বাংলায় পরীক্ষা প্রথা এলো কীভাবে?/ আখলাকুর রহমান
আখলাকুর রহমান
আজকালকার তরুণ সমাজ যখন রাজপথে কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ‘পরীক্ষা পিছিয়ে দাও’ বলে শোরগোল তোলে, তখন আমার মনে ক্ষোভ নয়, এক গভীর বিষাদের জন্ম হয়। এই পোলাপানেরা যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আজ আর্তনাদ করছে, তারা নিজেরাও জানে না এই মারণাস্ত্রের শিকড় কত গভীরে প্রোথিত। পরীক্ষা কোনো আকস্মিক আসমানি গজব নয়; এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, ঠান্ডা মাথার মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব তৈরির কারখানা। অথচ আমরা চোখ বন্ধ করে বছরের পর বছর ধরে আমাদের সন্তানদের এই যূপকাষ্ঠে বলি দিয়ে আসছি।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে প্রথম শিকল পরানোর এই কায়দাটি আবিষ্কার করেছিল চার হাজার বছর আগের চৈনিক সামন্ত শাসকেরা। ‘কোজু’ নামের সেই রাজকীয় পরীক্ষা পদ্ধতি আসলে ছিল মানুষকে মগজহীন হুকুমবরদারে পরিণত করার প্রথম রাষ্ট্রীয় প্রজেক্ট। এক অন্ধকার কুঠুরির ভেতর দিনের পর দিন মানুষকে আটকে রেখে প্রাচীন পুঁথি মুখস্থ করানো হতো। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—এমন একদল অনুগত দাস তৈরি করা, যারা প্রশ্ন করতে শিখবে না, কেবল শাসকের আদেশ তামিল করবে। সামন্তবাদের সেই নোংরা ভূতটাই কালক্রমে আধুনিকতার মুখোশ পরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
আমাদের এই বাংলায়, এই ভূখ-ে পরীক্ষা নামক এই মনস্তাত্ত্বিক জাঁতাকলটি আমদানি করেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা। লর্ড ম্যাকলে যখন এই উপমহাদেশে ইংরেজি শিক্ষার নীল নকশা তৈরি করলেন, তাঁর উদ্দেশ্য আমাদের শিক্ষিত করা ছিল না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন একদল ‘বাদামি সাহেব’ তৈরি করা, যারা রক্তে-মাংসাবে বাঙালি হলেও মগজে ও মনস্তত্ত্বে হবে খাঁটি ইংরেজ। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের ঠিক ক্রান্তিলগ্নে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলো, তখন থেকেই মূলত এই অঞ্চলের মানুষের ঘাড়ে পরীক্ষার জোয়াল চিরতরে চাপিয়ে দেওয়া হলো। সাম্রাজ্যবাদীরা খুব ভালো করেই জানত, তরুণের স্বাধীন চিন্তা আর বিদ্রোহের আগুনকে যদি নিভিয়ে দিতে হয়, তবে তাকে পরীক্ষার হল নামক এক একটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ঢুকিয়ে দিতে হবে।
আজ আমরা স্বাধীন দেশে বাস করছি বলে বড়াই করি, কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতি এখনো সেই ঔপনিবেশিক দাসত্বের লিগ্যাসি বয়ে বেড়াচ্ছে। পরীক্ষা কখনো মেধার বিকাশ ঘটায় না, বরং তা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতাকে গলা টিপে হত্যা করে। একটি তিন ঘণ্টার খাতার পৃষ্ঠায় কয়েকটি মুখস্থ করা বুলি উগড়ে দিয়ে যে নম্বর পাওয়া যায়, তা দিয়ে কেরানি তৈরি করা যায়, কিন্তু কোনো স্বাধীনচেতা চিন্তাবিদ বা মানুষ তৈরি করা যায় না। পোলাপানেরা যখন আজ পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য হাহাকার করে, আমি তার ভেতর এক অবচেতন বিদ্রোহের সুর শুনতে পাই। এই জীর্ণ, অচল আর প্রাণহীন শিক্ষাকাঠামো ভেঙে ফেলার এখনই সময়, অন্যথায় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবলই সার্টিফিকেটধারী পঙ্গু মগজের এক একটা জীবন্ত লাশ হিসেবে বেঁচে থাকবে।
লেখক: উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা: আসিফা






