সুন্দর ও আলোকিত শহর, এবং আমাদের ঘিঞ্জি সাতক্ষীরা
আল মুতাসিম বিল্লাহ সুমন
(প্রথম পর্ব) বাংলাদেশের মানচিত্রের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের শেষ প্রান্তের জেলা সাতক্ষীরা। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই জনপদটি দেশের অর্থনীতিতে যে কত বড় ভূমিকা রাখে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সাদা সোনাখ্যাত চিংড়ি, বিশ্বখ্যাত হিমসাগর আম, সুন্দরবনের মধু আর ভোমরা স্থলবন্দরের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব, সবই আসে এই সাতক্ষীরা থেকে। অথচ পরিতাপের বিষয় হলো, যে জেলাটি দেশের অর্থনীতিকে এত কিছু দিচ্ছে, সেই জেলার প্রাণকেন্দ্র সাতক্ষীরা শহরটি নিজেই চরম অবহেলিত, শ্রীহীন ও দমবন্ধ করা জনপদে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে অনেক শহর রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে দেশের প্রায় প্রতিটি শহরেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, শহরের সৌন্দর্য বাড়াতে নেওয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ব্যতিক্রম কেবল সাতক্ষীরা। দেশের অধিকাংশ শহর যখন নিজেদের নতুন রূপে সাজিয়ে নিয়েছে, সাতক্ষীরা তখন যেন ক্রমেই পিছিয়ে গেছে অন্ধকার আর বিকৃঙ্খলার দিকে।
আমরা যদি রাজধানী ঢাকার বাইরে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখব রাজশাহী আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর একটি শহর। প্রশস্ত রাস্তা, ঝকঝকে ফুটপাত, সড়ক দ্বীপে সবুজের সমারোহ আর রাতের আলোকসজ্জা রাজশাহীকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একইভাবে সিলেট কিংবা আমাদের পাশের বিভাগীয় শহর খুলনাকেও সাজানো হয়েছে বেশ পরিপাটি করে। শুধু বিভাগীয় শহর কেন, দেশের অনেক জেলা শহরও আজ সৌন্দর্যের দিক থেকে দারুণ উদাহরণ তৈরি করেছে। আমাদের প্রতিবেশী জেলা যশোরের কথাই ধরা যাক, কিংবা দক্ষিণের আরেক জেলা পটুয়াখালী, এই শহরগুলোতে ঢুকলে যে কারো মন ভালো হয়ে যায়। প্রশস্ত সড়ক, পরিকল্পিত বিপণি বিতান, সুন্দর মোড় আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে বোঝা যায়, শহরগুলোকে ভালোবেসে কেউ আপন মনে সাজিয়েছে। কিন্তু যশোর বা খুলনা পেরিয়ে যখনই কেউ সাতক্ষীরা শহরে প্রবেশ করে, তখনই এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। মনে হয়, এ যেন কোনো আধুনিক শহর নয়, বরং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এক বিশাল ঘিঞ্জি বাজার।
অথচ সাতক্ষীরা কোনো নতুন শহর নয়। শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এক পৌরসভা শহর এটি। স্বাধীনতার পর দেখতে দেখতে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীতে সাতক্ষীরা শহরকে একটু সুন্দর করে সাজানো বা আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কোনো দূরদর্শী পরিকল্পনা নিতে দেখা যায়নি কাউকে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হয়েছে, শহরে নতুন মেয়র এসেছেন, আবার মেয়াদ শেষে চলেও গেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, যারাই নগর পিতার আসনে বসেছেন, তাঁরা শহরকে সাজানোর ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা ও রুচিহীনতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। একটি শহরের রাস্তাঘাট, পার্ক, খাল আর মোড়গুলোর চেহারা দেখলেই বোঝা যায় সেই শহরের হর্তাকর্তাদের রুচি বোধ কেমন। গত পঞ্চাশ বছরে সাতক্ষীরার মানুষ কেবল প্রতিশ্রুতিই শুনেছে, কিন্তু শহরের চেহারা বদলায়নি এক চুলও।
