মৃত্যুর ৮ দিন পরও কেন মর্গে টুইশা শর্মার লাশ
টুইশা শর্মার মৃত্যুর আট দিন পার হয়ে গেছে। কিন্তু তার মরদেহ এখনও অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস) ভোপালের শীতল মর্গে পড়ে রয়েছে। ৩৩ বছর বয়সী সাবেক মিস পুনে ও বিপণন পেশাজীবী (মার্কেটিং প্রফেশনাল) টুইশার মৃত্যুর ঘটনার একটি ‘সুষ্ঠু ও স্বাধীন’ তদন্ত না পাওয়া পর্যন্ত তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মা-বাবা।
মধ্যপ্রদেশ পুলিশ যে ঘটনাকে প্রাথমিকভাবে ‘আত্মহত্যা’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তা এখন যৌতুকের জন্য নির্যাতন, তথ্য-প্রমাণ লোপাট এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর গুরুতর অভিযোগে এক জটিল মোড় নিয়েছে।
টুইশার মা-বাবা এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত তার ভাই দাবি করেছেন, নতুন করে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করতে হবে এবং সেটি হতে হবে দিল্লির এইমসে। তাদের অভিযোগ, ভোপালের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটি পক্ষপাতদুষ্ট ও অসম্পূর্ণ ছিল, কারণ ভোপালে টুইশার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
টুইশার পরিবারের সন্দেহ, এটি কেবল সাধারণ আত্মহত্যা নয়। মাত্র পাঁচ মাস আগে ভোপালের আইনজীবী সমর্থ সিংহের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল টুইশার। বিয়ের পর থেকেই টুইশাকে যৌতুকের জন্য হেনস্তা, শারীরিক নির্যাতন এবং মানসিক নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছিল বলে অভিযোগ পরিবারের। বর্তমানে অভিযুক্ত স্বামী সমর্থ সিংহ পলাতক রয়েছেন এবং তার খোঁজ দিতে পারলে ১০ হাজার রুপি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভোপাল পুলিশ।
এদিকে ভোপাল পুলিশ পরিবারকে চিঠি দিয়ে দ্রুত লাশ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে। পুলিশ সতর্ক করে জানিয়েছে, দীর্ঘদিন মরদেহ এভাবে রেখে দিলে তা পচে যেতে পারে। তাদের মতে, এইমস ভোপালের মর্গে মাইনাস ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে লাশ রাখা হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে লাশ সংরক্ষণের জন্য মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন, যা এইমস ভোপালে নেই বলে। তবে পরিবারের কাছে টুইশার এই ব্যবচ্ছেদহীন দেহই এখন শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের শেষ প্রমাণ।
প্রথম ময়নাতদন্তে কী মিলেছে?
গত ১২ মে ভোপালে টুইশার শ্বশুরবাড়িতে জিমনাস্টিক রিংয়ের দড়ির সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এইমস ভোপালের প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টুইশার মৃত্যু হয়েছে গলায় ফাঁস লাগার কারণে। চিকিৎসকেরা তার গলায় লালচে জোড়া দাগ এবং শ্বাসরোধের কারণে মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণেরকথা উল্লেখ করেছেন। সহজ কথায়, মৃত্যুর আগে গলায় চাপের কারণে অক্সিজেন না পেয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
তবে কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টুইশার দেহে একাধিক ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে; যার মধ্যে হাত, আঙুল এবং মাথার ত্বকে কালশিটে দাগ মিলেছে। এই তথ্যগুলোই পরিবারের সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া ময়নাতদন্তে জানা গেছে, মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে টুইশা গর্ভপাত করিয়েছিলেন। পরবর্তী পরীক্ষার জন্য তার ডিএনএ এবং টক্সিকোলজি নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, এসব আঘাতের বিষয়ে পুলিশ কোনও তদন্তই করেনি।
ফাঁসের উপাদান নিয়ে বড় প্রশ্ন
এই মামলার অন্যতম বড় রহস্য তৈরি হয়েছে গলায় ফাঁস দেওয়ার উপাদানটি নিয়ে। প্রথম দিকে পুলিশ দাবি করেছিল, টুইশা নাইলনের বেল্ট ব্যবহার করে আত্মহত্যা করেছেন। তবে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এইমসের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট লেখা আছে যে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ময়নাতদন্তের সময় ফাঁসের সেই উপাদানটি চিকিৎসকদের কাছে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা গলার দাগের সঙ্গে ফাঁসের উপাদানের বৈজ্ঞানিক মিল খুঁজে পাননি। পরবর্তীতে আবার টুইশার ঝুলন্ত লাশের ছাদ থেকে একটি ব্যায়ামের রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড উদ্ধারের কথা বলা হয়।
প্রমাণ লোপাটের এই চেষ্টাকে পুলিশের বড় ধরনের গাফিলতি হিসেবে দেখছে পরিবার। টুইশার বাবা নবনিধি শর্মা বলেন, ‘ফাঁসের উপাদান জমা না দিয়েই পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মতো সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার কীভাবে বিচারের আশা করতে পারে?’
যৌতুকের জন্য অত্যাচার ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশ
টুইশার পরিবার জানিয়েছে, বিয়ের পর থেকেই যৌতুক নিয়ে তার ওপর অবিরাম মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালানো হতো। টুইশার পাঠানো বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজেও সেই কষ্টের কথা লেখা ছিল। এর প্রতিবেদন অনুসারে, টুইশার শাশুড়ি গিরিবালা সিংহ একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং বর্তমানে তিনি কনজ্যুমার কোর্টে কর্মরত আছেন।
টুইশার বাবা আরও অভিযোগ করেন, ‘ভোপাল লোকায়ুক্ত পুলিশের প্রধান সত্যেন্দ্র সিংহ হলেন শাশুড়ি গিরিবালা সিংহের আত্মীয়। ফলে অভিযুক্তদের আড়াল করতে পুলিশের ওপর ওপরমহল থেকে প্রচণ্ড চাপ রয়েছে।’
বিচারের দাবিতে আন্দোলন
ন্যায়বিচারের দাবিতে টুইশার পরিবার আদালতে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত এবং সিবিআই অথবা সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তদন্তের আবেদন জানিয়েছে। তবে বুধবার ভোপালের একটি আদালত লাশ সংরক্ষণের পরিকাঠামোগত অভাবের কথা উল্লেখ করে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছেন। যদিও একই দিনে ভোপালের পুলিশ কমিশনার সঞ্জয় কুমার জানিয়েছিলেন যে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে পুলিশের কোনও আপত্তি নেই।
এদিকে কয়েক দিন ধরে ভোপালে অবস্থান নেওয়া টুইশার মা-বাবা বুধবার মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের সঙ্গে দেখা করেন। মুখ্যমন্ত্রী তাদের সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। এরপরই তারা রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে এই মৃত্যুর তদন্তে হস্তক্ষেপের দাবি জানান।
পুলিশ ইতোমধ্যে যৌতুক নির্যাতনের মামলা দায়ের করে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করেছে এবং টুইশার স্বামী সমর্থ সিংহের বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ জারি করেছে। অন্যদিকে টুইশার শ্বশুরবাড়ির লোকজন সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, টুইশার মানসিক সমস্যা ছিল, তিনি গাঁজা সেবন করতেন এবং আবেগবশত হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে












