শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩

শার্শায় জাল সনদে চাকরি, এক শিক্ষক কারাগারে, তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৪ অপরাহ্ণ
শার্শায় জাল সনদে চাকরি, এক শিক্ষক কারাগারে, তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

বাগআঁচড়া (শার্শা) প্রতিনিধি: যশোরের শার্শায় জাল সনদে চাকরি করা মামলায় আত্মসমর্পণকারী সহকারী শিক্ষক ইদ্রিস আলীকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। একই সাথে মামলার অপর দুই সহকারী শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যানসহ মোট তিনজন আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত (৯ জুলাই) বৃহস্পতিবার যশোরের অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আছাদুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাদীর আইনজীবী রুহিন বালুজ।

আসামিরা হলেন, সহকারী শিক্ষক ইদ্রিস আলী, তিনি ঝিকরগাছা উপজেলার পাঁচপোতা গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে। সহকারী শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ, সহকারী শিক্ষিকা (কৃষি) সালেহা খাতুন, এবং কায়বা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান ফিরোজ আহম্মেদ টিংকু।

মামলা সূত্রে জানা যায়, যশোরের শার্শা উপজেলার ৭নং কায়বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসান ফিরোজ আহম্মেদ টিংকু চালতাবাড়িয়া আর ডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি থাকাকালীন তার সহযোগিতায় সহকারী শিক্ষক পদে তিনজন চাকরি করার সুযোগ করে দেন।

তৎকালীন কায়বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস চেয়ারম্যান থাকাকালীন স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে জাল সনদে তিনজন সহকারী শিক্ষক চাকরি করছেন বলে অভিযোগ পান। পরে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও কায়বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসান ফিরোজ আহমেদ টিংকুসহ ১০/১৫ জন অজ্ঞতনামা ব্যক্তি রুহুল কুদ্দুসের বাড়িতে গিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করতে খুন জখমের হুমকি ধামকি দেন বলে বাদী মামলার অভিযোগে উল্লেখ করেন।

গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের পর সাবেক চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস বাদী হয়ে যশোর আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা তদন্ত শেষে সিআইডি পুলিশ যশোরের এসআই বখতিয়ার রহমান ওই তিন শিক্ষকের সনদপত্র জাল ও সাবেক চেয়ারম্যানের সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়ায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনের উপর শুনানি শেষে বিচারক আসামিদের প্রতি সমন জারির আদেশ দিয়েছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার মামলার ধার্য দিনে ইদ্রিস আলী আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন। বিচারক জামিন আবেদনের শুনানি শেষে নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় অন্য তিন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

 

 

Ads small one

জনসংখ্যাকে নতুন চোখে দেখার সময় এসেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:১৫ অপরাহ্ণ
জনসংখ্যাকে নতুন চোখে দেখার সময় এসেছে

আখলাকুর রহমান

সাতক্ষীরার একটি শিশু জন্মায় ঠিক ততটাই সম্ভাবনা নিয়ে, যতটা নিয়ে জন্মায় ঢাকা কিংবা টোকিওর কোনো শিশু। তফাৎ শুধু সুযোগে।

আজ ১১ জুলাই, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। প্রতি বছর এই দিনে আমরা একটি সংখ্যার দিকে তাকাই, পৃথিবীতে মানুষ কত বাড়ল, বাংলাদেশে কত বাড়ল, সাতক্ষীরায় কত বাড়ল। খবরের কাগজে ছাপা হয় গ্রাফ আর পরিসংখ্যান, সেমিনারে পঠিত হয় প্রবন্ধ, তারপর দিনটি চলে যায় আরেকটি সাধারণ দিনের মতো। কিন্তু সত্যি বলতে, জনসংখ্যা কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা হলো আমরা সেই জনসংখ্যাকে কতটা সম্পদে রূপান্তর করতে পারছি, তার হিসাব না রাখা।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে একটি ভয় গেঁথে আছে যে মানুষ বাড়লেই নাকি সংকট বাড়ে। খাদ্য কমে যাবে, জমি কমে যাবে, বেকারত্ব বাড়বে, রাস্তায় মানুষের ভিড়ে শ্বাস নেওয়াই দায় হয়ে যাবে। এই ধারণা এসেছে এক শতাব্দী আগের চিন্তা থেকে, যখন প্রযুক্তি বা উৎপাদনশীলতার আজকের অগ্রগতি কারো কল্পনাতেও ছিল না। অথচ বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর যে দেশগুলো আজ সবচেয়ে সমৃদ্ধ, তাদের অনেকেই একসময় ঘন জনবসতিপূর্ণ ছিল। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ প্রমাণ করেছে, ঘনবসতি কোনো অভিশাপ নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সেটাই হয়ে ওঠে অগ্রগতির চালিকাশক্তি। তাই বলা যায়, জনসংখ্যা সমস্যা নয়, বরং অব্যবস্থাপনা আর সুযোগের অভাবই আসল সংকট।

