সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সকাল গড়িয়ে দুপুর। ডেস্ক থেকে বারবার তাগাদা আসছেÑ“খবরটা কখন পাঠাচ্ছেন?” ঘটনাস্থল থেকে ছবি এসেছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনও বাকি। সেটি হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। ধরা যাক, একটি বেইলি সেতু ভেঙে পড়েছে। এটি নিছক একটি অবকাঠামোগত দুর্ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের চলাচল, জননিরাপত্তা, সরকারি দায়বদ্ধতা এবং উন্নয়ন কর্মকা-ের মান নিয়ে প্রশ্ন। ফলে একটি দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের জন্য সড়ক, সেতু কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য অপরিহার্য। ফোন করা হলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে। একবার, দুইবার, তিনবার, চারবার। কোনো সাড়া নেই। এরপর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন করা হলো। সেখানেও একই অবস্থা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের আরেক কর্মকর্তার নম্বরে কল গেল। তাতেও কোনো উত্তর নেই। এ দৃশ্য বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কাছে নতুন নয়। বরং এটি এক ধরনের নিত্যদিনের বাস্তবতা। একটি বক্তব্যের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, অসংখ্য ফোনকল, বার্তা পাঠানো, পরিচিতজনের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টাÑএসব যেন সংবাদ সংগ্রহের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করেন, কোনো ঘটনা ঘটেছে, তার ছবি তুলে বা দু-একজনের বক্তব্য নিয়ে সংবাদ লেখা যায়। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। পেশাদার সাংবাদিকতার মূল ভিত্তিই হলো ভারসাম্য ও বস্তুনিষ্ঠতা। একটি ঘটনার অভিযোগ, সমালোচনা বা ক্ষোভ তুলে ধরার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও প্রকাশ করতে হয়। ধরা যাক, একটি সেতু ভেঙে পড়েছে।
স্থানীয় মানুষ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কেউ বলছেন, সংস্কারের অভাব ছিল। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা কী? সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী কী বলছেন? কোনো সংস্কার পরিকল্পনা ছিল কি না? দুর্ঘটনার কারণ কী? বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সংবাদ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।ফলে একজন সাংবাদিক যতক্ষণ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পান, ততক্ষণ তাঁর কাজও পুরোপুরি শেষ হয় না। সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নিঃসন্দেহে অনেক। তাঁরা সভা, পরিদর্শন, প্রশাসনিক কাজ কিংবা বিভিন্ন জরুরি বিষয়ে ব্যস্ত থাকেন। সব সময় ফোন ধরা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন কর্মকর্তা যদি একাধিকবার ফোনকল পাওয়ার পরও কোনো প্রতিক্রিয়া না দেন, পরেকলব্যাক না করেন কিংবা একটি খুদে বার্তারও উত্তর না দেন, তাহলে সেটিকে কি শুধু ব্যস্ততা বলা যায়? প্রযুক্তির এই যুগে যোগাযোগের অসংখ্য মাধ্যম রয়েছে।
সরাসরি ফোন না ধরতে পারলেও পরে ফোন করা যায়, বার্তার উত্তর দেওয়া যায় কিংবা দপ্তরের অন্য কাউকে তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাংবাদিকদের ফোনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এমন প্রবণতা শুধু সাংবাদিকদের জন্য নয়, সামগ্রিকভাবে জনসেবার ধারণার জন্যও উদ্বেগজনক।একজন সাংবাদিক যখন কোনো কর্মকর্তাকে ফোন করেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত কৌতূহল মেটানোর জন্য ফোন করেন না। তিনি জনগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করেন। তাঁর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ জানতে চায়, কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে এবং এর সমাধান কী। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জবাবদিহি একটি মৌলিক মূল্যবোধ। সরকারি কর্মকর্তা জনগণের করের টাকায় বেতন পান এবং জনগণের সেবা দেওয়ার জন্যই নিয়োজিত থাকেন। ফলে তাঁদের কর্মকা- সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর দেওয়াও দায়িত্বের অংশ।
