সম্পাদকীয়/ আমের দামে ধস ও আম চাষীদের ভাগ্য
oppo_0
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ফল চাষ, যার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে আম। তবে চলতি মৌসুমে শার্শার ঐতিহ্যবাহী বেলতলা আম বাজারের যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাজারে আমের ফলন ভালো হলেও দামের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। হিমসাগর, ল্যাংড়া বা গোবিন্দভোগের মতো প্রিমিয়াম জাতের আম বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা মণ দরে।
যেখানে সার, কীটনাশক, পরিবহন ও শ্রমিকের চড়া মজুরির কারণে উৎপাদন খরচই এর চেয়ে অনেক বেশি, সেখানে এই পানির দরে আম বিক্রি করতে হওয়া চাষীদের পিঠে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়ার শামিল। প্রশ্ন উঠেছে, অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলন কি তবে এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াল?
কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু শার্শা উপজেলাতেই ১ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আমের চাষ হচ্ছে এবং প্রায় পাঁচ হাজার চাষী এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। অথচ মৌসুমের এই ভরা সময়ে বাজারে বাইরের পাইকারদের দেখা নেই।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজার ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও দূরদর্শিতার অভাবই এই সংকটের মূল কারণ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা যেখানে ঈদের আগে প্রতি মণ আম ১৬০০ থেকে ৩৬০০ টাকায় বিক্রির দাবি করছেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কর্মকর্তাদের এই চশমা-পরা আশাবাদ ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব প্রমাণ করে যে, বিপাকগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যকর কোনো উদ্যোগ প্রশাসনের নেই।
বাজার বিশ্লেষক ও কৃষি-সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন, মৌসুমের শুরুতে কিছু অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীর অপরিপক্ক ও কেমিক্যালযুক্ত আম বাজারজাতকরণের ফলে সাধারণ ভোক্তারা আম কেনায় আগ্রহ হারিয়েছেন, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ সৎ চাষীদের। তবে এর চেয়েও বড় সত্য হলো হিমাগারের অভাব এবং সঠিক বিপণন ও পরিবহন চেইনের দুর্বলতা। আম একটি পচনশীল ফল। একে বেশিদিন ধরে রাখা যায় না বিধায় চাষীরা আড়তদারদের সিন্ডিকেট ও কম দামের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। লোকসানের মুখোমুখি হয়ে চাষীরা আম চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, এমনকি অনেকে আমগাছ কেটে ফেলার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আমরা মনে করি, অবিলম্বে বেলতলাসহ স্থানীয় আম বাজারগুলোর অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে। বহিরাগত পাইকারদের আগমন নির্বিঘœ করতে নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি, সরকারি উদ্যোগে প্রান্তিক চাষীদের কাছ থেকে সরাসরি ন্যায্যমূল্যে আম ক্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলে ফল সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপন করা দরকার। কৃষকের ঘাম ও শ্রমের মূল্য এভাবে বাজারে ধূলিসাৎ হতে দেওয়া যায় না; কারণ কৃষক বাঁচলেই বাঁচবে দেশের অর্থনীতি।