আসলে সাতক্ষীরা শহরকে সাজানো কি খুব কঠিন বা অসম্ভব কিছু? মোটেই না। এর জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পেরও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেবল একটু সদিচ্ছা, নান্দনিক রুচি বোধ আর সঠিক পরিকল্পনা। কিন্তু দীর্ঘদিনের অযতœ, অবহেলা আর সুষম উন্নয়নের অভাবে সাতক্ষীরা শহর আজ এক ঘিঞ্জি এবং বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হয়েছে। শত বছরের পুরনো এই জেলা শহরে আজও পর্যন্ত একটি ফোর-লেন সড়ক নেই। নেই কোনো রোড ডিভাইডার, নেই কোনো দৃষ্টিনন্দন আইল্যান্ড, নেই মানুষের বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো একটি আদর্শ পার্ক, এমনকি নেই আধুনিক কোনো সড়ক-বাতিও।
শহরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলে পথচারীদের প্রতিদিন জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে চলতে হয়। কারণ, সমগ্র শহরে ফুটপাত বলতে আজ আর অবশিষ্ট কিছু নেই। অবৈধ দখলদারিত্ব আর অনুমোদনহীন স্থাপনায় গিলে খাওয়া হয়েছে শহরের সব ফুটপাত। দোকানের মালামাল রাস্তার ওপর সাজিয়ে রাখা, ফুটপাত দখল করে টং দোকান বসানো আর যত্রতত্র ইজিবাইক ও ভ্যানের জটলা-সব মিলিয়ে সাতক্ষীরা শহর যেন এক চরম নৈরাজ্যের ক্ষেত্র।
সাতক্ষীরা শহরের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগের নাম এখন যানজট। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়কগুলোতে রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল আর বাস-ট্রাকের জটলায় নাভিশ্বাস ওঠে সাধারণ মানুষের। এই যানজটের মূল কারণ হলো শহরের অপ্রশস্ত সড়ক এবং রোড ডিভাইডার না থাকা। যে যার মতো করে উল্টো পথে গাড়ি ঢুকিয়ে দেয়, ফলে পাঁচ মিনিটের রাস্তা পার হতে সময় লাগে আধা ঘণ্টা।
এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে এবং শহরকে একটি আধুনিক রূপ দিতে হলে সবার আগে শহরের প্রধান সড়কগুলোকে রোড ডিভাইডার দিয়ে ফোর-লেনে উন্নীত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শহরের প্রবেশ-মুখ লাবসা থেকে আলিপুর পর্যন্ত, খুলনা রোড মোড় থেকে বিনেরপোতা পর্যন্ত এবং নিউ মার্কেট মোড় থেকে পুরাতন সাতক্ষীরা পর্যন্ত সড়ক গুলোকে অবিলম্বে চার লেনে রূপান্তর করা দরকার। এই তিনটি প্রধান সড়ক যদি মাঝখানে সুন্দর রোড ডিভাইডার দিয়ে ফোর-লেন করা যায় এবং ডিভাইডারের মাঝখানে ছোট ছোট বাহারি ফুলের গাছ ও সবুজের সমারোহ ঘটানো যায়, তবে একদিকে যেমন শহরের চিরচেনা যানজট চিরতরে দূর হবে, অন্যদিকে শহরের চেহারাই মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যাবে।
যেকোনো শহরের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে তার প্রধান মোড় বা চত্বরগুলোর মধ্য দিয়ে। মানুষ যখন একটি শহরে প্রবেশ করে বা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যায়, তখন শহরের মোড়গুলোর স্থাপত্যশৈলী তার মনে প্রথম ছাপ ফেলে। সাতক্ষীরা শহরে এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড় রয়েছে, যেগুলোকে খুব সহজেই দৃষ্টিনন্দন করে তোলা সম্ভব।