সাতক্ষীরার দিকে তাকালে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। উপকূলীয় এই জেলা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোর একটি। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়ের পুনরাবৃত্তি এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার নিত্যসঙ্গী। এমন এক পরিবেশে প্রতি বছর অসংখ্য তরুণ তরুণী কর্মক্ষম বয়সে পা রাখছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাদের জন্য দক্ষতা তৈরির সুযোগ, শিক্ষা আর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছি? নাকি শুধু সংখ্যা গোনায় ব্যস্ত থেকে প্রকৃত সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলছি? একজন তরুণ যদি সঠিক প্রশিক্ষণ না পায়, তাহলে সেই একই তরুণ যে দেশের সম্পদ হতে পারত, সে হয়ে ওঠে বেকারত্বের পরিসংখ্যানের আরেকটি সংখ্যা মাত্র।

জনসংখ্যা দিবসের প্রকৃত বার্তা আসলে দুটি জায়গায়। একটি হলো নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার, অন্যটি পরিবার পরিকল্পনায় সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। এটি কোনো জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের কথা বলে না; বরং প্রতিটি মানুষকে তার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলে। সাতক্ষীরার মতো জেলায়, যেখানে বাল্যবিবাহের হার এখনো উদ্বেগজনক, সেখানে এই বার্তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি মেয়ে যখন আঠারো বছর বয়সের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়, তখন তার শিক্ষা থমকে যায়, স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে, আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও একই দারিদ্র্যের চক্র তৈরি হয়। একজন কিশোরী মেয়ে যখন শিক্ষা শেষ করে, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবার সুযোগ পায়, তখনই প্রকৃত অর্থে জনসংখ্যা ‘নিয়ন্ত্রণ’ হয়, জোর করে নয়, সচেতনতা দিয়ে।

আমাদের চিন্তার ধরন বদলাতে হবে। জনসংখ্যাকে বোঝা না ভেবে বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। একটি তরুণ জনগোষ্ঠী সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে। সাতক্ষীরার মৎস্য চাষ, কৃষি আর ক্ষুদ্র ব্যবসায় যদি আধুনিক প্রযুক্তি আর দক্ষতা যুক্ত করা যায়, তাহলে এই জনসংখ্যাই হয়ে উঠতে পারে জেলার সবচেয়ে বড় শক্তি। চিংড়ি চাষের সঙ্গে যুক্ত হাজারো পরিবার, ছোট ছোট কুটির শিল্প, হস্তশিল্প কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক ফ্রিল্যান্স কাজ, সবকিছুতেই দরকার একটু সঠিক দিকনির্দেশনা আর বিনিয়োগ। তরুণদের হাতে দক্ষতা থাকলে তারা শুধু নিজেদের নয়, পুরো পরিবার আর সমাজের ভাগ্যও বদলে দিতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এই দিনটিকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, স্কুলগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো, আর বাল্যবিবাহ রোধে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা, এসবই এখন সময়ের দাবি। শুধু সরকারি উদ্যোগেই এই কাজ সম্ভব নয়, স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সচেতনতা তৈরি হয় প্রতিদিনের কথোপকথনে, একটি বক্তৃতায় নয়।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাতক্ষীরার মতো জেলার স্থানীয় পত্রিকাগুলো যদি প্রতিনিয়ত এই বিষয়গুলো নিয়ে লেখালেখি করে, গল্প বলে, বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরে, তাহলে মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে ধীরে হলেও স্থায়ীভাবে। একটি সফল উদ্যোক্তার গল্প, একটি মেয়ের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার গল্প, এসব গল্পই পারে মানুষের চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এখানেই দাঁড়ায়, আমরা কি জনসংখ্যাকে ভয় পাব, নাকি তাকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের পথ খুঁজব? সাতক্ষীরার প্রতিটি নবজাতক একটি নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে, একটি নতুন গল্পের শুরু নিয়ে আসে। আমাদের দায়িত্ব সেই সম্ভাবনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, সংখ্যা কমানো নয়, সক্ষমতা বাড়ানো। এই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে আসুন, আমরা ভয়ের চশমা খুলে সম্ভাবনার চশমা পরি, আর প্রতিজ্ঞা করি, প্রতিটি মানুষকে শুধু সংখ্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখব।

