রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

পশ্চিম তীরে মার্কিন আইনপ্রণেতাকে বন্দুকের নলের মুখে আটকে রাখলো ইসরায়েলি সেটেলাররা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩৪ অপরাহ্ণ
পশ্চিম তীরে মার্কিন আইনপ্রণেতাকে বন্দুকের নলের মুখে আটকে রাখলো ইসরায়েলি সেটেলাররা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র সশরীরে দেখতে গিয়ে চরম হেনস্তার শিকার হয়েছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য রো খান্না। ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের খোঁজখবর নেওয়ার সময় আমেরিকার তৈরি অস্ত্রধারী ইসরায়েলি সেটলাররা তাকে বন্দুকের নলের মুখে আটকে রাখে।

ক্যালিফোর্নিয়ার প্রগতিশীল এই আইনপ্রণেতা শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, আমার ফিলিস্তিন সফরের সময় আমেরিকার তৈরি এম-৪ রাইফেল উঁচিয়ে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা আমাকে এবং অন্য আমেরিকানদের আটকে রাখে।

তিনি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দিকে ইঙ্গিত করে আরও বলেন, যখন আইডিএফ (ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস) সেখানে পৌঁছায়, তারা বসতি স্থাপনকারীদের পক্ষ নেয় এবং আমাদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখে।

এই আচরণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা একটি মস্ত বড় ভুল করেছে।

রো খান্না পশ্চিম তীরের খিরবেত জানুতা নামের একটি ফিলিস্তিনি গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানকার বাসিন্দারা ইসরায়েলি সেটেলারদের হাতে জাতিগত নিধনের শিকার হয়েছেন। উগ্রপন্থি সেটেলারররা ওই গ্রামের স্কুল পুড়িয়ে দিয়েছে, ঘরবাড়ি লুটপাট করেছে, রাইফেল ও পাথর দিয়ে বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এছাড়া তারা জানালার কাচ ও সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ভেঙে ফেলা, পানির ট্যাংক খালি করা এবং ফসলি জমিতে অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ফেলার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে রো খান্না বলেন, আমরা এমন একটি গ্রামে ছিলাম যা ইসরায়েলি সেটেলাররা ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা সেখানকার স্কুল এবং পুরো গ্রামটিই ধ্বংস করে দিয়েছে, আমরা কেবল তা দেখছিলাম। ঠিক তখনই আমেরিকার তৈরি এম-৪ মেশিনগান হাতে একদল গুন্ডা এসে আমাদের রাস্তা অবরোধ করে আটকে রাখে। এরপর তারা আইডিএফ-কে ডাকে এবং আইডিএফ আমেরিকানদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো ওই গুন্ডাদের পক্ষ নেয়।

কংগ্রেস সদস্য খান্নার সঙ্গে সফররত তার সহকারী ক্যামেরন কাস্কি জানিয়েছেন, সেটেলাররা এই প্রতিনিধিদলটিকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আটকে রেখেছিল। এই পরিস্থিতিতে তারা সাহায্যের জন্য জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে বারবার যোগাযোগ করেন। কাস্কি জানান, অবশেষে ইসরায়েলি পুলিশ কর্মকর্তারা এসে হস্তক্ষেপ করেন এবং তাদের মুক্তি নিশ্চিত করেন।

তবে কট্টর ইসরায়েলপন্থি মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই মার্কিন প্রতিনিধিদলের পক্ষে কোনও হস্তক্ষেপ করেছিলেন কিনা বা তাদের সঙ্গে হওয়া এমন আচরণের কোনও প্রতিবাদ জানিয়েছেন কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী খিরবেত জানুতার কাছে সেটেলারদের দ্বারা গাড়ি আটকে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও দাবি করেছে যে, তাদের বাহিনীই এই সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছে।

উল্লেখ্য, ইসরায়েল প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পায়। এই সহায়তার অর্থ দিয়েই মার্কিন প্রযুক্তির এম-৪ রাইফেলের মতো অস্ত্র কেনা হয়, যা এখন ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইসরায়েলি সেটেলারদের হাতে দেখা যাচ্ছে।

গাজায় চলমান গণহত্যা এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বর্ণবাদী নীতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে ধসে পড়েছে। রয়টার্স/ইপসোস-এর সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতার হার ২০১৮ সালের ৫৯ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে চলতি বছরের মে মাসে মাত্র ২২ শতাংশে নেমে এসেছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

