মজিদ মাহমুদ
প্যারিসের শীতটা সেদিন যেন একটু বেশি তীক্ষ্ণ ছিল। চার্লস দ্য গল বিমানবন্দরের কাঁচের দেয়ালের বাইরে ধূসর আকাশ, ভেতরে মানুষের কোলাহল-সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি কোনো কাঁচঘেরা নদীর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, যার স্রোত আমাকে ধীরে ধীরে এথেন্সের দিকে টেনে নিয়ে নিচ্ছে। কবিতার বইগুলো ব্যাগে গুছিয়ে নিয়েছি, পাসপোর্টের ভেতর টিকিটটা বারবার চেক করছি, অথচ মনটা কোথাও নেই। প্যারিসে কয়েকদিন সাহিত্য-আড্ডা, অনুবাদ-আলোচনা, বিদেশি পাঠক-সবই হলো, তবু ফেরার পথে এক অদ্ভুত শূন্যতা। যেন শহরের আলোয় হাঁটলেও ভেতরে একটা দীর্ঘ ছায়া লেগে থাকে।
বোর্ডিং কল হলো। আমি লাইনে দাঁড়ালাম। সামনে-পেছনে নানা ভাষা-ফরাসি, ইংরেজি, আরবি—তার মধ্যে মাঝেমাঝে গ্রিক উচ্চারণের শব্দও ভেসে আসছে। তখনই প্রথম তাকে দেখলাম। খুব বেশি নাটকীয়ভাবে না— কোনো সিনেমার মতো ধীরে ঘুরে তাকালাম আর তার চোখের সঙ্গে চোখ মিলল—এমন নয়। তাকে দেখলাম একটা সাধারণ দৃশ্যের ভেতরে, কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে আলাদা: নীল চোখ, যেন এক টুকরো ভূমধ্যসাগর গ্লাসের মধ্যে রাখা; গাঢ় বাদামি চুল, কাঁধ ছুঁয়ে নেমেছে; আর মুখে একটা অল্প হাসি, যেটা ঠিক হাসিও না, আবার নিরাসক্তিও না—একটা নরম স্বাভাবিকতা।
সে আমার পাশ দিয়েই হেঁটে গেল, ভীড়ের মধ্যে একবার মাথা ঘুরিয়ে আবার দেখল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—এই পৃথিবীতে কিছু মুখ অকারণেই চেনা লাগে কি না।
বিমানে উঠে আমি আমার সিট খুঁজলাম-উইন্ড সাইড। জানালার পাশে বসলে মনে হয় দূরত্বকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখা যায়। সিটে বসে বেল্ট বেঁধে জানালার বাইরে তাকালাম। কয়েক সেকেন্ড পর পাশের সিটে এসে কেউ বসলো। খুব কাছ থেকে এক মুহূর্তে তার পারফিউমের ঘ্রাণ টের পেলাম-হালকা, ফুলের মতো, কিন্তু অতিরিক্ত নয়। আমি মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম। সেই নীল নয়না।
“এক্সকিউজ মি,” সে বলল, “ইজ দিস সিট ফ্রি?”
আমি হালকা হাসলাম। “ইয়েস।”
সে ব্যাগটা ওপরে রাখল, বসে বেল্ট বাঁধল। তারপর একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কি… বাংলাদেশি?
আমি অবাক হলাম। “হ্যাঁ। আপনি কীভাবে…?