লেখক : উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা

 

 

 

মুক্তমত: জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হচ্ছে সাতক্ষীরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৭ অপরাহ্ণ
মুক্তমত: জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হচ্ছে সাতক্ষীরা

গাজী হাবিব

শেষ আষাঢ়ে বৃষ্টিপাত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে শুরু। কখনও মুষলধারে, কখনও টিপটিপ, আবার কখনও ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে টানা প্রায় দেড় দিনের বেশি সময় ভিজেছে সাতক্ষীরা। প্রকৃতির এই বর্ষণ নতুন কিছু নয়। বর্ষাকালে বৃষ্টি হবেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো- প্রতিবার বৃষ্টির পর কেন সাতক্ষীরা শহর যেন ছোট ছোট জলাশয়ে পরিণত হয়? কেন সরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক এমনকি মানুষের বসতবাড়িও পানির নিচে চলে যায়?

শুক্রবার বেলা ১১টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সাতক্ষীরায় ২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে স্থানীয় আবহাওয়া অফিস। এটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি। কিন্তু শুধুমাত্র বৃষ্টিপাতকে দায়ী করলে বাস্তবতার বড় অংশ আড়াল করা হবে। কারণ প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে- পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ মাঠ, সদর হাসপাতাল চত্বর, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা পানিতে ডুবে গেছে। সরকারি কলেজ-মাছখোলা সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগী ও সাধারণ মানুষের চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। বহু বাড়ির উঠান, টয়লেট ও নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও রান্নাঘর পর্যন্ত পানিতে ডুবে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নি¤œ আয়ের মানুষ। বৃষ্টির কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ফলে শ্রমজীবী মানুষের আয় প্রায় বন্ধ। অনেকেই বলছেন, “আজ কাজ নেই, আয় নেই; সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

অন্যদিকে কৃষকদের অবস্থাও সুখকর নয়। নি¤œাঞ্চলের ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেতেই সবজি ও আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।

শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তিই নয়, জনস্বাস্থ্যও এখন বড় ঝুঁকির মুখে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল চত্বরে পানি জমে থাকায় রোগীদের যাতায়াত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। নোংরা পানি জমে থাকায় ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে রসুলপুর, কাটিয়া, সুলতানপুর, ইটাগাছা, গদাইবিল, রাজারবাগান, ডাইয়ের বিল, কামালনগর, মাছখোলা এবং শহরের আরও কয়েকটি নি¤œাঞ্চল। এসব এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। স্থানীয়দের ভাষায়, বর্ষা এলেই মনে হয় আমরা শহরে নয়, জলাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করছি।
প্রশ্ন উঠছে- প্রতিবছর একই চিত্র কেন?

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পৌর এলাকার ভেতরে ও আশপাশে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত মাছের ঘের, সংকুচিত ও দখল হয়ে যাওয়া খাল, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করার কারণেই পানি নামতে পারছে না। বছরের পর বছর ধরে খাল-নালা ভরাট হয়েছে, কোথাও অবৈধ স্থাপনা হয়েছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনায় পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই পুরো শহর অচল হয়ে পড়ে।

বাস্তবতা হলো, সাতক্ষীরা একটি নি¤œভূমির জেলা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখানকার বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলাচ্ছে। স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। তাই পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অথচ শহর সম্প্রসারণ হয়েছে, নতুন নতুন ভবন তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে ড্রেন, খাল কিংবা পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং পৌরবাসীদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজের মান, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণে নানা ধরনের অনিয়ম রয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি প্রতিবছর একই দুর্ভোগে মানুষকে পড়তে হয়, তাহলে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

