সাতক্ষীরায় জননিরাপত্তার সংকট: জবাবদিহি কোথায়?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রথম সাতক্ষীরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতবেশি অবনতির দিকে গিয়েছে। যেখানে প্রতিদিন প্রকাশ্যে দিবালোকে খুন, জবরদস্তি জমি দখল, সন্ত্রাস, গণপিটুনি, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, মাদক ও চোরাকারবার এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সাতক্ষীরার মানুষের নিত্যদিনের জীবনসংগ্রামের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ সাতক্ষীরা বাংলাদেশের এমন একটি জেলা, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলে মানুষের ভোট নিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচিতরা ক্ষমতায় যাওয়ার পর সাতক্ষীরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং অপরাধ দমনে কার্যকর কোন ভূমিকা রাখতে দেখা যায় না।
নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, জেলার মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন, শিশু ও নারী নির্যাতন দমন, হত্যা ও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ এবং সাতক্ষীরাকে একটি শান্তিপূর্ণ মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলার কথা বারবার বলা হয়। কিন্তু নির্বাচনের পর আমরা তার বিপরীত চিত্র দেখতে পাচ্ছি। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে জনপ্রতিনিধিদের দৃশ্যমান কোন ভূমিকা না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাঁরা কি নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত, নাকি জেলার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাঁদের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে? আজ সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণের মতো ভয়াবহ সমস্যা থেকে জেলার মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি কোথায়?
বিগত ২৪ মাসে সাতক্ষীরা জেলার ৮টি থানা এলাকায় ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং ঘের দখলকে কেন্দ্র করে হত্যাকান্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মোট হত্যাকান্ডের ঘটনায় এই দুই বছরে সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় ৭৫টি মামলা রুজু হয়েছে। হাতে তুলে নেওয়ার জঘন্য প্রবণতা এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। জেলায় অন্তত ১৪টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে সাতক্ষীরা সদরে ৭ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এই ২৪ মাসে জেলায় ৩৮টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতক্ষীরার বিভিন্ন থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রায় ১,৩০০টি মামলা দায়ের হয়েছে। সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়ন ও পুলিশের যৌথ অভিযানে এই দুই বছরে সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে ফেন্সিডিল, ইয়াবা, হেরোইন এবং ভারতীয় পণ্যসহ ১১০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের অবৈধ চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা হয়েছে। ঘের ও জমি দখলকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় প্রায় ২৫০টির বেশি সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে বহু মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে।
সাতক্ষীরার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ফারাকের অভিযোগ উঠেছে। তার জবাব জনগণ তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন। জেলার সাধারণ মানুষ জানতে চান-হত্যা, গণপিটুনি, ধর্ষণ, মাদক, চোরাচালান ও জবরদখল বন্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং আগামী দিনে কী কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে? সাতক্ষীরার মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও আইনের শাসন চান। তাঁরা এমন একটি জেলা চান, যেখানে নারী ও শিশু নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে, মানুষ নির্ভয়ে বসবাস করতে পারবে, জমি ও মৎস্য ঘেরের মালিকেরা তাঁদের সম্পদের নিরাপত্তা পাবেন এবং অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে কোনো ধরনের ছাড় পাবে না।
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা।