সে হেসে ফেলল। আমি অনুমান করেছিলাম। আপনার ব্যাগে যে বইটা দেখা যাচ্ছে, অক্ষরগুলো বাংলা মনে হলো। আমি কিছুটা ভাষা চিনতে পারি। আমার মা ফরাসি, বাবা গ্রিক। আমার মা একজন পলিগ্লট, নানা ভাষায় আগ্রহী।
তার নাম এলিনা। উচ্চারণটা মসৃণ, যেন “এ-লি-না” না, বরং একটা ছোট্ট সুর।
আমি বললাম, “আমি প্যারিস থেকে গ্রিস যাচ্ছি।”
“আমি-ও,” এলিনা বলল। “কিন্তু এথেন্সে নয়-আমরা থাকি রোডস আইল্যান্ডে।
রোডস। শব্দটা আমার কানে আগে কখনো এভাবে বাজেনি। আমার মনে হলো রোডস কোনো রোমান্টিক কবিতার নাম, কিংবা কোনো পুরনো উপাখ্যানের চরিত্র। আমি বললাম, “রোডস সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।
এলিনা একটু জানালার দিকে তাকাল, যেন আকাশের মেঘের ভাঁজে ভাঁজে দ্বীপটার ছবি খুঁজছে। তারপর বলল, “রোডস…গ্রিসের রানি বলা হয়। সাগর, দুর্গ, পুরনো শহর-সব আছে। আমার বাবা বলে, ইতিহাসটা সেখানে বাতাসের মধ্যে থাকে। আপনি যখন হাঁটবেন, মনে হবে পাথরও গল্প বলে।”
আমি তাকে শুনছিলাম, আর মনে হচ্ছিল-তার কথার ভেতরে সাগরের নোনা শব্দ আছে। চার ঘন্টার ফ্লাইট, অথচ তার প্রথম কয়েকটি বাক্যেই আমার ভ্রমণটা অন্যরকম হয়ে গেল। প্লেনের ইঞ্জিনের একঘেয়ে গর্জনও যেন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।
কিছুক্ষণ পর খাবার এলো। আমি কফি নিলাম, সে চা। কথার মাঝখানে সে আমার ব্যাগের দিকে চোখ ফেলল। “আপনি লেখেন?
আমি ব্যাগ খুলে একখানা পাতলা বই বের করলাম-‘আপেল কাহিনি’র ইংরেজি অনুবাদ ‘ফেবল অব দ্য আপল’। সেদিনই একজন প্রকাশককে উপহার দেওয়ার জন্য কয়েক কপি সঙ্গে এনেছিলাম। একটা কপি আমি এলিনার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। “নিন। আমার লেখা।”
এলিনা বইটা হাতে নিয়ে যেন একটু থেমে গেল। মানুষ সাধারণত উপহার নিলে প্রথমে কৃতজ্ঞতা জানায়, তারপর ব্যাগে রাখে। কিন্তু সে বইটা খুলল। প্রথম পৃষ্ঠায় তাকাল, তারপর একবার আমার নাম পড়ল, যেন উচ্চারণ ঠিক করতে চাইছে। তারপরই পড়তে শুরু করল-সিটে বসেই, বিমানের সেই সামান্য আলোয়।
আমি মনে মনে হাসলাম। এতটা আগ্রহী পাঠক প্যারিসের অনুষ্ঠানেও পাইনি। কিছুক্ষণ পর সে মাথা তুলল। তার চোখে একটা উষ্ণ বিস্ময়। “ইটস লাভ পোয়েট্রি, সে বলল, “বাট… দেয়ার’স সামথিং… ডিভাইন। বাইবেলের মিথ, গল্প—একটা ঐশ্বরিক আবহ তৈরি করেছে। প্রেমটা শুধু মানুষ-মানুষের নয়, যেন আকাশ-মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
আমি একটু চমকে গেলাম। বিদেশি পাঠকের কাছ থেকে এমন নিখুঁত অনুভব… আমি বললাম, “আপনি তো খুব গভীরভাবে পড়েন।” এলিনা হেসে বলল, “আমার মা কবিতা লেখে। ছোটবেলা থেকে কবিতার মধ্যে বড় হয়েছি। তাই শব্দের গন্ধটা চিনতে পারি।
তার মা কবি-এই বাক্যটা বলার সময় এলিনার মুখটা অদ্ভুতভাবে আলোকিত হলো। যেন মায়ের কথা বললে সে নিজেও আরও কোমল হয়ে ওঠে।
আমি মনে মনে ভাবলাম। মা এতো গুণি না হলে মেয়ে কিভাবে এতটা আকর্ষণীয় হয়। তাছাড়া গ্রিসে এসে আমি একজন হেলেনকে নিশ্চয় খুঁজেছিলাম।
আমরা কথা বলতে থাকলাম। কবিতা, দেশ, ধর্ম, সংস্কৃতি, আর আশ্চর্যজনকভাবে—সেই সব কথাও যা সাধারণত অপরিচিতদের সঙ্গে বলা হয় না: একাকীত্ব, ভালোবাসার অভাব, নিজের ভেতরের ভয়। সে বলল, রোডসে আকাশ নাকি রাতে খুব নীল হয়, এবং সাগরের গন্ধ ঘরের জানালায় এসে বসে থাকে। আমি বললাম, ঢাকার গ্রীষ্মের রাতে বৃষ্টির আগে কেমন অস্থির বাতাস, যেন পুরো শহর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
পাশের সারিতে বসেছিল সেলিম আর অরভিন ব্যানার্জীদা। দুজনই আমার পরিচিত, একই সম্মেলনের জন্য এসেছি। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি হাসছিল। মাঝেমাঝে বাংলায় ফিসফিস করে বলছিল, “কবির জন্য সারা পৃথিবী খোলা।” আমি কানে তুললাম না। বরং মনে হলো, পৃথিবী সত্যিই খোলা—কিন্তু খোলা দরজার সামনে দাঁড়ানোর সাহসটাই কঠিন।
ফ্লাইটের মাঝামাঝি সময় এলিনা হঠাৎ বলল, “আপনি কি কখনো গ্রিসে এসেছেন?