সাতক্ষীরা আবহাওয়া কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানিয়েছেন, শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েকদিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

অন্যদিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্নব দত্ত জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি শহরের স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হবে এবং বিভিন্ন ড্রেন সচল করে প্রাণসায়ের খালের সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

এই উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে প্রশ্ন হলো- এগুলো কি কেবল সাময়িক সমাধান, নাকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ? কারণ নাগরিকরা প্রতি বর্ষায় একই আশ্বাস শুনতে শুনতে ক্লান্ত।

জলাবদ্ধতা এখন সাতক্ষীরায় পৌর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার একটি পরীক্ষাও বটে। প্রয়োজন একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান। শহরের সব খাল উদ্ধার, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণকে পরিকল্পনার আওতায় আনা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে দায় এড়ানো সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকৃতি তার নিয়মেই চলছে; আমাদের নগর ব্যবস্থাপনাই সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সাতক্ষীরার মানুষ আর আশ্বাস নয়, টেকসই সমাধান চায়। তারা এমন একটি পরিচ্ছন্ন শহর চায়, যেখানে বর্ষা আনন্দের বার্তা বয়ে আনবে- দুর্ভোগের নয়। লেখক: সাংবাদিক, সমাজকর্মী

 

প্রাইভেট ও কোচিংয়ের চাপে শিক্ষার্থী: আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৩ অপরাহ্ণ
প্রাইভেট ও কোচিংয়ের চাপে শিক্ষার্থী: আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

শিক্ষা মানুষের চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়। শিক্ষা মানুষকে শুধু জীবিকা অর্জনের পথ দেখায় না, তাকে বিবেকবান, যুক্তিবাদী ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসেÑআমরা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে তুলছি, নাকি কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করছি?প্রশ্নটি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর গুরুত্ব বেড়েছে।

 

কারণ বিদ্যালয়ের পাঠের পাশাপাশি প্রাইভেট পড়া ও কোচিং এখন অনেক শিক্ষার্থীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবারের কাছে এটি যেন বাধ্যতামূলক। সন্তানকে ভালো ফল করতে হলে কোচিংয়ে পাঠাতেই হবেÑএমন একটি সামাজিক ধারণা তৈরি হয়েছে। ফলে একটি শিশুর দিন শুরু হচ্ছে পড়াশোনার চাপ দিয়ে, শেষও হচ্ছে পড়ার টেবিলে। একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় হলো শৈশব ও কৈশোর।

 

এই সময় তার মধ্যে তৈরি হয় কৌতূহল, সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি ও সামাজিক মূল্যবোধ। কিন্তু যখন তার জীবনের বড় অংশ চলে যায় পরীক্ষা, কোচিং, নোট ও নম্বরের পেছনে, তখন তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।শিক্ষা যদি আনন্দের বদলে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি সংকট হলোÑশিক্ষার উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

 

একসময় শিক্ষা মানে ছিল জ্ঞান অর্জন, নতুন কিছু জানার আগ্রহ এবং সমাজকে বোঝার ক্ষমতা তৈরি করা। এখন অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষা মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া, ভালো জিপিএ অর্জন করা এবং একটি ভালো চাকরির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা।একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করলেই কি সে সৃজনশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক হয়ে উঠছে? সে কি যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারছে? সে কি নতুন সমস্যার সমাধান করতে পারছে? সে কি সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিখছে?

 

এসব প্রশ্নের উত্তরই বলে দেয়, শিক্ষার প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু পরীক্ষার খাতায় সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে শিক্ষার্থীকে বারবার বোঝানো হয়Ñতোমাকে প্রথম হতে হবে, তোমাকে বেশি নম্বর পেতে হবে, তোমাকে অন্যদের পেছনে ফেলতে হবে। এই প্রতিযোগিতার মানসিকতা অনেক শিশুর স্বাভাবিক আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে।প্রাইভেট পড়া বা কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা একেবারে অস্বীকার করা যাবে না।

 

একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে দুর্বল হলে অতিরিক্ত সহায়তা তার জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ কোনো পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও বাড়তি অনুশীলন প্রয়োজন হতে পারে।কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কোচিং শিক্ষার সহায়ক না হয়ে শিক্ষার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।আজ অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করার পর আবার কোচিংয়ে যায়। ছুটির দিনেও চলে পরীক্ষা ও প্রস্তুতি।

