প্রকাশ ঘোষ বিধান
বিশ্বজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ভূমি অধিকার হরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, ভাষার বিলুপ্তি, প্রান্তিকীকরণ এবং সাংস্কৃতিক বিলুপ্তির মতো মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। আধুনিকায়নের চাপে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক পরিচয় দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠী আধুনিক উন্নয়ন ও বন ধ্বংসের ফলে তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ও অস্তিত্ব আজ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬.২ শতাংশ আদিবাসী। বিশ্বের ৯০টি দেশে প্রায় ৫০ কোটি আদিবাসী বসবাস করলেও তারা ক্রমাগত তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
১৯৯২ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ উপকমিশনের কর্মকর্তারা তাদের প্রথম সভায় বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৩ সালকে জাতিসংঘ প্রথমবার বিশ্বে আদিবাসী বর্ষ ঘোষণা করে। পরের বছর ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতি বছর ৯ আগস্টকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৯৪ সালে বিশ্বে প্রথমবারের মতো আদিবাসী দিবসটি পালিত হয়। বিশ্বের সব আদিবাসীর অধিকার, শত বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হয়।
আদিবাসী জনগোষ্ঠী বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা ভূখন্ডে উপনিবেশ স্থাপন বা অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষের অভিবাসনের পূর্বে যারা প্রথাগতভাবে সেখানে বসবাস করে আসছে, তাদের বংশধরদের বোঝায়। এরা সাধারণত নিজস্ব সংস্কৃতি, সামাজিক নিয়ম, ভাষা এবং ঐতিহ্যের অধিকারী হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীবাংলাদেশ এবং প্রাচীন বাংলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিভিন্ন সমৃদ্ধ আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায়। ভৌগোলিক অবস্থানভেদে এদের প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন পাহাড় ও সমতাল। পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীরা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, পাংখোয়া, খিয়াং, খুমি, লুসাই এবং চাক। সমতল অঞ্চলের আদিবাসীরা সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, মুন্ডা, ওরাওঁ, হাজং, রাজবংশী, কোচ, কোল এবং ডালু।
বাংলাদেশে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, মণিপুরি, ম্রো, তঞ্চঙ্গা প্রভৃতি ১৪ জনগোষ্ঠী প্রাচীনকাল থেকেই আদিবাসী হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। কিন্তু বর্তমান সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসী শব্দকে বিলুপ্ত করে ৫০টি জাতিগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্প্রতি গেজেট প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ৫০ জাতের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছেন। তারা হলো চাকমা,ওরাঁও, কোচ, কোল, খাসিয়া বা খাসি, খিয়ং, খুমি, গারো, চাক, ডালু, তঞ্চঙ্গা, ত্রিপুরা, পাংখোয়া বা পাংখো, বর্মণ, বম, মণিপুরী, মারমা, পাহাড়ি বা মালপাহাড়ি, মুন্ডা, ম্রো, রাখাইন, লুসাই, সাঁওতাল, হাজং, মাহাতো বা কুর্মি মাহাতো বা বেদিয়া মাহাতো, কন্দ, কড়া, গঞ্জু, গড়াইত, গুর্খা, তেলী, তুরি, পাত্র, বাগদী, বানাই, বড়াইক বা বাড়াইক, বেদিয়া, ভূমিজ ভূইমালী, ডিল, মালো বা ঘাসিমালো, মাহালী, মুসহর, রাজোয়াড়, লোহার, শবর, হুদি, হো, খারিয়া বা খাড়িয়া এবং খারওয়ার বা খেড়োয়ার। এসব নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী লোকজনের অধিকাংশই পাহাড়ে ও সামান্য কিছু সমতলে নানা বঞ্চনা ও হয়রানির শিকার হয়ে যুগ যুগ ধরে বসবাস করছে। তবে সংবিধানে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শব্দগুলো পরিবর্তন করে সরাসরি আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি এখনও জোরালো।
জল, জঙ্গল আর পাহাড়ের সাথে তাদের জীবন ও অর্থনীতি নিবিড়ভাবে জড়িত। অধিকাংশ সম্প্রদায়েরই নিজস্ব মৌখিক বা লিখিত মাতৃভাষা রয়েছে। বিজু, সাংগ্রাই, ওয়ানগালা, সোহরাই ইত্যাদি তাদের নিজস্ব প্রধান উৎসব। নিজস্ব সমাজ পরিচালনা ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রথাগত রাজা বা হেডম্যান ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে। বর্তমান প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহভূমির অধিকার সংকট, প্রথাগত জমির মালিকানা হারানো এবং উচ্ছেদ হওয়া বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সমস্যা। নিজস্ব ভাষার লিখিত রূপের অভাব এবং চর্চা কমে যাওয়ায় অনেক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো; বহুজাতিক কর্পোরেশন ও প্রভাবশালী মহলের কারণে আদিবাসীরা তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারাচ্ছে। অনেক দেশে আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের কোনো আইনি দলিল বা স্বীকৃতি নেই। আধুনিকতার চাপ এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে আদিবাসীদের নিজস্ব মাতৃভাষা ও মৌখিক ঐতিহ্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। মূলধারার সংস্কৃতির আধিপত্যের কারণে তরুণ আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও আলাস্কার মতো অঞ্চলের উপকূলীয় ক্ষয় আদিবাসীদের বাস্তুচ্যুত করছে। আমাজনের দাবানল ও নির্বিচারে বন উজাড়ের কারণে আদিবাসীরা তাদের জীবন ধারণের মূল উৎস হারাচ্ছে। শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে তারা চরমভাবে বঞ্চিত। বিশ্বজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করে।
এই বৈশ্বিক সংকটগুলোর সমাধানে প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়। বিশ্ব জুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জমি ও সম্পদ নিয়ে হুমকি, তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণতার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তারা সাংস্কৃতিক বিলুপ্তি, প্রান্তিকীকরণ ও বর্জনের ক্রমাগত ঝুঁকিতে থাকে। বিশ্বজুড়ে আদিবাসী দিবসের আলোচনা ও বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে তাদের সুরক্ষার বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট