সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: গভীর সমুদ্রের জেলেদের হাহাকার
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে মৎস্য সম্পদ। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ উপেক্ষা করে যারা আমাদের পাতে রূপচাঁদা, ভোল বা লইট্যার মতো সুস্বাদু মাছ তুলে দেন, সেই মৎস্যজীবীদের জীবনের গল্পটি রূপকথার মতো সুন্দর নয়; বরং তা অভাব, অনিশ্চয়তা আর দাদনের জালে বন্দী। সম্প্রতি সাতক্ষীরার উপকূলীয় জেলেদের জীবনচিত্র নিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা আমাদের নীতিনির্ধারণী মহলের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
সামুদ্রিক মৎস্য বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। উদ্দেশ্য মহৎ-মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। কিন্তু এই মহৎ উদ্দেশ্যের বিপরীতে যে কয়েক লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন, তাদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো অসম্পূর্ণ। সাতক্ষীরা জেলায় নিবন্ধিত ৪৯ হাজার জেলের মধ্যে মাত্র ১২ হাজার ৮৮৯ জন সরকারি খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ) পাচ্ছেন। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, নিবন্ধনের বাইরে রয়েছেন আরও প্রায় লক্ষাধিক জেলে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী নিষেধাজ্ঞার সময়ে কোনো সহায়তা তো পাচ্ছেনই না, উল্টো জীবন কাটাতে হচ্ছে চরম ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে।
জেলেদের সংকটের তিনটি প্রধান দিক লক্ষণীয় তা হলোÑ সরকারিভাবে যে ৭৭.৩৩ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে, বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে তা একটি পরিবারের জন্য সমুদ্রের নোনা জলের মতো সামান্য। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, শুধু চাল দিয়ে সংসার চলে না; এর সঙ্গে তেল, নুন, ডাল ও নগদ অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বছরের পর বছর সাগরে জীবন বাজি রাখলেও লক্ষাধিক জেলের নাম তালিকায় না থাকাটা বড় ধরণের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। এতে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গভীর সমুদ্রের জেলেরা শুধু প্রকৃতির সাথে লড়েন না, তাদের লড়তে হয় দস্যু বাহিনীর সাথেও। মইন বা জাহাঙ্গীর বাহিনীর মতো জলদস্যুদের মুক্তিপণের দাবি উপকূলীয় পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্যে কিছু আশার আলো দেখা গেছে। চালের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের যে প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন মহলে পাঠানো হয়েছে, তার বাস্তবায়ন জরুরি। জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে উপকূলীয় অঞ্চলে ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলা এবং সরকারি পুকুরগুলো ইজারার ক্ষেত্রে জেলে সমিতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তাদের দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব।
মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকার সময়ে জেলেরা যেন অনাহারে না থাকেন এবং তাদের সন্তানদের যেন শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত অনিবন্ধিত জেলেদের তালিকাভুক্ত করে তাদের ডাটাবেজ তৈরি করবে এবং শুধু চাল নয়, বরং ‘পূর্ণাঙ্গ রেশনিং ও সুরক্ষা প্যাকেজ’ প্রবর্তন করবে। উপকূলের এই সাহসী সন্তানদের জীবনের নিরাপত্তা ও অন্নের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে আমাদের বিশাল সমুদ্র জয় বা ‘ব্লু ইকোনমি’র স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।











