সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: ভেনামি চিংড়ি চাষ ও উপকূলীয় অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশে রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিমায়িত মৎস্য খাত দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাহিদা থাকলেও উচ্চমূল্যের কারণে ভেনামি চিংড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছিলাম। এই প্রেক্ষাপটে গত রবিবার সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো উপকূলীয় জেলাগুলোর জন্য ভেনামি চিংড়ি চাষ এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের বার্তা দিচ্ছে।
সাতক্ষীরাকে বলা হয় দেশের সাদা সোনার রাজধানী। এ জেলার অর্থনীতি অনেকাংশেই চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল। তবে গত কয়েক দশকে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং সনাতন পদ্ধতির কারণে বাগদা চাষে কৃষকেরা বারবার লোকসানের মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ দেশ এখন ভেনামি চাষের দিকে ঝুঁকেছে। কারণ, বাগদার তুলনায় ভেনামির উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি। যেখানে এক হেক্টর জমিতে বাগদা উৎপাদন হয় খুব সামান্য, সেখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে ভেনামির ফলন কয়েক গুণ বেশি পাওয়া সম্ভব।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু যথার্থই বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিংড়ি চাষের বিকল্প নেই। সচিবালয়ের সভায় ‘সেব’-এর খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে কেবল সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না, সাতক্ষীরার প্রান্তিক চাষিদের কাছে এই প্রযুক্তি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পৌঁছানো জরুরি।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত পানি ভেনামি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কিন্তু এই চাষের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগমুক্ত পোনা এবং মানসম্মত ফিডের সহজলভ্যতা। এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উচ্চ প্রযুক্তির এই চাষাবাদ ফলপ্রসূ হবে না।
আমরা মনে করি, ভেনামি চিংড়ি চাষ কেবল একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। সরকারের উচিত দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট ও সহজতর নীতিমালা প্রণয়ন করা, যাতে সাধারণ চাষিরা হয়রানিমুক্তভাবে এই চাষে যুক্ত হতে পারেন। সাতক্ষীরা তথা উপকূলের এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব চিংড়ি বাজারে আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবেÑএমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।