 

ফলে তাদের বিশ্রাম, খেলাধুলা কিংবা নিজের পছন্দের কাজের জন্য সময় থাকে না।একটি শিশুর কাছে যদি সব সময় মনে হয়Ñআমাকে পড়তেই হবে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেই হবে, অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবেÑতাহলে তার মানসিক চাপ বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।আরেকটি বিষয় হলো, কোচিং সংস্কৃতি শিক্ষার ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈষম্যও তৈরি করছে। যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সক্ষম, তারা সন্তানকে একাধিক কোচিং ও ব্যক্তিগত শিক্ষক দিতে পারে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

 

ফলে শিক্ষা সবার জন্য সমান সুযোগের ক্ষেত্র না হয়ে অনেক সময় অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শিক্ষার চাপ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হওয়া দরকার শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। কারণ একটি শিশুর মানসিক বিকাশকে উপেক্ষা করে কোনো শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ভয়, উদ্বেগ ও হতাশায় ভোগে। বাবা-মায়ের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ভয়, বন্ধুদের সঙ্গে তুলনা এবং নিজের প্রতি অতিরিক্ত চাপÑএসব তাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে তাকে প্রশংসা করা হয়। কিন্তু যে শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল করতে পারে না, তার দিকে অনেক সময় ব্যর্থতার চোখে তাকানো হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি। একজন শিশু হয়তো গণিতে খুব ভালো নয়, কিন্তু সে হয়তো অসাধারণ সৃজনশীল, ভালো লেখক, দক্ষ সংগঠক কিংবা মানবিক গুণসম্পন্ন একজন মানুষ হতে পারে।

 

শিক্ষা ব্যবস্থার কাজ হলো সেই সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করা, চাপ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা নয়। অভিভাবকের প্রত্যাশা: ভালোবাসা যখন চাপে পরিণত হয়সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যেক অভিভাবকেরই স্বপ্ন থাকে। বাবা-মা চান, সন্তান জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক, ভালো মানুষ হোক, সম্মানের সঙ্গে বাঁচুক। এই প্রত্যাশা স্বাভাবিক এবং ইতিবাচক। কিন্তু অনেক সময় সেই প্রত্যাশাই যখন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়, তখন তা সন্তানের জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।বর্তমান সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলোÑভালো ফল মানেই ভালো ভবিষ্যৎ।

 

এই ধারণার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানের পছন্দ, আগ্রহ ও সক্ষমতার চেয়ে পরীক্ষার ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেন। সন্তান কত ঘণ্টা পড়ছে, কয়টি কোচিং করছে, কত নম্বর পাচ্ছেÑএসব হিসাবই যেন হয়ে ওঠে সফলতার মাপকাঠি।কিন্তু একটি শিশুর মন কোনো যন্ত্র নয়। তাকে নির্দিষ্ট সময় ধরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাপ দিলেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবেÑএমন ধারণা ভুল। প্রত্যেক শিশুর শেখার ধরন আলাদা, আগ্রহ আলাদা, প্রতিভা আলাদা। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নিয়ে শেখে। কেউ বইয়ের মাধ্যমে ভালো শেখে, কেউ বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।

 

অভিভাবকদের বুঝতে হবে, সন্তানের পাশে থাকা আর সন্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। ভালোবাসার অর্থ শুধু ভালো ফলের প্রত্যাশা নয়; তার ভয়, দুর্বলতা, আগ্রহ ও স্বপ্নকে বোঝাও ভালোবাসার অংশ। প্রাইভেট ও কোচিংয়ের প্রসার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিদ্যালয়ের ভূমিকার কথাও বলতে হবে। কারণ বিদ্যালয়ই শিক্ষার প্রধান প্রতিষ্ঠান। শ্রেণিকক্ষেই একজন শিক্ষার্থীর শেখার ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা।কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক শিক্ষার্থী মনে করে বিদ্যালয়ের পড়া পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই তারা বাধ্য হয়ে কোচিং বা প্রাইভেটের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

 

