কী লিখব, কেন লিখব-সাংবাদিকতায় নয় কি
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সাংবাদিকতার শুরু কোথায়? কলমে, ক্যামেরায়, মাইক্রোফোনেÑনাকি একটি প্রশ্নে? সম্ভবত প্রশ্নেই। কারণ একজন সাংবাদিক যখন কোনো ঘটনা দেখেন, তখন তাঁর সামনে প্রথম যে প্রশ্নটি আসে, সেটি হলোÑকী লিখব? এর পরেই আসা উচিত আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নÑকেন লিখব? কার জন্য লিখব? এই লেখা মানুষের কী কাজে আসবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যত পরিষ্কার, সাংবাদিকতার দায়িত্ববোধও তত শক্তিশালী। প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনা ঘটে। কোথাও রাস্তা ভাঙে, কোথাও খাল দখল হয়, কোথাও কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না, কোথাও সরকারি সেবা নিতে গিয়ে মানুষ হয়রানির শিকার হন।
আবার কোনো কোনো জায়গায় একজন মানুষ নীরবে এমন একটি কাজ করেন, যা সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। সব ঘটনাই সংবাদ নয়। আবার ছোট বলে মনে হওয়া কোনো ঘটনা কখনো কখনো বড় সামাজিক বাস্তবতার দরজা খুলে দিতে পারে। সাংবাদিকের কাজ তাই শুধু ঘটনা খুঁজে বের করা নয়; ঘটনার গুরুত্ব বুঝে নেওয়া। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিককে প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়Ñএই তথ্যটি কি মানুষের জানা প্রয়োজন? এতে কি জনস্বার্থ জড়িত? এর পেছনে কি কোনো বড় সমস্যা আছে? কারও অধিকার কি ক্ষুণœ হচ্ছে? কোনো প্রতিষ্ঠান কি তার দায়িত্ব পালন করছে না? কিংবা এই ঘটনার আড়ালে কি এমন কোনো বাস্তবতা রয়েছে, যা প্রকাশ্যে আসা দরকার? এখানেই সাংবাদিকতা আর নিছক সংবাদ সংগ্রহের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
সংবাদ মানেই শুধু ঘটনা নয়। আমাদের সংবাদচর্চায় একটি প্রবণতা দিন দিন দৃশ্যমান হচ্ছেÑঘটনা ঘটল, ছবি তোলা হলো, দু-একজনের বক্তব্য নেওয়া হলো, তারপর দ্রুত সংবাদ প্রকাশ। এতে সংবাদ হয়তো প্রকাশিত হয়, কিন্তু সাংবাদিকতার কাজ কি শেষ হয়? একটি সড়ক ভেঙে গেছেÑএটি একটি তথ্য। কিন্তু কেন ভাঙল? কতদিন ধরে এমন অবস্থা? সংস্কারের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল কি না? কাজটি কে করেছিল? কাজের মান কেমন ছিল? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী বলছে? এই সড়কের ওপর কত মানুষ নির্ভরশীল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই একটি সাধারণ খবর পরিণত হতে পারে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। অর্থাৎ ঘটনা সংবাদ তৈরি করে, কিন্তু প্রশ্ন সাংবাদিকতাকে গভীরতা দেয়।
সাংবাদিকতার শক্তি এখানেইÑসে দৃশ্যমান ঘটনার আড়ালে থাকা অদৃশ্য কারণটি খুঁজে বের করে। কেউ যদি জানতে চান, সাংবাদিক কেন লেখেনÑএর উত্তর হওয়া উচিত শুধু ‘সংবাদ প্রকাশের জন্য’ নয়। লিখব, কারণ মানুষের জানার অধিকার আছে।লিখব, কারণ কোনো অনিয়মকে অন্ধকারে রেখে দিলে তা আরও বিস্তৃত হতে পারে। লিখব, কারণ যে মানুষটি নিজের কথা বলার সুযোগ পান না, তাঁর কথাও সমাজের জানা দরকার। লিখব, কারণ ক্ষমতাবানদের সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কীভাবে পড়ছে, তা তুলে ধরা গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
লিখব, কারণ কোনো সমস্যার কথা প্রকাশ্যে না এলে তার সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও অনেক সময় তৈরি হয় না। কিন্তু এর পাশাপাশি সাংবাদিককে এটিও মনে রাখতে হবেÑলেখা মানেই কাউকে অভিযুক্ত করা নয়। অভিযোগ সংবাদ হতে পারে, কিন্তু অভিযোগ নিজেই সত্য নয়। তাই একটি অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণ, নথি, প্রত্যক্ষ তথ্য এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যের প্রয়োজন হয়। সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা; রায় দেওয়া নয়। ডিজিটাল যুগ সাংবাদিকতার গতি বাড়িয়েছে। একটি ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে শত শত মানুষ তা দেখে ফেলছেন।
এই বাস্তবতায় সাংবাদিকের ওপর দ্রুত প্রকাশের চাপও বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑআগে প্রকাশ করাই কি সাংবাদিকতার সাফল্য? একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরে সংশোধনী প্রকাশ করলেও আগের ক্ষতি সব সময় পূরণ করা যায় না। তাই ‘সবার আগে’ হওয়ার চেয়ে ‘সঠিক’ হওয়ার প্রতিযোগিতাই সাংবাদিকতার জন্য বেশি জরুরি। একজন পাঠক যখন কোনো সংবাদ পড়েন, তখন তিনি ধরে নেনÑএই তথ্যটি যাচাই করা হয়েছে। সেই আস্থা ভেঙে গেলে শুধু একটি প্রতিবেদনের ক্ষতি হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সংবাদ মাধ্যমের বিশ্বাস যোগ্যতা। সাংবাদিকতার আলোচনায় রাজধানী কেন্দ্রিক সংবাদ অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতার বড় অংশ ছড়িয়ে আছে গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে।