“না,” আমি বললাম, “শুধু এথেন্সে নামবো। তারপর… দেখা যাক।” এলিনা জানালার বাইরে তাকাল। আকাশের নিচে মেঘ যেন সাদা দ্বীপের মতো। সে বলল, “রোডসে আসবেন না? আপনি কবি—আপনি রোডসে হাঁটলে… আপনার শব্দ বদলে যাবে।”
এই কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কাঁপুনি হলো। কেউ যদি বলে-তোমার শব্দ বদলে যাবে-সেটা ভ্রমণের প্রস্তাব নয়, সেটা জীবনের প্রস্তাব। আমি মৃদু হেসে বললাম, “ইচ্ছা আছে। কিন্তু…”
“কিন্তু কী?” এলিনা জিজ্ঞেস করল।
আমি উত্তর দিতে পারলাম না। কারণ “কিন্তু” শব্দটা আসলে অনেক বড়: সময় নেই, সাহস নেই, অজানা ভয় আছে, নিজের জীবনটা সোজা পথে বেঁধে রেখেছি-হঠাৎ অন্য পথে যাব কী করে?
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর এলিনা তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট নোটবুক বের করল। ফরাসি ভাষায় কিছু লিখল, তারপর ইংরেজিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আপনাকে আমার ঠিকানা দেব। আপনি এথেন্সে থাকুন বা না থাকুন, কখনো রোডসে এলে আমার মার সঙ্গে দেখা করে যাবেন। তিনি বিদেশি ভাষা ও কবিতার ব্যাপারে খুব আগ্রহী।
আমি বললাম, আপনার মা আমাকে কিভাবে নেবেন।
দুনিয়ার সব কবি এক গ্রহের” এলিনা বলল। “কবিতা একটা পাসপোর্ট।
তারপর সে একটু থেমে যোগ করল, “আর আমি… আমি চাই আপনি আসুন।
এই বাক্যটা সে খুব ধীরে বলল। যেন শব্দগুলোকে ভেঙে ভেঙে, সাবধানে, নিজের ভেতরের ভয় লুকিয়ে। আমি তখন লক্ষ্য করলাম-এত কথা বললেও তার মুখে একটা কিশোরী লাজ আছে। সে হঠাৎ হাসল, আবার চোখ নামিয়ে বলল, “আমি এখনো… একা। এখনো বয়ফ্রেন্ড নেই। সুতরাং আমার কোনো বাধা নেই।
আমি পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম না। আমি কোনো লোভে ভরা মানুষ নই, কিন্তু মানুষের স্বীকারোক্তি শুনলে ভেতরে একটা দায়িত্ববোধ আসে। আমি কেবল বললাম, “এলিনা, এটা আপনি এত সহজে বললেন…”
সে কাঁধ ঝাঁকাল। “লাইফ ইজ শর্ট। আর প্লেনের মধ্যে মানুষ সত্যি কথা বলে। কারণ আমরা জানি, নামার পর হয়তো আর দেখা হবে না।
তার “হয়তো” শব্দটাতে একটা পাতলা বিষাদ ছিল। আমি জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকালাম—মেঘের নিচে কোথাও ভূমধ্যসাগর।
চার ঘন্টার সেই পথ যেন চারদিনের মতো দীর্ঘ হয়ে গেল। আমরা ভুলে গেলাম ভাষা, জাতীয়তা, ধর্ম—সব যেন কোনো পুরনো বিভাজন, যা আজকের দিনটায় দরকার নেই। আমি জানতাম না, আমি একজন কবি হয়ে কথা বলছি, নাকি একজন সাধারণ মানুষ হয়ে। এলিনা জানত না, সে একজন গ্রিক মেয়ে, নাকি কোনো উপকথার চরিত্র। আমরা দুজনই শুধু ছিলাম-দুইজন মানুষ, যারা একই জানালার পাশে বসে দূরত্ব দেখছে।
