সমান অধিকার/ নাসরিন সুলতানা ডেইজি
মুক্তমত
“নারীর সমান অধিকার” নিয়ে অনেকেই লিখেছেন বা লিখেন- বাবার সম্পত্তিতে সমান অধিকার পেলেই নাকি নারী তার সকল অধিকার পাবে। কিন্তু আদৌ কি সেটাই! সমান অধিকারের সংজ্ঞা কি সম্পত্তি দিয়ে নিষ্পত্তি হওয়াকেই কেবল বোঝায়! একজন নারী যেদিন জন্ম নেয় সেদিন থেকেই তার জন্মগ্রহণটাই তো বৈষম্যের স্বীকার হয়।যখন একটা মেয়ে সন্তান এ পৃথিবীতে আসে তখন সংসার ও সমাজের কজন মানুষই আনন্দের সাথে স্বাগত জানায় তাকে!
এমনকি বাবা-মা ও কি একটু হলেও কষ্ট পায় না? মা! সেও মন খারাপ করে। কি অদ্ভুত তাই না! কেন বলুন তো? সে নিজেই তো একটা নারী। তাহলে! প্রশ্ন এখানেই। মা একজন নারী হলেও এ পৃথিবীর মানুষ তাকে এমন মানসিকতা দিয়ে গড়ে তোলে যে সে মনে করে মেয়ে সন্তান জন্ম দেয়া মানে -সে কিছুই অর্জন করল না। মেয়ে মানে আমার মা হিসেবে গর্ব করার আর অধিকার থাকলো না। আর এখান থেকেই শুরু হয় বৈষম্য। মানসিক বৈষম্য থেকেই সৃষ্টি হয় একজন নারীকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করা।
তিনবেলা খাবারের মধ্েয বৈষম্য, পড়াশুনায় বৈষম্য-ছেলে সন্তানকে লেখাপড়া করতে হবেই কিন্তু মেয়ে সন্তান কোন একটা ডিগ্রি নিলেই হবে, কোনমতে একটু স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে বিয়ে দিয়ে বেহেশতের দরজা বাবা মায়ের জন্য নিশ্চিত করা,এ পৃথিবীতে জন্ম নিয়েও নারী নাকি নিজের মতো করে এ পৃথিবী দেখতে পারবে না-তাকে সর্বদাই পর্দার আড়ালে থাকতে হবে( ধর্মীয় বৈষম্য), বেহেশতেও পুরুষদের মতো কোন সুযোগ দেয়া হয়নি যেমন হুর (মৃত্যুর পরেও বৈষম্য), নারীকে বিভিন্ন ফতোয়া দেয়া হয় বেহেশতবাসী হওয়ার জন্য। যেন জোর করে এ পৃথিবীর নারীকে বেহেশতে পাঠাতে হবে। অথচ নিজেরা জান্নাতে যেতে পারবে কিনা প্রশ্ন রয়ে যায়। নারীর জন্ম নাকি কেবল অন্েযর ভোগের জন্য।
নারীর শারীরিক চাহিদা অস্বীকার করার এই যে মানসিকতা,তাকে ভোগ্যপন্য করে তোলার এই যে বৈষম্য এমনকি ‘সতিত্ব’ নামক এক ভয়ঙ্কর শব্দ মেয়েদের ওপর চাপানো যা সবই মেয়েরা নিজেরাও মেনে নিয়েছে। নারীর সমান অধিকার তখনই আসবে যখন একটা মেয়ে সাহিত্য, দর্শন, ধম, সৃষ্টি নিয়ে নিজেরাই উপলব্ধি করতে শিখবে। অন্যের চাপিয়ে দেওয়া চিন্তাকে ধারণ না করবে তখন আসল মুক্তি মিলবে।
মনের যে দাসত্বের শৃঙ্খল আছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই সব সমাধান। তার জন্য পড়াশুনা, নিজের জীবন যাপন নিজের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা, চিন্তাকে প্রসারিত করা, পৃথিবীকে পুরুষের মতো নিজের ও অধিকারের জায়গা মনে করা, এ ভুবনকে নিজের চোখে ও মনে উপলব্ধি করা তা যেন কোনভাবেই পুরুষের সৃষ্টি করা চোখে না হয়, সুখটাকে নিজে অর্জন করতে পারা।
সুখ বলতে মেয়েরা বোঝে কেবলই স্বামীর ভালবাসা কিন্তু আদৌ কি তা কারো কাছ থেকে পাওয়া যায়! এটা তো মন! মনের ওপর কি কারোর কোন নিয়ন্ত্রণ আছে? নারী চাইলেও স্বামীর কাছ থেকে সেটা পাবে না আর এই চাওয়াটাও বোকামি। অনেকে মনে করেন প্রভাবশালী ও ধনবান পিতার মেয়ে সন্তান হলে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভয় করে চলে, অনেকে ভাবেন স্বামী নামকরা ব্যক্তিত্ব হলে সন্তানরা ও সমাজ তাকে মান্য করে। এটা ও এক ধরনের পরনির্ভরশীলতা।
এসব মানসিক বদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসলেই সবকিছু আপনাতেই নিজের অধিকারে চলে আসবে-তা বাবার সম্পত্তি হোক, সুখ হোক, সম্মান হোক এমনকি ধর্মের অধিকারসহ এ জগতের সবই জীবনে এমনিতেই পেয়ে যাবে একজন নারী। আগে আমরা নারীকে অন্েযর ওপর থেকে মানসিক ও আর্থিকসহ সকল নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার মানসিকতা সৃষ্টি করি তখন কারোরই কোন ক্ষমতা থাকবে না তাকে অনৈতিক ও অন্যায় শাসন, শোষণ বা আধিপত্য বিস্তার করার।মোটকথা নিজের পরিচিতি তৈরীই একজন নারীর সকল অধিকার করায়ত্ত করার একমাত্র উপায়।












