর মধ্যে চিংড়ি চাষের জমিও রয়েছে।
লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে মিঠাপানির পুকুর ও জলাশয়ের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দেশীয় মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলার আরেকটি বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। অতিবৃষ্টি, নদীর নাব্যতা সংকট, খাল ভরাট, অপরিকল্পিত মাছের ঘের এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই সকাল পর্যন্ত জেলায় ৪৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ওই সময় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর আউশ ধান ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার তথ্য জানায় কৃষি বিভাগ।
অন্যদিকে আশাশুনি ও শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন এবং বেড়িবাঁধের ঝুঁকি উপকূলীয় জনপদের মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করলে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, পুকুর ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুন্দরবনের বাইরেও সাতক্ষীরার গ্রামীণ এলাকায় রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী ও দেশীয় জলজ প্রাণী। পুকুর, বিল, খাল, ধানক্ষেত ও গাছপালা এসব প্রাণীর আবাসস্থল। কিন্তু জলাশয় ভরাট, নির্বিচারে গাছ কাটা, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
উপকূলীয় জেলা হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও সাতক্ষীরায় বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত বাসসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাতক্ষীরার প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বিশেষ করে কৃষক, জেলে, দিনমজুর ও উপকূলীয় এলাকার নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে জেলার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সুন্দরবনের বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ইছামতী, কপোতাক্ষ, বেতনা, মরিচ্চাপ ও খোলপেটুয়াসহ সব নদ-নদী ও খাল দখলমুক্ত করতে হবে। প্রাণসায়ের খালসহ শহর ও গ্রামের জলাশয় দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।
একই সঙ্গে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ নিয়ন্ত্রণ, কৃষিজমি ও মিঠাপানির উৎস সংরক্ষণ, দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, পরিকল্পিত বনায়ন এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং লবণসহিষ্ণু কৃষির প্রসারও প্রয়োজন।
সাতক্ষীরার প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জেলার মানুষের খাদ্য, অর্থনীতি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা। সুন্দরবন, নদ-নদী, খাল-বিল, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো জনপদের পরিবেশ ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ জন্য প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি ও মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ক্ষতি না করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কারণ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে নিরাপদ থাকবে সাতক্ষীরার পরিবেশ, সুরক্ষিত হবে মানুষের জীবন-জীবিকা।