এথেন্সে পৌঁছানোর ঘোষণা এল। প্লেন নামতে শুরু করল। আলো নিভে জ্বলে উঠল। যাত্রীরা ব্যাগ গুছাতে শুরু করল। এলিনা নোটবুকের একটা পাতায় তার ঠিকানা লিখে আমার হাতে দিল। তার হাতের লেখাটা পরিপাটি, কিছুটা বাঁকানো-মায়ের কবিতার ছায়া যেন তাতে আছে। আমি ঠিকানাটা হাতে নিয়ে বললাম, “আমি চেষ্টা করব আসতে।
সে একবার আমার দিকে তাকাল। “চেষ্টা নয়,” সে বলল, “আসবেন। রোডস আপনাকে ডাকছে।”
বিমানের দরজা খুলল। যাত্রীরা নামতে লাগল। সেলিম আর অরভিনদা আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে আবার হাসল। অরভিন বলল, “দেখলেন? ভাগ্য!” আমি কিছু বললাম না। আমার মাথার ভেতর তখন শুধু এলিনার কণ্ঠ: “রোডস আপনাকে ডাকছে। এয়ারপোর্টের ভেতর এলিনা বিদায়ের আগে একটু থেমে বলল, “আপনি এথেন্সে থাকবেন কতদিন?” আমি বললাম, “দুই রাত।”
“তাহলে… যদি পারেন,” সে বলল, “একদিন রোডসের ফ্লাইট ধরুন। খুব ছোট পথ। আর… আমার মা-তিনি আপনাকে পছন্দ করবেন। তিনি বলেন, কবির মধ্যে ঈশ্বরের একটা গোপন আলো থাকে।
আমি হাসলাম, কিন্তু হাসির ভেতর একটা ব্যথা। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম-এই মেয়েটাকে হয়তো আর কখনো দেখব না, অথচ এই কয়েক ঘন্টা তাকে আমার জীবনের কোনো গোপন পাতায় লিখে ফেলেছে।
সে চলে গেল। ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। কিন্তু তার নীল চোখ যেন আমার সামনে রইল—একটা সাগরের মতো, যার তীরে আমি দাঁড়িয়ে আছি, আর ঢেউ আমাকে টেনে ডাকছে।
আমি এথেন্সে গেলাম, শহর দেখলাম, অ্যাক্রোপলিসের পাথর ছুঁলাম, প্লাকার গলিতে হাঁটলাম। কিন্তু সবকিছুর মাঝেও মনে হচ্ছিল-আমি একটা শহরে আছি, অথচ আমার মনটা কোথাও দ্বীপে আটকে আছে। দুই রাতে কয়েকবার ঠিকানাটা বের করে দেখলাম। রোডস নামটা বারবার পড়লাম। মনে হচ্ছিল, নামটা পড়লে এলিনার কণ্ঠ শুনতে পাব।
কিন্তু যাইনি।
কেন যাইনি? কারণ বাস্তবতা আমাদের হাত ধরে টেনে আনে। কাজ, সময়, পরিকল্পনা, ভয়—সব একসাথে দাঁড়িয়ে বলে, “এখন নয়।” মানুষ “এখন নয়” বলতে বলতে কত “কখনো না”-র দিকে চলে যায়, টেরও পায় না।
দেশে ফিরে এলাম। ঢাকার রাস্তায় সেই পুরনো ধুলো। জীবনের পুরনো চেনা ছন্দ। কিন্তু এলিনা ভুলে থাকল না। মাঝে মাঝে রাতে মনে হতো-এথেন্সের এয়ারপোর্টে আমি যদি একটু সাহস করতাম! যদি বলতাম—“চলো, রোডস যাই।” যদি নিজের জীবনকে একবার কবিতার মতো বাঁচতাম!