শহরের খুলনা রোড মোড়, নিউ মার্কেট মোড়, পাকাপোল মোড়, আমতলা মোড়, মেডিকেল কলেজের সামনে বাইপাসে প্রবেশের মুখ, লাবসা জিরো পয়েন্ট এবং বিনেরপোতা বাইপাসে প্রবেশের মুখে পরিকল্পিত ও দর্শনীয় সড়ক দ্বীপ তৈরি করা সময়ের দাবি। এই সড়ক দ্বীপ গুলোতে এমন কিছু নান্দনিক ভাস্কর্য বা স্থাপনা তৈরি করা দরকার, যা সাতক্ষীরার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরবে। কোথাও সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা হরিণের প্রতিকৃতি, কোথাও চিংড়ি বা ম্যানগ্রোভ বনের আবহ, আবার কোথাও জেলার সংগ্রামী ইতিহাসের স্মারক থাকলে বাইরে থেকে আসা যেকোনো মানুষ শহরের প্রবেশ মুখেই সাতক্ষীরার সমৃদ্ধ পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারবে।
সম্প্রতি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে শহরে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণ করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্মৃতিস্তম্ভ বসানো হয়েছে জেলা পরিষদের একটি পরিত্যক্ত জায়গায়। যা শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে এবং শহরের সৌন্দর্য বাড়াতে হলে জুলাই শহীদ স্মৃতিসৌধটি জেলা পরিষদের ওই পরিত্যক্ত জায়গা থেকে স্থানান্তর করে শহরের কোনো একটি প্রধান সড়ক দ্বীপে স্থাপন করা উচিত। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হতে পারে শহরের আমতলা মোড়। আমতলা মোড়ের চারপাশের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জায়গাটি প্রশস্ত করে সেখানে যদি একটি সুন্দর সড়ক দ্বীপ তৈরি করা হয় এবং তার ঠিক মাঝখানে জুলাই শহীদ স্মৃতিসৌধটি স্থাপন করা হয়, তবে তা হবে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একই সাথে জেলা পরিষদের ওই মূল্যবান জায়গাটি খালি হলে জেলা পরিষদ সেখানে একটি আধুনিক ও আকর্ষণীয় ডাকবাংলো তৈরি করতে পারবে, যা শহরের আবাসন ও দাপ্তরিক মর্যাদা বাড়াবে।
দিনের বেলা একটি শহর যেমনই হোক, রাতের আলোয় তাকে মায়াবী করে তোলা যায়। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় আলোকসজ্জা কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি শহরের সৌন্দর্যেরও বড় অংশ। বর্তমানে সাতক্ষীরা শহরের খুলনা রোড মোড়, নিউ মার্কেট মোড়, পাকাপোল মোড় এবং সংগীতা মোড়ে উঁচু পোলে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কিছু বাতি লাগানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুরো শহরের তুলনায় এই চারটি মোড়ের বাতি মোটেই পর্যাপ্ত নয়। তা ছাড়া এই বাতিগুলো কেবল ওপর থেকে সাদা আলো ফেলে; এগুলো মোটেও আধুনিক বা সৌন্দর্যমন্ডিত নয়।
সাতক্ষীরা শহরকে রাতে সত্যিকার অর্থেই সুন্দর দেখাতে হলে প্রধান সড়কগুলোর রোড ডিভাইডারে এবং রাস্তার দুই পাশে আধুনিক ডিজাইনের ও রঙিন সড়ক বাতি বসাতে হবে, যা রাতের শহরকে এক বর্ণিল রূপ দেবে। শুধু প্রধান কয়েকটি মোড়েই নয়, সমগ্র সাতক্ষীরা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের প্রতিটি প্রধান সড়ক, অলিগলি এবং আবাসিক এলাকার রাস্তাগুলোতে পর্যাপ্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক সড়ক বাতি লাগানো উচিত। আজও শহরের বহু আবাসিক এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসে, যা চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বাড়িয়ে দেয়। পুরো পৌর এলাকা সমানভাবে আলোকিত হলে নাগরিক নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি রাতের সাতক্ষীরা হয়ে উঠবে ঝলমলে এক আধুনিক জনপদ।
(চলবে)
লেখক: আল মুতাসিম বিল্লাহ সুমন, রাজারবাগান, সাতক্ষীরা।









