সমান কাজের সমান মজুরি: ন্যায়বিচার ন্যায্যদাবি
সাকিবুর রহমান বাবলা
একজন মানুষ নারী না পুরুষ-তার ভিত্তিতে শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। কাজের ধরন, দক্ষতা, দায়িত্ব ও শ্রমের মূল্য যদি সমান হয়, তবে পারিশ্রমিকেও বৈষম্য থাকার কথা নয়। অথচ বাস্তবে বিশ্বের বহু কর্মক্ষেত্রে নারী এখনো পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নারীরা গড়ে পুরুষের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম পারিশ্রমিক পান। এই বাস্তবতা দূর করার আহ্বান জানিয়ে প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক সমান মজুরি দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪/১৪২ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে দিবসটির স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ২০২০ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক সমান মজুরি দিবস পালিত হয়।
সমান মজুরি বলতে শুধু একই ধরনের কাজের জন্য একই টাকা বোঝায় না। সমান মূল্যের কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক-এই নীতিটি আরও বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১০০ নম্বর কনভেনশনে নারী ও পুরুষের সমান মূল্যের কাজের জন্য লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ছাড়া সমান পারিশ্রমিকের নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে এই কনভেনশন অনুমোদন করেছে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এর ৮ নম্বর লক্ষ্যের ৮.৫ নম্বর লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে নারী-পুরুষ সবার জন্য পূর্ণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, শোভন কাজ এবং সমান মূল্যের কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়নও এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সমান মজুরি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, ইউএন উইমেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে। ইকুয়াল পে ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন-এর মাধ্যমে সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য অংশীজনকে সমান মজুরি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। ২৮(১) অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্য না করার কথা বলা হয়েছে। ২৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আবার ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সুযোগের সমতার কথা বলা হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সংবিধানের ২০ অনুচ্ছেদ। সেখানে কর্মকে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে যোগ্যতা ও কাজের ভিত্তিতে পারিশ্রমিকের নীতির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শ্রমের মর্যাদা এবং শ্রমের ন্যায্য মূল্য-দুটিই রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শনের অংশ।
বাংলাদেশ শ্রম আইনেও সমান মজুরির বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। শ্রম আইনের ৩৪৫ ধারায় একই প্রকৃতির বা একই মান বা মূল্যের কাজের জন্য পুরুষ, নারী ও প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের সমান মজুরির নীতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংশোধিত আইনের ৩৪৫ক ধারায় জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, লিঙ্গ পরিচয়, ধর্ম, রাজনৈতিক মতামত, জাতীয়তা, সামাজিক অবস্থান, বংশ বা প্রতিবন্ধিতার কারণে বৈষম্যমূলক আচরণও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে আইন থাকলেই বৈষম্য শেষ হয়ে যায় না। বাস্তব জীবনে অনেক নারী এখনো কৃষিকাজ, দিনমজুরি, গৃহস্থালি শ্রম, পোশাকশিল্প, নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কম মজুরির মুখোমুখি হন। আইএলওর বাংলাদেশের তথ্যেও বিভিন্ন পেশায় নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধানের কথা উঠে এসেছে এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
ধর্মীয় শিক্ষাতেও শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায্য পারিশ্রমিকের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামে শ্রমিকের পাওনা যথাসময়ে পরিশোধের শিক্ষা রয়েছে। কোরআনে মানুষের নিজ নিজ অর্জন ও প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে। খ্রিস্টীয় শিক্ষাতেও শ্রমিক তার পারিশ্রমিকের যোগ্য-এই নীতি স্পষ্ট। সনাতন ধর্মীয় দর্শনেও কর্ম, কর্তব্য ও ন্যায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্মের ভাষা ভিন্ন হলেও শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং মানুষের মর্যাদার বিষয়টি বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষায় গুরুত্ব পেয়েছে।
সমান মজুরি তাই শুধু নারীর অধিকার নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক দায়িত্বের বিষয়। একজন নারী একই যোগ্যতা, সময়, শ্রম ও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে শুধু নারী হওয়ার কারণে তার পারিশ্রমিক কমিয়ে দেওয়া তার শ্রমের মর্যাদাকে ছোট করা। আবার একজন পুরুষকে শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে বেশি পারিশ্রমিক দেওয়াও ন্যায্যতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই পরিবর্তন শুধু সরকার বা আদালতের মাধ্যমে সম্ভব নয়। একজন সচেতন নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারে গৃহস্থালি কাজকে শুধু নারীর দায়িত্ব মনে না করা, কর্মক্ষেত্রে স্বচ্ছ বেতন কাঠামো রাখা, একই কাজের জন্য বৈষম্যমূলক মজুরি না দেওয়া, শ্রমিককে তার অধিকার সম্পর্কে জানানো এবং কোথাও বৈষম্য দেখা গেলে প্রতিবাদ করা-এসবই নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
নিয়োগকর্তাদেরও দায়িত্ব কম নয়। যোগ্যতা ও কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণ, পদোন্নতিতে সমান সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ এবং বেতন কাঠামোয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নারী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্বের সুযোগও বাড়াতে হবে।
সমান মজুরি দিবস আমাদের শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবসের কথা মনে করিয়ে দেয় না; এটি আমাদের চারপাশের শ্রমজীবী মানুষের দিকে নতুন করে তাকাতে শেখায়। একজন কৃষিশ্রমিক নারী, একজন পোশাকশ্রমিক, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, একজন শিক্ষক কিংবা একজন পেশাজীবী-প্রত্যেকের শ্রমের মূল্য আছে। কাজের মূল্য যেন মানুষের লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত না হয়, সেটিই এই দিবসের মূল শিক্ষা।
সমান কাজের সমান মজুরি কোনো দয়া নয়, কোনো অনুগ্রহও নয়-এটি ন্যায়সঙ্গত অধিকার। আইন, সংবিধান, আন্তর্জাতিক শ্রমনীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক নৈতিকতা-সবকিছুর আলোকে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি কর্মসমাজ, যেখানে মানুষ তার পরিচয়ের কারণে নয়, তার কাজের ন্যায্য মূল্য অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। সেই সমাজ গড়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেমন, তেমনি নিয়োগকর্তা, শ্রমিক, পরিবার এবং প্রত্যেক সচেতন নাগরিকেরও।