এই প্রবণতা শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়ায় না, বরং বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও প্রকাশ করে।একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় শেষ করবেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার আগ্রহ তৈরি করবেন। একটি কঠিন বিষয়কে সহজ করে বোঝাবেন, প্রশ্ন করার সাহস দেবেন, চিন্তা করতে শেখাবেন।কিন্তু যদি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক শুধু পাঠদান ও পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শিক্ষার মানবিক দিকটি হারিয়ে যায়।শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না।

 

একজন শিক্ষক একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারেন, আবার অসচেতন আচরণে তার আত্মবিশ্বাস নষ্টও করতে পারেন।আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো মুখস্থনির্ভরতা। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য অনেক শিক্ষার্থী উত্তর মুখস্থ করে, কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পায় না।ফলে পরীক্ষার হলে ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকেই সমস্যায় পড়ে। প্রকৃত শিক্ষা হলোÑযেখানে একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, বিশ্লেষণ করতে শেখে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে।

 

একটি বিষয় কেন ঘটছে, কীভাবে কাজ করছে, এর প্রভাব কীÑএসব বিষয়ে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। শুধু তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা ভবিষ্যতের পৃথিবীতে যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি ও পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রয়োজন সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং নতুন কিছু শেখার মানসিকতা। কিন্তু অতিরিক্ত কোচিং ও পরীক্ষামুখী প্রস্তুতি অনেক সময় শিক্ষার্থীদের এই সৃজনশীল ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তারা নতুন কিছু ভাবার পরিবর্তে পরীক্ষায় কীভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যায়, সেই কৌশলেই বেশি মনোযোগী হয়।

 

একটি শিশুর শৈশব শুধু পড়াশোনার জন্য নয়। তার প্রয়োজন মাঠে খেলা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রকৃতিকে দেখা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশ নেওয়া এবং নিজের মতো করে বেড়ে ওঠা।কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক শিশুর জীবন যেন একটি নির্দিষ্ট রুটিনে বন্দীÑবিদ্যালয়, কোচিং, বাড়ির কাজ, পরীক্ষা এবং আবার প্রস্তুতি।এই ব্যস্ততার মধ্যে শিশুরা হয়তো অনেক তথ্য শিখছে, কিন্তু জীবন শেখার সুযোগ কতটা পাচ্ছেÑসেটিই বড় প্রশ্ন। খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক অভিজ্ঞতা একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

এগুলো বাদ দিয়ে শুধু বইয়ের জ্ঞান দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রাইভেট ও কোচিংয়ের আরেকটি দিক হলো বাণিজ্যিকীকরণ। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু যখন শিক্ষাকে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, তখন এর মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বা অভিভাবকদের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে কোচিং ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে অভিভাবকদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করা হয় যে, নির্দিষ্ট কোচিং ছাড়া ভালো ফল সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতি শিক্ষাকে প্রতিযোগিতামূলক পণ্যে পরিণত করে। অথচ শিক্ষা হওয়া উচিত সুযোগের সমতা তৈরির মাধ্যম।এই সংকটের সমাধান শুধু কোচিং বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনা প্রয়োজন।প্রথমত, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে।

 

শ্রেণিকক্ষকে এমন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সেখানে শেখার আগ্রহ পায়। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কতটা বুঝেছে, কতটা প্রয়োগ করতে পারছেÑসেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে।তৃতীয়ত, অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী উৎসাহ দিতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকা-ের সুযোগ বাড়াতে হবে।

 

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের ওপর। তাই শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়; বরং চিন্তাশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা।প্রাইভেট ও কোচিং প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তা যেন শিক্ষার বিকল্প না হয়ে ওঠে। শিক্ষার মূল কেন্দ্র হতে হবে বিদ্যালয়, আর মূল লক্ষ্য হতে হবে জ্ঞান ও মানবিকতার বিকাশ।আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর হাতে শুধু বই নয়, একটি ভবিষ্যৎও তুলে দেওয়া হচ্ছে।

 

সেই ভবিষ্যৎকে যদি আমরা শুধু পরীক্ষার খাতা ও নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করি, তাহলে আমরা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাব। প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়Ñআমরা কি সত্যিই শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় সফল হওয়ার যন্ত্র তৈরি করছি?উত্তর খুঁজতে হবে এখনই। কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মাতা। তাদের কাঁধে শুধু বইয়ের বোঝা নয়, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার আলোও তুলে দিতে হবে।

লেখক-সংবাদ কর্মী