Ads small one

সুন্দরবনে বাঘিনীর প্রত্যাবর্তন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের নতুন আশাবাদ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ১০:৪৫ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনে বাঘিনীর প্রত্যাবর্তন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের নতুন আশাবাদ

সম্পাদকীয়

আমাদের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে। প্রায় ছয় মাস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করার পর, নিবিড় চিকিৎসা ও পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে অবশেষে সুন্দরবনে ফিরছে গুরুতর আহত একটি রয়েল বেঙ্গল বাঘিনী। রোববার বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে বাঘিনীটিকে তার চিরচেনা প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো গুরুতর আহত বাঘকে উদ্ধার করে, দীর্ঘমেয়াদি ও আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার এমন সফল উদ্যোগ নেওয়া হলো। এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে দেশের বন্য প্রাণী সুরক্ষায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সবার জন্য এক বিরাট সাফল্য এবং বড় অনুপ্রেরণা।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা অবৈধ ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়েছিল প্রায় ১০ বছর বয়সী এই বাঘিনীটি। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় তার সামনের বাঁ পায়ের চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন বিভাগ সময়মতো উদ্ধার না করলে হয়তো সুন্দরবনের এই অমূল্য সম্পদটি আমাদের হারাতে হতো। উদ্ধার পরবর্তী সময়ে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চলে তার জীবন বাঁচানোর লড়াই। অস্ত্রোপচার, নিয়মিত ড্রেসিং ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর বাঘিনীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ এবং প্রাকৃতিকভাবে শিকার করতে সক্ষম।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি প্রমাণ করে যে সঠিক সময়ে উদ্ধার, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহায়তা থাকলে সংকটাপন্ন বন্য প্রাণীকেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের দক্ষতা ও বন বিভাগের আন্তরিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সুন্দরবনের মতো একটি সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভূমিকা অপরিসীম। একটি বাঘিনীকে সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়া মানে কেবল একটি প্রাণীর জীবন রক্ষা করা নয়, বরং সুন্দরবনের বংশবৃদ্ধির ধারা ও বাস্তুতন্ত্রকে আরও সুসংহত করা।

তবে এই আনন্দের খবরের সমান্তরালে যে অন্ধকার দিকটি আমাদের ভাবিয়ে তোলে, তা হলো সুন্দরবনে শিকারিদের পেতে রাখা অবৈধ ছিটকা ফাঁদ। জাতীয় পশু হিসেবে বাঘ যেখানে আমাদের গর্ব, সেখানে বনের ভেতরে অবাধে ফাঁদ পেতে বাঘ বা হরিণ শিকারের এই অপচেষ্টা অত্যন্ত উদ্বেগের। আজ বন বিভাগের আন্তরিকতায় এই বাঘিনীটি রক্ষা পেলেও, নজরদারির অভাবে কত বন্য প্রাণী নীরবে-নিভৃতে প্রাণ হারাচ্ছে, তার হিসাব আমাদের জানা নেই।

আমরা বাঘিনীটির এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাই এবং আশা করি বন বিভাগ তার অবমুক্তির পর উপযুক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে টহল ব্যবস্থা জোরদার, অবৈধ শিকারিদের দমন এবং বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বন্য প্রাণী রক্ষায় এই ধরনের সফল চিকিৎসার অবকাঠামো আরও জোরদার করা প্রয়োজন। সুন্দরবনকে বন্য প্রাণীদের জন্য একটি নিরাপদ ও শঙ্কাহীন অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তবেই এই ধরনের সাফল্যের প্রকৃত সার্থকতা আসবে।

 

মানুষ: সহমর্মিতার সংকটে মানবিক সমাজে অগ্রসর হই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ১০:৪০ অপরাহ্ণ
মানুষ: সহমর্মিতার সংকটে মানবিক সমাজে অগ্রসর হই

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় কী? তার অর্থ-বিত্ত, শিক্ষা, পেশা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ক্ষমতা? নাকি তার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে অন্য মানুষের প্রতি তার আচরণে, দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায় এবং মানবিক মূল্যবোধে? সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস বলে, মানুষকে মানুষ করেছে তার সহমর্মিতা। একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর শক্তিই মানুষকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে শিখিয়েছে। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে সেই মানবিক বন্ধন অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