স্থানীয় সাংবাদিকের চোখে যে সমস্যা ধরা পড়ে, সেটিই অনেক সময় বৃহত্তর জাতীয় সমস্যার প্রথম সংকেত। একটি খালের দখল হয়তো প্রথমে স্থানীয় সমস্যা। কিন্তু কয়েক বছর পর সেটিই জলাবদ্ধতা, কৃষি সংকট কিংবা পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। একটি গ্রামের পানির সংকট হয়তো একটি ছোট খবর। কিন্তু তার পেছনে থাকতে পারে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া কিংবা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা। তাই স্থানীয় সাংবাদিকতা কোনোভাবেই ‘ছোট সাংবাদিকতা’ নয়। বরং মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থেকে বাস্তবতা দেখার সুযোগ স্থানীয় সাংবাদিকেরই বেশি। এই প্রশ্নের উত্তরও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সাংবাদিকতা পক্ষ নেবেÑসত্যের পক্ষে, মানুষের অধিকারের পক্ষে, জনস্বার্থের পক্ষে। কিন্তু সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তি, দল, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর মুখপাত্র হতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক দল ভালো কাজ করলে তা সংবাদে আসবে, সমালোচনার মতো কাজ করলে সেটিও সংবাদে আসবে। কোনো সরকারি কর্মকর্তা ভালো উদ্যোগ নিলে তা প্রশংসিত হবে, আবার দায়িত্বে অবহেলা থাকলে প্রশ্নও উঠবে। একই নীতি ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন কিংবা সাংবাদিকÑসবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা আসলে এই নিরপেক্ষতার জায়গাটিকেই শক্তিশালী করে। একজন সাংবাদিকের পরিচয় শুধু তাঁর প্রেস কার্ডে নয়। তাঁর পরিচয় তৈরি হয় দীর্ঘদিনের কাজ দিয়ে।
তিনি কতটা তথ্য যাচাই করেন, কতটা ভারসাম্য রাখেন, ভুল হলে কতটা স্বীকার করেন, মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন এবং ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে একই মাপকাঠি ব্যবহার করেনÑএসবই তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি। আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে যে কেউ নিজের একটি পেজ খুলে সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন। এতে তথ্যপ্রবাহ বেড়েছে, কিন্তু সাংবাদিকতা সহজ হয়ে যায়নি। বরং দায়িত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এখন পাঠকের সামনে তথ্যের অভাব নেই; সমস্যা হলো কোন তথ্যটি বিশ্বাস করবেন। এই জায়গায় একজন পেশাদার সাংবাদিকের প্রয়োজন আরও বেশি।
দিন শেষে একজন সাংবাদিকের নিজের কাছে ফিরে আসা উচিত সেই দুটি প্রশ্নেÑকী লিখলাম? কেন লিখলাম? আরও কয়েকটি প্রশ্ন যোগ করা যায়Ñআমি কি তথ্যটি যাচাই করেছি? যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর বক্তব্য কি নিয়েছি? আমার প্রতিবেদনে কি অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে? এই লেখা কি মানুষের কাজে আসবে? আমি কি কোনো পক্ষের প্রচার করছি, নাকি সত্য তুলে ধরছি? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি সাংবাদিক নিজেই সন্তুষ্টির সঙ্গে দিতে পারেন, তাহলে তাঁর লেখা শুধু একটি সংবাদ থাকবে না; সেটি হয়ে উঠবে জনস্বার্থের দলিল।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সাফল্য পাঠকের প্রশংসা পাওয়া নয়। বরং এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা, যার পর কোনো অনিয়ম বন্ধ হয়, কোনো অবহেলিত মানুষের কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়, কোনো নীতিগত ভুল নিয়ে আলোচনা শুরু হয় কিংবা সমাজের মানুষ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। তাই সাংবাদিকতার আসল শক্তি কলমের কালি নয়, প্রশ্ন করার সাহস এবং সত্য যাচাই করার সততা। ‘কী লিখব’ প্রশ্নটি একজন সাংবাদিককে সংবাদ খুঁজে নিতে সাহায্য করে।
আর ‘কেন লিখব’ প্রশ্নটি তাঁকে মনে করিয়ে দেয়Ñএই পেশা কেবল খবর প্রকাশের জন্য নয়। এটি মানুষের কথা বলার দায়িত্ব। এটি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার দায়িত্ব এটি সত্যকে যাচাই করে সামনে আনার দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয়Ñকতগুলো সংবাদ প্রকাশ করেছি, তা নয়; বরং কতগুলো সত্য মানুষের সামনে দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরতে পেরেছি।
লেখক: সংবাদকর্মী, সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি, সাতক্ষীরা









