সুন্দরবন বন্ধ, নাকি খোলা? বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে সচেতন মহলের প্রশ্ন
উপকূলীয় অঞ্চল (শ্যামনগর) প্রতিনিধি: সরকার ঘোষিত তিন মাসের প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে সব ধরনের মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে সেই নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কাগজে-কলমে বন বন্ধ থাকলেও সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে অসংখ্য মাছ ও কাঁকড়া আহরণকারী নৌকার বিচরণ দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে বন বিভাগের তদারকি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের পুষ্পকাটি, দোবেকি, লটাবেকিসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিগণে জেলেদের নৌকা প্রবেশ করছে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে সমঝোতা করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব নৌকাকে বনে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এরপর তারা অবাধে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে বাজারজাত করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে ও বাওয়ালি জানান, বন বন্ধ থাকলে সাধারণত বনে মানুষের আনাগোনা কমে যায়। সে সময় যারা প্রবেশ করতে পারেন, তারা তুলনামূলক অনেক বেশি মাছ ও কাঁকড়া পান। একজন জেলে বলেন, “বন বন্ধের সময় মাছ ও কাঁকড়ার উৎপাদন বেশি থাকে। তাই যারা যেতে পারি, তারা ভালো আয় করি। কিন্তু সবাই তো যেতে পারে না।”
অন্যদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অবৈধভাবে বন ব্যবহার করছে। এতে সরকারের রাজস্ব যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
এদিকে সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বনদস্যুদের তৎপরতাও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন জেলেকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবন বন্ধ রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো মাছ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা এবং বনজ সম্পদ সংরক্ষণ করা। কিন্তু যদি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না হয়, তাহলে সরকারের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ বিষয়ে বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, বন বন্ধের সময় নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ যদি নির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ দিতে পারেন, তবে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কেবল বক্তব্যে নয়, বাস্তবেও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ এবং এ কাজে জড়িত ব্যক্তি বা চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের স্বার্থে প্রতিবছর নির্ধারিত সময়ে বন তিন মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই ও প্রমাণ সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করতে পারে।









