প্রসঙ্গ: বুধহাটা বাজার ও বেতনা নদী ভাঙন
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশের নদীভাঙন শুধু ভৌগোলিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের এক বাস্তব চিত্র। দেশের নদীগুলো যেমন যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র এবং তিস্তা, তেমনি ছোট নদী যেমন বেতনা, কপোতাক্ষ, মরিচচাপ-সবই মানুষের জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। বুধহাটা বাজার সংলগ্ন বেতনা নদীর ভাঙন সেই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এটি শুধু একটি বাজারের সমস্যা নয়, বরং আশাশুনি উপজেলার একাধিক গ্রামের জীবন, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
বুধহাটা বাজার আশাশুনি উপজেলার এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এটি শুধু গ্রামীণ অর্থনীতি চালায় না, বরং আশেপাশের গ্রামের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রও। বাজারের মূল পেশাদারদের মধ্যে রয়েছেন: স্থানীয় কৃষকরা ফসল উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করেন। মুদি, দোকানদার ও হাটবাজারের ব্যবসায়ীরা বাজারের অর্থনীতি চালায়। স্থানীয় পরিবহন ও শ্রমিকরা বাজারের কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বাজারের অর্থনৈতিক চেইন নদীভাঙনের আগে স্থিতিশীল ছিল। দোকানপাট, কৃষি ব্যবসা ও পরিবহন-সবই একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। নদীভাঙনের ফলে এই চেইন ভেঙে যাচ্ছে। বাজার কেবল অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয়; এটি গ্রামের মানুষদের সামাজিক কাঠামোও সংরক্ষণ করে। বন্ধুত্ব, প্রতিবেশিতা ও সামাজিক সমন্বয়, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও মেলামেশা, শিক্ষা ও স্থানীয় সংস্কৃতির বিকাশ, নদীভাঙনের ফলে সামাজিক কাঠামোও বিপন্ন হচ্ছে। পরিবার ছিন্নভিন্ন হচ্ছে, প্রতিবেশী ও বন্ধু হারাচ্ছে।
বেতনা নদী, কপোতাক্ষ নদী ও মরিচচাপ নদী-এই নদীগুলো আশাশুনি উপজেলার মানুষের জীবিকা, পানি সরবরাহ এবং কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বেতনা নদী এবং আশেপাশের নদীসমূহের ভাঙন দীর্ঘদিন ধরে চলমান। ভাঙনের ফলে দেখা যায়:গ্রামের পর গ্রাম নদীতে বিলীন,লক্ষাধিক মানুষ অভিবাসী হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস হচ্ছে। নদী খননের দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যক্রমে মানবসৃষ্ট সমস্যার দেখা মিলেছে।
ম্যাপ অনুযায়ী নদীকে বাহাদুরের দিকে খনন করতে হতো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে খনন করা হয়েছে বুধহাটা বাজার সংলগ্ন অংশে, যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র একটি ইটভাটাকে বাঁচানো। ফলে, নদীর ¯্রােত বিপর্যস্ত হয়েছে এবং বাজার ও আশেপাশের গ্রামের মানুষদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পাউবোর দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও দেখা গেছে স্পষ্ট গাফলিতি: পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যর্থতা: ম্যাপ অনুযায়ী নদী খনন হয়নি বাঁধ, জিওব্যাগ বা ড্রেজিং কার্যকরভাবে করা হয়নি। নদীভাঙনের শিকার মানুষদের পুনর্বাসন হয়নি।
নদীভাঙন ও বাঁধের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ হয়নি। ফলে, শুধু একটি ইটভাটা বাঁচানো হয়েছে, কিন্তু শত শত মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে। নদীভাঙনের প্রভাব গভীর এবং বহুমাত্রিক। পরিবার অস্থায়ীভাবে ছিন্নভিন্ন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশী হারানো, স্থানান্তরের ফলে শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত, অর্থনৈতিক প্রভাব, বসতবাড়ি ও দোকানপাট ধ্বংস কৃষি জমি হারানো, স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত টিনের ঘরে বা অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে বসবাস, প্রিয়জনের কবর রক্ষা করতে না পারার মানসিক চাপ, দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও মানসিক বাংলাদেশে নদীভাঙনের শিকার মানুষদের পুনর্বাসন দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত।
বুধহাটা বাজার এবং আশাশুনি উপজেলার মানুষদের জন্য এটি স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য। নদীভাঙনের শিকার মানুষরা বারবার ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সহায়তার অধিকার চেয়েও পাননি। এতে বোঝা যায়, রাষ্ট্র নদীভাঙনের শিকার মানুষদের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করছে না। বুধহাটা বাজার সংলগ্ন নদীখাননের বাস্তবতা এবং বেতনা নদীর ভাঙনের চিত্র আমাদের শেখাচ্ছে যে: স্বার্থান্বেষণমূলক প্রকল্প মানুষের জীবন বিপন্ন করে। নদীখনন কেবল একটি ইটভাটাকে বাঁচানোর জন্য করা হলে আশেপাশের হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপন্ন হয়।
প্রকৌশলগত ভুল নদীর প্রবাহ ও পরিবেশ বিপর্যস্ত করে। প্রকৃত ম্যাপ অনুযায়ী নদী খনন না হলে ¯্রােত এবং তীর সংরক্ষণ ব্যাহত হয়। মানবিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের অবহেলা। সরকার নদীভাঙার শিকার মানুষদের পুনর্বাসন ও সহায়তা নিশ্চিত করেনি। পুনর্বাসন ও পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা ছাড়া নদীভাঙন সামাজিক দুর্যোগে রূপ নেয়। পরিবার, বন্ধু, জীবনযাত্রা-সবই প্রভাবিত হয়। নদীভাঙনের ক্ষতি কমানোর জন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নদী খনন হবে ম্যাপ অনুযায়ী এবং মানবিকভাবে।
তীর সংরক্ষণ ও বাঁধের মান নিয়ন্ত্রণ। দীর্ঘমেয়াদি মনিটরিং ও সতর্কতা ব্যবস্থা নদীভাঙার শিকার পরিবারকে স্থায়ী আশ্রয় প্রদান।খাদ্য, চিকিৎসা এবং শিক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করা। স্থানান্তরিত মানুষদের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা।নদীভাঙা মানুষের তালিকা তৈরি। পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়।বুধহাটা বাজার এবং বেতনা নদীর ঘটনা শুধু স্থানিক সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও মানবিক দ্বন্দ্বের এক পরীক্ষা ক্ষেত্র।
নদী খনন হবে পরিকল্পিত ও মানবিকভাবে। বুধহাটা বাজারের মানুষদের জীবন ও জীবিকা নিরাপদ হবে। নদীভাঙনের ক্ষতি সীমিত করা সম্ভব। নদীভাঙন থামানো কঠিন, কিন্তু মানবিক ক্ষতি কমানো অসম্ভব নয়-যদি থাকে সদিচ্ছা, পরিকল্পনা এবং দায়বদ্ধতা।
লেখক: সংবাদ কর্মী












