সিরাজুল ইসলাম: অগ্রিম পাঁচ মাসের জলবদ্ধতার কবলে পৌর এলাকাসহ সাতক্ষীরার লাখ মানুষ পানিবন্দী। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও একই ঘটনা ঘটেছে। ভারী বৃষ্টিতে দলবদ্ধতার কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছে না হাজার হাজার মানুষ। দুই সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এতে স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ডুবে গেছে বাড়িঘর এবং ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ। ভুক্তভোগীরা পৌর এলাকার অচল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও শহরতলীতে অপরিকল্পিত মাছের ঘেরকে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৪৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জুলাই সর্বোচ্চ ১৭৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।
সাতক্ষীরা পৌরসভার কামালনগর, ইটাগাছা, মধুমোল্যারডাঙ্গী, বদ্দীপুর কলোনী, মধ্যকাটিয়া, রইচপুর, রাজারবাগান, পুরাতন সাতক্ষীরাসহ সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় কোমরসমান জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে নাগরিক দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া সদর উপজেলার মাগুরা, বিনেরপোতা, গোপিনাথপুর, গোবিন্দপুর, মাছখোলা, ঝাউডাঙ্গা, বল্লী, লাবসা, ব্রক্ষ্ররাজপুর, ধুলিহর ইউনিয়নের নিম্মাঞ্চলের অধিকাংশ স্থান এখনও কোমর পানিতে ডুবে আছে।
জলাবদ্ধতায় ডুবে যাওয়া ঘরবাড়িতে রান্নাবান্না কষ্টকর হয়ে পড়েছে। সাপ ও পোকামাকড়ের উপদ্রবে আতঙ্ক বাড়ছে। অনেক এলাকায় রাস্তা জলমগ্ন থাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বদ্দীপুর কলোনীর জাহেদা খাতুন বলেন, আমরা ১ যুগ ধরে এ অবস্থায় আছি। বৃষ্টি হলেই আমাদের এই এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। রান্না-বান্না করা সম্ভব হয় না। ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মধ্যে বসবাস করে আমরা ন্যূনতম নাগরিক সেবা পাই না।
রইচপুর এলাকার রাহিনুর রহমান বলেন, বৃষ্টির পানি এতটুকু সরছে না। রইচপুরের নিচের দিকে অনেকগুলো মাছের ঘের। তাই পানি সরতে পারছে না। দীর্ঘদিন জমা পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। তাই ঘরে ঘরে চর্মরোগ বেড়েছে।
এ বিষয়ে ইটাগাছা এলাকার মোকাররম বিল্লাহ জানান, আমাদের পরিবারের সবার পায়ে ঘা-পাচড়া হয়েছে। একদিকে যেমন প্রচুর চুলকাচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালা-যন্ত্রণা ও করছে।
মধ্যকাটিয়া এলাকার আমেনা খাতুন বলেন, আমাদের পুরো রাস্তা পানিতে ডুবে আছে। ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। তার ওপর এখন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে পরীক্ষা। মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসে ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা যাতে ভালো হয়, তার জন্য। আর আমাদের কী কপাল! জলাবদ্ধতার কারণে ঘর থেকে বের হতে পারি না।
স্কুল ছাত্রী মাইশা তামান্ন বলেন, রাস্তা ওপরে হাটু পানি হওয়ায় ভ্যান রিকশা চালাচল করে না। দীর্ঘ দেড় মাস পানিবন্দী হয়ে আছি। স্কুলে যাওয়ার সময় ভেজা কাপড়ে স্কুলে যেতে হয়। এতে করে আমাদের লেখা পড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পৌরসভার কুলিন পাড়ার নজরুল ইসলাম জানান, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা শহরের একাডেমি মসজিদ থেকে জেবুনেছা ছাত্রীনিবাস, মুন্সিপাড়া থেকে ফকির ময়ারার বাড়ি ও মুনজিতপুরের চৌধুরি বাড়ি হতে খোলার টালি, বদ্দীপুর কলোনী, সরদার বাড়ি, মাদরাসা পাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে আছে। এসব রাস্তায় দুই থেকে তিন ফুট পর্যন্ত পানি। এসব এলাকার মানুষের ঘরের ভেতর পানি ওঠায় বাসা ভাড়া নিয়ে অনেকেই অন্যত্র চলে গেছে।
সদর উপজেলার বড়দল গ্রামের মোকলেছুর রহমান জানান, সদর উপজেলার বেতনা নদীর নব্যতা না থাকার এখন শহর ও কয়েকটি ইউনিয়নে বর্ষা মৌসুম পানি নিষ্কাশন হয় না। ফলে এসব এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। আমাদের এলাকার শতাধিক পরিবার জলাবদ্ধতার কারণে পানিবন্দী হয়ে আছে। আমন মৌসুমে রোপণ আমন ধান পানিতে ডুবে থাকায় এলাকার কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নাগরিক অধিকার উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, শহরের মধ্যে বিধিবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং শহরতলীতে যত্রতত্র মাছের ঘের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ সদর উপজেলার অধিকাংশ জায়গায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্কুল-কলেজগামী ছাত্র ছাত্রীরা পড়েছে বিপাকে। রসুলপুর, কামালনগরসহ বিভিন্ন জায়গায় এই যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, এটা দূর করতে খালগুলো গভীর করতে হবে। এছাড়া যারা যত্রতত্র মাছ চাষ করছে, পানি আটকে রাখছে-এগুলো অপসারণ করা আমাদের দাবি। এছাড়া নেটপাটা অপসারণ করাও জরুরি।
