শেখ সিদ্দিকুর রহমান
মওলানা ভাসানী(১৮৮০-১৯৭৬) ছিলেন একাধারে ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তি পুরুষ। তাঁকে “মজলুম জননেতা” বলা হয় কারণ তিনি সারাজীবন শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে লড়াই করেছেন। জন্ম: ১২ ডিসেম্বর ১৮৮০, সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে। শিক্ষা: ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় শিক্ষাগ্রহণ করেন, যা তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দর্শনে গভীর প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক সূচনা: ১৯১৭ সালে খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে পদার্পণ। ১৯৪৯ সালে তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। ঐতিহাসিক অবদান: ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেন এবং বিখ্যাত “ওয়ালাইকুম আসসালাম” বলে বিদায় জানানোর প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
’ভাসানী’ নামকরণের ইতিহাস
তাঁর নামের সাথে ‘ভাসানী’ যুক্ত হওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯২০-এর দশকে আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে বাঙালি কৃষকরা নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন। আব্দুল হামিদ খান সেখানে গিয়ে শোষিত কৃষকদের সংগঠিত করেন এবং তাঁদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন শুরু করেন। ভাসান চরের সেই ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেই জনগণ তাঁকে ভালোবেসে ‘ভাসানী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ’মওলানা’ বনাম ‘মাওলানা’: শব্দতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, বানানে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকলেও এদের প্রায়োগিক ও উৎসগত দিক নিয়ে বিতর্ক ও ভিন্নতা রয়েছে:
মাওলানা: এটি আরবি শব্দ ‘মাওলা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ অভিভাবক, বন্ধু বা নেতা। সাধারণত ইসলামি শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিদের সম্মান জানাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
মওলানা: বাংলায় অনেক সময় উচ্চারণভেদে বা স্থানীয় বানান রীতিতে ‘মাওলানা’ কে ‘মওলানা’ লেখা হয়। তবে আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ক্ষেত্রে ‘মওলানা’ বানানটি বাংলা সাহিত্যে এবং তাঁর ভক্তদের কাছে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও আবেগের রূপ নিয়েছে। অনেকে মনে করেন, তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও কৃষকবান্ধব রাজনীতির কারণে তাঁকে সাধারণ মাদ্রাসার আলেমদের থেকে আলাদা করতে এই বানানটি অধিক জনপ্রিয় হয়েছে।
মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শন ছিল মূলত মজলুম জনমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলামী সমাজতন্ত্রের (রুবুবিয়াত) সংমিশ্রণ। তিনি আজীবন কৃষক-শ্রমিকের পক্ষে আপসহীন সংগ্রাম করেছেন, ক্ষমতার মোহে বিমোহিত না হয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার মতাদর্শ ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, শোষণমুক্ত সমাজ গঠন এবং “হুকুমত-ই-রব্বানীয়া” বা ন্যায়ভিত্তিক সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা।
মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনের মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
মজলুমের অধিকার ও কৃষক আন্দোলন: তার রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ। আসামের ‘লাইন প্রথা’ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত-সর্বত্রই তিনি শোষিত মানুষের পক্ষে আওয়াজ তুলেছেন।
রুবুবিয়াত বা ইসলামী সমাজতন্ত্র: ভাসানী ইসলামের মানবিক ও সাম্যবাদী দিকগুলো নিয়ে “রুবুবিয়াত” দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তার মতে, সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া সম্পদ সবার জন্য সমানভাবে বণ্টিত হওয়া উচিত।
বামপন্থা ও অসাম্প্রদায়িকতা: তিনি চীনের মাওপন্থী কম্যুনিস্ট বা বামধারার রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের মাধ্যমে স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন।
আপসহীন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা: তিনি সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতা এবং শোষণের কঠোর বিরোধী ছিলেন। কাগমারী সম্মেলনে তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে “আসসালামু আলাইকুম” বলে বিচ্ছিন্নতার হুংকার দিয়েছিলেন।
সাধারণ জীবনযাপন: তিনি ক্ষমতার লোভ বর্জন করে সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন। এজন্যই তাকে “মজলুম জননেতা” এবং “লাল মওলানা” বলা হয়।
সারসংক্ষেপে, ভাসানীর দর্শন ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রে জনমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং ধর্ম ও সমাজতন্ত্রের সংমিশ্রণে একটি ন্যায়ভিত্তিক, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
বঙ্গবন্ধু ও মওলানা ভাসানী: সম্পর্ক ও কথোপকথন
মওলানা ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের মতো গভীর, আবার রাজনৈতিকভাবে গুরু-শিষ্যের মতো। বঙ্গবন্ধু মওলানা ভাসানীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং ‘ভাসানী সাহেব’ বা ‘হুজুর’ বলে সম্বোধন করতেন। ১৯৪৯ সালে যখন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়, মওলানা ছিলেন সভাপতি আর শেখ মুজিব ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। মওলানা ভাসানীই তরুণ মুজিবকে রাজনীতির মাঠ পর্যায়ে পরিচিত করতে এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহ দিতেন।
ঐতিহাসিক কিছু কথোপকথন ও ঘটনা:
১. কারাগারে দেখা (১৯৫০-এর দশক): একবার কারাগারে থাকাকালীন মওলানা ভাসানী অনশন করছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ তে লিখেছেন যে, তিনি মওলানাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ করলে মওলানা বলেছিলেন: “মুজিব, মরতে তো একদিন হবেই, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে নয়।”
২. আওয়ামী লীগের কাউন্সিল (১৯৫৫): দল থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ‘আওয়ামী লীগ’ করার সময় মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবের দূরদর্শিতার প্রশংসা করে বলেছিলেন: “মুজিব, তুমি ঠিকই ধরেছো। এই দেশ সবার, এখানে ধর্মের নামে রাজনীতি বেশিদিন চলবে না।”
৩. স্বাধীনতার পর (১৯৭২): বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে ফিরলেন, মওলানা ভাসানী তাঁকে জড়িয়ে ধরে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন: “মুজিব, তুই এসেছিস, এখন আমার মরেও শান্তি।” বঙ্গবন্ধুও সবসময় বলতেন, “হুজুর (ভাসানী) যা বলেন, তার মধ্যে জনগণের মনের কথা থাকে।” যদিও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মাঝেমধ্যে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, কিন্তু একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কখনও ম্লান হয়নি।
মওলানা ভাসানী ছিলেন রাজপথের আপসহীন নেতা, আর বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই আন্দোলনের সার্থক রূপকার। মওলানা ছিলেন আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক শক্তির উৎস, আর বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই শক্তির প্রয়োগকারী। তাঁদের এই রসায়নই বাংলাদেশের মানচিত্র তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
লেখক: কলামিষ্ট ও গবেষক।