ঢাকা কিংবা বড় শহরের সাংবাদিকদের তুলনায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করতে হয়। নিজস্ব যানবাহন নেই, প্রযুক্তিগত সুবিধা সীমিত, আবার সংবাদ সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তথ্য সংগ্রহের পর যখন একটি বক্তব্যের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, তখন তা শুধু সময়ের অপচয় নয়; পেশাগত হতাশারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ পাঠক যখন সংবাদ পড়েন, তখন তিনি জানেন না এর পেছনে কত শ্রম, কত ফোনকল কিংবা কত প্রত্যাখ্যানের গল্প লুকিয়ে আছে।বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা এবং প্রশাসনিক আধুনিকায়নের অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইট রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি রয়েছে, ডিজিটাল যোগাযোগের নানা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি যোগাযোগের সংস্কৃতিরও উন্নয়ন জরুরি।একজন কর্মকর্তা যদি সাংবাদিকের ফোন ধরতে অনীহা দেখান, তাহলে সেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি জনগণের কাছে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ।
বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন রয়েছে। আইন অনুযায়ী জনগণ তথ্য জানার অধিকার রাখে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, তথ্য পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়Ñসরাসরি ফোনে কথা বলাÑসেটিই সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। তথ্য অধিকার কেবল আইনের বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এর বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।একজন সাংবাদিক যদি দিনের পর দিন তথ্য পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের অবস্থাটা কী হতে পারে, সেটিও ভাবার বিষয়। এ কথাও সত্য যে সব সরকারি কর্মকর্তা সাংবাদিক বিমুখ নন। অনেক কর্মকর্তা আছেন, যারা দ্রুত ফোন ধরেন, তথ্য দেন, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং সংবাদ প্রকাশে সহযোগিতা করেন।
তাঁদের কারণে গণমাধ্যম ও প্রশাসনের মধ্যে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এমন কর্মকর্তারাই প্রমাণ করেন যে সাংবাদিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা মানেই কোনো পক্ষপাতিত্ব নয়; বরং এটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিচয়। সাংবাদিক বান্ধব প্রশাসন মানে সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক মনোভাব রাখা। যখন কোনো কর্মকর্তা দ্রুত তথ্য দেন, তখন গুজব কমে, বিভ্রান্তি দূর হয় এবং সঠিক তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
অন্যদিকে তথ্য না দিলে বা যোগাযোগ এড়িয়ে গেলে নানা ধরনের অনুমান, গুজব ও ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়। এতে প্রশাসন এবং জনগণÑউভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হয়তো একজন কর্মকর্তার কাছে একটি ফোনকল খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু একজন সাংবাদিকের কাছে সেটিই হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের শেষ অংশ। একটি কল রিসিভ করা, কয়েক মিনিট সময় দেওয়া কিংবা পরে কলব্যাক করাÑএই ছোট ছোট কাজগুলোই গণমাধ্যম ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে।
প্রথমত, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ বিষয়ে আরও সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, জরুরি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রতিটি সরকারি দপ্তরে নির্দিষ্ট মুখপাত্র বা তথ্য কর্মকর্তা সক্রিয় রাখা দরকার, যাতে সাংবাদিকরা দ্রুত তথ্য পেতে পারেন। চতুর্থত, কর্মকর্তাদের মধ্যে এই উপলব্ধি তৈরি করতে হবে যে সাংবাদিকের ফোন কোনো ব্যক্তিগত অনুরোধ নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার বাস্তবায়নের একটি অংশ। ভেঙে পড়া বেইলি সেতুর খবর হয়তো একদিনের সংবাদ। কাল অন্য কোনো ঘটনা শিরোনাম হবে। কিন্তু একটি বক্তব্যের জন্য সাংবাদিকের বারবার ফোন করা, আর ফোনের ওপাশে দীর্ঘ নীরবতাÑএই অভিজ্ঞতা প্রতিদিনের।
সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত একটি ছোট খবরের পেছনে কত মানুষের শ্রম, কত প্রতিকূলতা এবং কত অদৃশ্য সংগ্রাম থাকে, তা পাঠকের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু সেই সংগ্রামের অন্যতম বড় অংশ হলো তথ্যের জন্য অপেক্ষা। গণমাধ্যম ও প্রশাসন পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। উভয়ের লক্ষ্যই জনগণের সেবা করা। তাই একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রশাসনকে আরও উন্মুক্ত হতে হবে, আর সাংবাদিকদের প্রশ্নকে দেখতে হবে জনগণের প্রশ্ন হিসেবের্।ফোনের ওপাশের সেই নীরবতা ভাঙার সময় এখনই। কারণ তথ্যপ্রবাহের পথ যত সহজ হবে, গণতন্ত্রও তত শক্তিশালী হবে।
লেখক: সংবাদকর্মী