আগুনের ক্ষত ও স্তব্ধ ভাষা জয় করেছে নুরজাহানের রং-তুলি
আসাদুজ্জামান সরদার: নুরজাহানের মুখে ভাষা নেই, কানেও শোনে না সে। কিন্তু তার হাতের রং-তুলি কথা বলে। ক্যানভাসে ফুটে ওঠে হৃদয়ের সব না বলা গল্প। সাতক্ষীরা শহরের রাজার বাগান এলাকার এই শিশুটি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর শৈশবের এক ভয়াবহ অগ্নিসন্ত্রাসের ক্ষত জয় করে এখন মেধার স্বাক্ষর রাখছে। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় তার অর্জিত পুরস্কারের সংখ্যা এতই যে, সেগুলো রাখার জন্য বিধবা মা হামিদা বেগমকে আলাদা একটি শোকেস কিনতে হয়েছে।
নুরজাহান সাতক্ষীরা শহরের রাজার বাগান এলাকার মৃত নুরুল গাজী ও হামিদা বেগম দম্পতির সন্তান। তাদের আদি বাড়ি শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা টেংরাখালী গ্রামে। স্বামী মারা যাওয়ার পর ইয়াতিম সন্তানকে নিয়ে মা হামিদা বেগমের জীবনযুদ্ধ শুরু হয়। অন্যের বাড়িতে কাজ করে চলে মা-মেয়ের সংসার। ছোট একটি কুঁড়েঘরে তাঁদের বসবাস।
হামিদা বেগম জানান, পাঁচ বছর আগে যখন নুরজাহানের বয়স মাত্র চার কি পাঁচ, তখন প্রতিবেশী এক দুর্বৃত্ত তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই আগুনে তার পা থেকে কোমর পর্যন্ত ঝলসে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। কিন্তু সেই অসহ্য যন্ত্রণা আর শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বর্তমানে সে সাতক্ষীরা সুইড খাতিমুন্নেছা হানিফ লস্কর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষার্থী।
হামিদা বেগম আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর এই মেয়েটিই আমার সব। ও কথা বলতে পারে না, কিন্তু ওর আঁকা ছবির মধ্যে আমি আমার স্বপ্ন খুঁজে পাই। ওর পুরস্কারগুলো রাখার জায়গা হচ্ছিল না বলে কষ্ট করে একটি শোকেস কিনেছি। ও যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, এটাই আমার চাওয়া।”
স্কুলের প্রধান শিক্ষক এম রফিক বলেন, “নুরজাহান আমাদের স্কুলে আড়াই-তিন বছর ধরে আছে। পড়াশোনার চেয়ে ছবি আঁকা ও নাচে সে অসাধারণ পারদর্শী। ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর বা বাংলা নববর্ষের মতো জাতীয় দিবসগুলোতে জেলা প্রশাসন ও শিশু একাডেমির প্রতিযোগিতায় সে নিয়মিত অংশ নেয় এবং প্রতিবারই পুরস্কার জয় করে। ওর সৃজনশীলতা আমাদের বিস্মিত করে।”
নুরজাহানের এই মেধার প্রশংসা করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী। তিনি বলেন, “চরম প্রতিকূলতা জয় করে নুরজাহান শিল্পের মাধ্যমে নিজেকে মেলে ধরছে। এমন প্রতিভাকে বিকশিত করতে আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত। সঠিক সহযোগিতা পেলে সে দেশের সম্পদে পরিণত হবে।”
শারীরিক ক্ষত আর দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে নুরজাহান এখন এক লড়াকু সত্তার নাম। তার এই স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে সমাজের বিত্তবান ও সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।