 

আমরা ক্রমেই দর্শক হয়ে উঠছি; কিন্তু প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার পথ যেন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষ যখন হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, তখন সমাজের প্রকৃত চেহারা প্রকাশ পায়। কেউ দূরে দাঁড়িয়ে দেখে, কেউ মন্তব্য করে, কেউ সমালোচনা করে, কেউবা উপহাস করে। আবার কেউ এগিয়ে আসে, হাত ধরে দাঁড় করায়, ধুলো ঝেড়ে দেয় এবং বলেÑ”ভয় পেও না, আমি আছি; আবার শুরু করো।” এই শেষ মানুষটিই প্রকৃত অর্থে মানবিক।কারণ অন্যের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলা সহজ, কিন্তু তার কষ্ট অনুভব করা কঠিন। ভুল খুঁজে বের করা সহজ, কিন্তু ভুলের পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করা কঠিন। একজন মানুষকে বিচার করা সহজ, কিন্তু তাকে পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া কঠিন।

 

আজকের সমাজে এই কঠিন কাজটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।বর্তমান সময়ে আমরা এমন এক সমাজব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি, যেখানে মানুষের সাফল্যকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, তার সংগ্রামকে ততটা মূল্য দেওয়া হয় না। একজন সফল মানুষের পেছনের দীর্ঘ পথচলা, ব্যর্থতার গল্প কিংবা অসংখ্য অদৃশ্য লড়াই অনেক সময় আমাদের চোখে পড়ে না।কেউ পরীক্ষায় ভালো ফল করলে আমরা তাকে প্রশংসা করি, কিন্তু যে শিক্ষার্থী ব্যর্থ হয়ে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়, তার পাশে কতজন দাঁড়াই? কেউ ব্যবসায় সফল হলে তার গল্প শুনি, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করি কতজন?

 

একটি ভুলের জন্য একজন মানুষকে চিরদিনের জন্য ব্যর্থ বলে চিহ্নিত করা আমাদের সামাজিক প্রবণতা হয়ে উঠছে। অথচ ভুল মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর কোনো সফল মানুষই ভুলের বাইরে নন। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগই মানুষকে পরিণত করে। একটি শিশুর দিকে তাকালে আমরা এই সত্য সহজেই বুঝতে পারি। হাঁটতে শেখার সময় একটি শিশু বারবার পড়ে যায়। কিন্তু তাকে নিয়ে কেউ হাসে না। সবাই হাত বাড়িয়ে তাকে দাঁড় করায়।

 

 

কারণ আমরা জানি, পড়ে যাওয়া শেখারই অংশ। কিন্তু বড় হওয়ার পর সেই একই মানুষ যখন জীবনের কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজ অনেক সময় তার প্রতি কঠোর হয়ে ওঠে। এই দ্বৈত আচরণ আমাদের মানবিকতার সংকটকে প্রকাশ করে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাড়িয়েছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।

 

কিন্তু এর পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন এক সংস্কৃতিÑদ্রুত বিচার করার সংস্কৃতি।কেউ কোনো ভুল করলেই মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় মন্তব্য, সমালোচনা ও বিদ্রƒপ। অনেকেই না জেনে, না বুঝে একজন মানুষের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।কিন্তু আমরা ভুলে যাই, একটি পর্দার ওপাশে একজন মানুষ আছেন। তার অনুভূতি আছে, আত্মসম্মান আছে, পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে। একটি কঠোর মন্তব্য হয়তো একজনের কাছে সামান্য বিষয় মনে হতে পারে, কিন্তু যার উদ্দেশে বলা হয়, তার মনে তা গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের অনেক সময় বাস্তব মানবিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমরা একজন মানুষের কষ্টকে অনুভব করার বদলে সেটিকে একটি ঘটনা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।

 