আমার এথেন্স ভ্রমণটি এতো সংক্ষিপ্ত ছিল- আলেকজান্ডারের ভারত জয়ের মতো সংক্ষিপ্ত। পরিচিত দুএকজনের খোঁজ নিতেও পারলাম না। সে সময়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে সুজন দেবনাথ থাকতেন। হেমলকের পেয়ালা নিয়ে বড় একটা বই লিখেছেন। পরেদিন ফেরার পথে এয়ারপোর্টে ঢোকার পরে তার ফোন পেলাম। যদিও তিনি বললেন, ‘ফিরে আসেন- এতো কম সময় নিয়ে কেউ গ্রিসে আসে না।’
ফিরে যেতে ইচ্ছে করলো; কিন্তু পোস্টমাস্টারের মতো ‘‘তখন হৃদয়ের মধ্যে অত্যন্ত একটা বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন— একটি ‘অল্প পরিচিত গ্রিক’ বালিকার করুণ মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যথা প্রকাশ করিতে লাগিল। একবার নিতান্ত ইচ্ছা হইল, ‘ফিরিয়া যাই, জগতের ‘নব পরিচিত এই বিদেশিনী’কে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি’— কিন্তু তখন পালে বাতাস পাইয়াছে, ‘উধ্ব গগনের বাতাস’ বেগে বহিতেছে, ‘আকাশ’ অতিক্রম করিয়া ‘ঢাকার আকাশের লালিমা’ দেখা দিয়াছে— এবং ‘আকাশগঙ্গা’য় ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্ত্বের উদয় হইল, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী। পৃথিবীতে কে কাহার।’
কয়েক মাস পর একদিন ইমেইল খুলে এলিনার ঠিকানায় লিখেছিলাম। লিখেছিলাম-“আমি এখনো আসতে পারিনি, কিন্তু রোডসের কথা মনে আছে।” কোনো উত্তর আসেনি। হয়তো ঠিকানাটা বদলে গেছে। হয়তো সে ইমেইল ব্যবহার করে না। হয়তো জীবন তাকে অন্য দিকে নিয়ে গেছে। আর হয়তো—কিছু সম্পর্ক কেবল স্মৃতির জন্যই জন্মায়, বাস্তবের জন্য নয়।
সময় গেল। একদিন শুনলাম-কেউ বলল, “রোডস দ্বীপ খুব সুন্দর।” তখন হঠাৎ বুকের ভেতর একটা পুরনো আলো জ্বলে উঠল। আমার মাথায় রোডস মানে সমুদ্র, দুর্গ, পুরনো শহর-এসব নয়। আমার কাছে রোডস মানে এলিনা। নীল চোখের মেয়ে, যে বিমানের এক পাশে বসে আমার কবিতা পড়ে বলেছিল-“ডিভাইন অ্যাটমোস্ফিয়ার।” যে বলেছিল “রোডস আপনাকে ডাকছে।
আমি জানি, সারা গ্রিস যদি সক্রেটিসের দেশ হয়, রোডস আমার কাছে একটি একক মুখের দেশ-এলিনার মুখ। হয়তো কোনোদিন রোডসে যাব। হয়তো যাব না। কিন্তু আমার ভেতরে একটা দ্বীপ আছে, যেখানে এলিনা এখনো দাঁড়িয়ে—সাগরের হাওয়া গায়ে মেখে, হাতে আমার কবিতার বই, চোখে সেই নীল বিস্ময়।
আর আমি?
আমি পৃথিবীর এক শহরে বসে থাকি, কাজ করি, হাসি, কথা বলি। কিন্তু কখনো কখনো জানালার বাইরে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়-একটা প্লেন যাচ্ছে প্যারিস থেকে গ্রিসের দিকে। জানালার পাশে একজন কবি বসে আছে। পাশে বসেছে নীল নয়না এক মেয়ে। তারা চার ঘন্টার মধ্যে ভুলে গেছে ভাষা, ধর্ম, জাতীয়তা। তারা শুধু মানুষ হয়ে গেছে। এবং সেই মুহূর্তটা-যেখানে সব দেয়াল ভেঙে যায়—সেটাই হয়তো সত্যিকারের প্রেমের সংজ্ঞা। রোডস দ্বীপের কথা এলেই এলিনাকেই মনে পড়ে।
কিছু হারিয়ে গেলে যেমন একটা নাম মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকে, তেমনি এলিনা আমার ভেতরে ঘুরে বেড়ায়-একটা দ্বীপের মতো, যেটা মানচিত্রে আছে, কিন্তু আমার কাছে আরও বেশি আছে স্মৃতিতে।
আর স্মৃতিই তো কবির সবচেয়ে বড় দেশ। আর একটি কণ্ঠ- ‘রোডস আপনাকে ডাকছে।’