জেলা মৎস্য অফিসার জি. এম. সেলিম জানান, “বৃষ্টির পানিতে ২ শতাধিক মাছের ঘের ভেসে গেছে, যার আনুমানিক ক্ষয়-ক্ষতি কোটি টাকা।”
জেলার অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন বলেন, অতিবর্ষণে জেলার ৬৩টি প্রাইমারি স্কুল জলাবদ্ধতার কবলে রয়েছে। এর মধ্যে আশাশুনি উপজেলায় ২০টি, কলারোয়ায় ১০টি, তালায় ১টি, শ্যামনগরে ১২টি ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ২০টি স্কুল ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। চেয়ার-টেবিল ডুবে যাওয়ায় সেসব স্কুলে ক্লাস চালানো খুবই কষ্টের। তবুও কোমলমতি শিশুদের কথা ভেবে কষ্ট করে হলেও ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার বাগডাঙ্গি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে পারছেন না শিক্ষকরা।
জেলা মৎস্য অফিসার জিএম সেলিম বলেন, বৃষ্টির পানিতে ২ শতাধিক মাছের ঘের ভেসে গেছে, যার আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতি কোটি টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ৬ হাজার হেক্টর আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে। আর কিছু সবজি ক্ষেত পঁচে গেছে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম এই প্রতিবেদককে জানান, প্রকল্পটির ১০০%শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। তিনি আরো বলেন মানুষের ফেলা ময়লা আবর্জনা ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে এবং কিছু অসৎ মানুষ এর অবৈধ স্থাপনের কারণে প্রতিবছর সাতক্ষীরায় জলবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, এতে কষ্ট পাচ্ছে লাখো মানুষ। তিনি আরো বলেন, বিষয়টি নিয়ে দল মত নির্বিশেষে সকলকে একমত হয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে তা না হলে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী জলবদ্ধতার কবল থেকে রক্ষা করা দুষ্কর হয়ে পড়বে। আশরাফুল আলম আরো বলেন, সাতক্ষীরা জলবদ্ধতার জন্য শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দুষলে হবে না সকলকে উদ্যোগ দিতে হবে তাহলে এটা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, পৌরসভাসহ সদর উপজেলার জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজ চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, বিগত সময়ের মতো এবারও কিছু পয়েন্ট করে সেখানে কেটে বা ড্রেন করে বা খাল খনন করে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রক্রিয়া চলছে। বিশেষ করে বদ্দীপুর কলোনীতে জলাবদ্ধতা প্রকট। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কলুবোল্লার খালের যে অংশে চর পড়েছে, সেই অংশ খনন করে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা। আর কামালনগর খালের বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে সমাধানের চেষ্টা করব। আর সিল্টেড স্লুইস গেটগুলো, যেগুলো জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ, সেগুলো অপসারণের চেষ্টা করছি। এগুলো বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে।
এদিকে সাতক্ষীরায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর করতে ও স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করতে খালের অবৈধ নেট-পাটা অপসারণে নেমেছে জেলা প্রশাসন। শনিবার শহরের বাইপাস সড়ক সংলগ্ন খালে এ উচ্ছেদ অভিযানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে খালের পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
শনিবার দুপুরে সাতক্ষীরা শহরের বাইপাস সড়ক সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী খালে এই বিশেষ উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ। বর্ষা মৌসুমে শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই বিশেষ কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়।
অভিযানের উদ্বোধনকালে জেলা প্রশাসক অবৈধ দখলদারদের সতর্ক করে বলেন, সারাদেশে সরকারি উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। এটি সাময়িক কোনো কাজ নয়, বরং এটিকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী ঘের মালিকের চিংড়ি চাষের জন্য খালের পানি প্রবাহ আটকে রাখার কারণে লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তীব্র বর্ষার এই সময়ে সবাইকে নিজ দায়িত্বে খালের সব অবৈধ নেট-পাটা এবং বাঁধ সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এরপরেও যদি খালের স্বাভাবিক পানি চলাচলে বিঘœ ঘটানোর প্রমাণ মেলে, তবে প্রশাসন আইন অনুযায়ী কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।