লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই: সাতক্ষীরার নারীদের হাতে বদলাচ্ছে উপকূলের কৃষি
তারিক ইসলাম
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সাতক্ষীরার উপকূলীয় জীবনযাত্রা দিন দিন আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের পাশাপাশি মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততা এ অঞ্চলের প্রচলিত কৃষিকে একসময় প্রায় অনিশ্চিত করে তুলেছিল। বছরের পর বছর লোনাপানির প্রভাবে উর্বর জমিগুলো হারিয়েছে উৎপাদনক্ষমতা। তবে জীবিকার তাগিদ এবং প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার অদম্য প্রচেষ্টা অনেক পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তনের অগ্রভাগে রয়েছেন সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার প্রান্তিক নারীরা।
একসময় উপকূলীয় এলাকার বসতভিটার চারপাশে লবণাক্ততার কারণে চারাগাছ বাঁচিয়ে রাখাই ছিল কঠিন। শাকসবজি তো দূরের কথা, লোনাপানির প্রভাবে অনেক গাছপালাও টিকতে পারত না। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থার প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে নারীরা এখন বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষিপদ্ধতির প্রয়োগ। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, উঁচু বেড তৈরি করে চাষাবাদ, মাচা পদ্ধতি ও মালচিং প্রযুক্তির ব্যবহার লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হচ্ছে। এসব পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত হচ্ছে বেগুন, ঢ্যাঁড়স, লাউ, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর সবজি।
এই উদ্যোগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। যে নারীরা একসময় পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগতেন, তাঁদের অনেকেই এখন বসতভিটার সামান্য জায়গায় সবজি উৎপাদন করে পরিবারের চাহিদা মেটাচ্ছেন। কোনো কোনো পরিবার উদ্বৃত্ত সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করছে। এতে একদিকে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও আত্মনির্ভরশীলতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাঁদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে, সঠিক জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে প্রতিকূল পরিবেশেও কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করা সম্ভব।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় নারীদের এই উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্বাবলম্বিতার উদাহরণ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার (অভিযোজন) একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত। উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই করতে হলে তাঁদের এ উদ্যোগের পরিধি আরও বাড়াতে হবে। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহজ শর্তে ঋণ, মানসম্মত কৃষি উপকরণ, বীজ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি উৎপাদিত সবজি বাজারজাতকরণেও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকৃতির বৈরিতা ও লবণাক্ত মাটির সঙ্গে লড়াই করে সাতক্ষীরার নারীরা যে সবুজ সম্ভাবনার সূচনা করেছেন, তা উপকূলীয় কৃষির জন্য আশাব্যঞ্জক। যথাযথ নীতিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তাঁদের এই উদ্যোগ উপকূলীয় অর্থনীতি, পারিবারিক পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। পত্রদূত অনলাইন এবং পত্রদূত- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)