দুর্ঘটনাস্থলে সাহায্যের হাত বাড়ানোর আগে ভিডিও ধারণ করা, বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বদলে ছবি তুলে প্রচার করাÑএসব আচরণ আমাদের ভাবিয়ে তোলে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি মানুষের কষ্টকে সাহায্যের সুযোগ হিসেবে দেখছি, নাকি দর্শকের বিনোদন হিসেবে?মানবিকতার প্রথম শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়। একটি শিশু তার বাবা-মায়ের আচরণ দেখে শেখে কীভাবে অন্য মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়।পরিবারে যদি সহানুভূতি, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার পরিবেশ থাকে, তাহলে শিশুর মধ্যেও সেই মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু যদি সে দেখে দুর্বলকে অপমান করা, অন্যকে ছোট করা কিংবা শুধু নিজের সাফল্যের পেছনে ছোটাÑতাহলে তার মধ্যেও একই মানসিকতা তৈরি হতে পারে। বর্তমান সময়ে সন্তানদের ওপর সাফল্যের চাপ বাড়ছে।

 

ভালো ফলাফল, ভালো চাকরি, সামাজিক প্রতিষ্ঠাÑএসব অর্জনের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় তাদের মানসিক বিকাশ ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করা নয়; একজন ভালো মানুষ তৈরি করাও শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। একজন শিক্ষার্থীকে শেখাতে হবেÑপ্রতিযোগিতা করবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়; সফল হবে, কিন্তু অহংকারী হবে না; নিজের জন্য এগোবে, কিন্তু অন্যকে পিছনে ফেলে নয়। সহমর্মিতা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। এর অর্থ হলো একজন মানুষের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা এবং তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। একজন হতাশ মানুষের প্রয়োজন সব সময় বড় কোনো সমাধান নয়; অনেক সময় একটি আন্তরিক বাক্যই তার জীবনে নতুন শক্তি এনে দিতে পারে।

 

“আমি তোমার পাশে আছি”Ñএই কথাটি কখনো কখনো একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্বাস হয়ে ওঠে। আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ বিপদের সময় অসাধারণ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, অসুস্থতা কিংবা সংকটের সময় মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এগুলো প্রমাণ করে, মানবিকতা এখনো আমাদের সমাজের শক্তি। শুধু এটিকে আরও বিস্তৃত করতে হবে।একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।

 

গণমাধ্যমকে মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যের সম্মান রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ প্রজন্মকে মানবিক কাজে সম্পৃক্ত করা জরুরি। রক্তদান, স্বেচ্ছাসেবা, দুর্যোগে সহায়তা কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো উদ্যোগগুলো একটি সহমর্মী সমাজ গড়ে তুলতে পারে। জীবনের কোনো এক সময় প্রত্যেক মানুষই দুর্বল হয়ে পড়ে। আজ যে শক্ত অবস্থানে আছে, কাল তারও সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। তাই অন্যের প্রতি আমাদের আচরণ হওয়া উচিত সেই আচরণ, যা আমরা নিজের জন্য প্রত্যাশা করি।

 

দর্শক হওয়া সহজ। কারণ সেখানে কোনো দায়িত্ব নেই, কোনো ত্যাগ নেই। কিন্তু মানুষ হওয়ার জন্য দরকার সাহসÑঅন্যের কষ্ট অনুভব করার সাহস, পাশে দাঁড়ানোর সাহস এবং একটি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সাহস।পৃথিবী মনে রাখে না কে কতবার অন্যের ভুল ধরেছে। পৃথিবী মনে রাখে কারা অন্ধকার সময়ে আলো জ্বালিয়েছে। তাই আসুন, আমরা শুধু দর্শক না হয়ে মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি। অন্যের পতনে হাসি নয়, তার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি হই। সমালোচনার আগে বোঝার চেষ্টা করি। কারণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে বড় বড় কথায় নয়; গড়ে ওঠে মানুষের ছোট ছোট মানবিক আচরণে।শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়Ñসে কতটা সফল তা নয়, সে কতটা মানবিক। কারণ সবাই দর্শক হতে পারে, কিন্তু সবাই মানুষ হতে পারে না।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

 

আলোর কারিগর : ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩৪ অপরাহ্ণ
আলোর কারিগর : ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

