সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: আম্ফানের ছয় বছর ও প্রতাপনগরবাসীর দাবি
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা কীভাবে জনজীবনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়, আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের বর্তমান চিত্র তার এক জ্বলন্ত দলিল। ২০২০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এবং পরবর্তী সময়ে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের পর দীর্ঘ ছয় বছর কেটে গেলেও সেখানে ধ্বংসপ্রাপ্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট পুনর্নির্মিত হয়নি। ফলে ইউনিয়নের ৬টি গ্রামের প্রায় ২৮ হাজার মানুষকে আজও প্রতিদিন নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো ও নৌকার ওপর নির্ভর করে চলাচল করতে হচ্ছে। একটি উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য এই চিত্র কেবল অবহেলা নয়, বরং সার্বিক টেকসই উন্নয়ন ভাবনার মারাত্মক ঘাটতিকে স্পষ্ট করে তোলে।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থেকে কুড়িকাহুনিয়া-গড়াইমহল খাল হয়ে কপোতাক্ষ নদের পুরোনো লঞ্চঘাট এবং সনাতনকাটি-নাকনা সংযোগ সড়কের চার কিলোমিটার পথ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর খাদের। যোগাযোগের এমন নজীরবিহীন ভঙ্গুরতার কারণে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, জরুরি মুমূর্ষু রোগী ও বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। একটি জনপদে বছরের পর বছর শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার মৌলিক অধিকার এভাবে যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে না।
এই চরম ভোগান্তির পেছনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (াউবো) মধ্যকার প্রশাসনিক লালফিতার দৌরাত্ম্য ও সমন্বয়হীনতা মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। পাউবোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া কিংবা অনাপত্তিপত্রের (এনওসি) অপেক্ষায় প্রকল্পের কাজ আটকে থাকার যে অজুহাত দেওয়া হচ্ছে, তা দেশের দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের জরুরি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমন্বিত সরকারি উদ্যোগের অভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা বছরের পর বছর স্থবির হয়ে আছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। কেবল ত্রাণ কিংবা অস্থায়ী সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে এই এলাকার স্থায়ী সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। দরকার টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, যেখানে এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত ও জরুরি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতাপনগরের হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের ইতি টানতে কপোতাক্ষ ও গড়াইমহল খালের সংযোগ সড়ক দ্রুত পুনর্নির্মাণ এবং টেকসই কালভার্ট ও সেতু তৈরির কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাতে উপকূলীয় মানুষের মৌলিক যাতায়াত অধিকারকে আর আটকে রাখা সমীচীন হবে না।