আখলাকুর রহমান

যে মানুষ চব্বিশ ঘণ্টায় বশ মানিয়েছিলেন প্রমত্তা ঝিলাম নদীকে, নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে তাঁকেই হার মানতে হলো একটা ট্রেনের হুইসেলের কাছে, যা তাঁর বধির কান কোনোদিন শুনতেই পায়নি। সাতক্ষীরার বাবুলিয়া বাজারের কুমোরপাড়া পেরোলেই আজও দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষটির স্মৃতিচিহ্ন, জয়মনি শ্রীনাথ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ইটের পাঁজর বেরিয়ে পড়া দেয়ালগুলোর দিকে তাকালে আজ একে নিছক পুরনো একটা স্কুলবাড়ি বলেই মনে হয়, অথচ এর প্রতিটি কোণে মিশে আছে এক মহৎপ্রাণ মানুষের নিঃসঙ্গ দীর্ঘশ্বাস। আমরা আজ ক জনই বা চিনি সেই মানুষটিকে, যিনি নিজের সঞ্চিত সম্পদ ঢেলে দিয়েছিলেন এই জনপদের অবহেলিত সন্তানদের হাতে আলোর মশাল তুলে দিতে? সময়ের নিষ্ঠুর গ্রোতে সাতক্ষীরার বুক থেকেই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়।

১৮৪৭ সালে বাবুলিয়ার এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন এই মানুষটি। কিন্তু তিনি ছিলেন কেবল নামেই জমিদার নন, হৃদয়ের বিচারে ছিলেন এক প্রকৃত মহাজন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন এমন এক অসম্ভবকে সম্ভব করা কারিগর, যাঁর মেধার কাছে হার মেনেছিল প্রকৃতির রুদ্ররূপও। ভারত ও পাকিস্তানের বুক চিরে বয়ে চলা প্রমত্তা ঝিলাম নদীর ওপর যখন একটি ব্রিজ নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছিল, তখন পাহাড়ি ঢল আর উত্তাল গ্রোতের সামনে নতিস্বীকার করেছিলেন বাঘা বাঘা প্রকৌশলীও। অথচ সবাইকে চমকে দিয়ে, প্রকৃতির সেই ভয়াল রূপকে টেক্কা দিয়ে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন সাতক্ষীরার এই কৃতী সন্তান। তাঁর এই অবিশ্বাস্য মেধা আর অসামান্য কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ভূষিত করেছিল রাও সাহেব উপাধিতে।

অথচ ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস। যিনি অন্যের চলার পথ মসৃণ করতে নিজের জীবন উজাড় করে দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের শেষ জীবনের পথটাই হয়ে উঠেছিল ভীষণ কণ্টকাকীর্ণ। মা বাবার স্মৃতিরক্ষার্থে গড়ে তোলা জয়মনি শ্রীনাথ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয়। একদিন এই স্কুলেই ক্লাস নেওয়ার সময় তাঁর কাছে খবর আসে, তাঁর বড় ছেলে আর এই পৃথিবীতে নেই। বুকভাঙা সেই আর্তনাদ ভেতরে চেপে রেখে, ছলছল চোখে তিনি সামনে বসে থাকা ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আজ আমার একটা ছেলে চলে গেছে তো কী হয়েছে, এই যে আমার সামনে শত শত ছেলে বসে আছে, তোমরাই তো আমার সন্তান। এমন হৃদয়ের ঔদার্য ক জন মানুষের মধ্যে দেখা যায়?

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই মহৎ মানুষটি কানে প্রায় কিছুই শুনতে পেতেন না। ১৯১৬ সালের এক অভিশপ্ত দিনে কলকাতার উখড়া স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। পেছন থেকে ধেয়ে আসছিল একটি দ্রুতগামী ট্রেন। চারপাশের মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করে বলছিল, রাও সাহেব থামুন, সরুন। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে সেই বধির কানে পৌঁছায়নি কোনো সতর্কবার্তা। ট্রেনের সেই মরণঘাতী ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে কলকাতার সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। অবশেষে ১৯১৬ সালের ১৭ই মার্চ হাসপাতালের চার দেয়ালের মাঝে চিরতরে নিভে যায় এই প্রদীপ্ত প্রাণ।

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন এক জাদুকরি কর্মবীর, যাঁর দূরদৃষ্টি আর মানবিকতা সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত জনপদে পৌঁছে দিয়েছিল শিক্ষার আলো। অথচ আজ আমাদের নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁর নামটাই ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। আমাদের ঘরের কাছের এই মহামানবকে কি আমরা উপযুক্ত সম্মান দিতে পেরেছি? স্থানীয় পত্রিকার পাতায় আজ এই প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে, যিনি আমাদের গর্ব, তাঁকে কি আমরা হৃদয়ে জায়গা দিতে পেরেছি, নাকি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে দিচ্ছি নিজেদেরই এক সোনালী ইতিহাসকে?