সম্পাদকীয়/জলবায়ু ঝুঁকি ও উন্নয়ন বৈষম্য নিরসনে সাতক্ষীরার ২১ দফা দাবি অবিলম্বে পূরণ হোক
বাংলাদেশকে বলা হয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির আঘাতক্ষেত্র, আর সেই আঘাতের সবচেয়ে তীব্র ও নির্মম শিকার সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল। সিডর, আইলা, আম্পান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক প্রায় প্রতিটি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে এই জনপদ। একদিকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর বেড়িবাঁধ ভাঙনের চিরস্থায়ী আতঙ্ক, অন্যদিকে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও আশঙ্কাজনক হারে লবণাক্ততার বিস্তার—সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা আজ চরম সংকটে। এই বাস্তবতায় গত বুধবার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির ২১ দফা দাবিসম্বলিত স্মারকলিপি পেশের ঘটনাটি কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং এই অঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার এক যৌক্তিক আকুতি।
সাতক্ষীরা জেলাটি দেশের অর্থনীতিতে যে পরিমাণ অবদান রাখে, সেই তুলনায় এখানকার টেকসই উন্নয়নের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। স্মারকলিপিতে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, এই জেলা বছরে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন করে খাদ্য উদ্বৃত্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে রপ্তানিযোগ্য ২৮ হাজার মেট্রিক টন চিংড়িসহ দেড় লাখ মেট্রিক টন মাছ, বিপুল পরিমাণ দুধ, শাকসবজি এবং বিখ্যাত আম ও কুল উৎপাদিত হয় এই মাটিতেই। ভোমরা স্থলবন্দর থেকে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব এবং সুন্দরবনের মৎস্য ও বনজ সম্পদ থেকে রাষ্ট্রীয় কোষে জমা হয় বিপুল অর্থ। অথচ, অর্থনৈতিকভাবে এত অবদান রাখার পরও দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক ধরে এই জেলাটি চরম উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর টেকসই অবকাঠামোর অভাবে সাতক্ষীরার গ্রামীণ কর্মসংস্থান দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। ফলে বাড়ছে দারিদ্র্যের হার, এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ জলবায়ু শরণার্থী হয়ে ভিড় করছেন সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় কিংবা পাড়ি জমাচ্ছেন অন্য জেলায়। একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অঞ্চলের মানুষের জন্য এই বাধ্যবাধকতার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?
নাগরিক কমিটির ২১ দফা দাবির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী প্রস্তাবটি হলোÑসুন্দরবন উপকূলীয় এলাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্যোগপ্রবণ এলাকা’ ঘোষণা করা এবং এই অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘সুন্দরবন উপকূলীয় বোর্ড ও মন্ত্রণালয়’ গঠন করা। আমরা মনে করি, এই অঞ্চলের সংকটের ধরন দেশের মূল ভূখ-ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাই এর জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ এবং একটি ডেডিকেটেড মন্ত্রণালয় থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এ ছাড়া সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত চালু করা, সাতক্ষীরা থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ, এবং ঢাকার সাথে দূরত্ব কমাতে মাওয়া-ভাঙ্গা-নড়াইল-চুকনগর-সাতক্ষীরা সড়ক বাস্তবায়ন করা এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। ভোমরা স্থলবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া এবং বসন্তপুর নদীবন্দর চালু করা গেলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে। একই সাথে এই অঞ্চলের কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার স্থাপন এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরতা কমাতে আইটি পার্ক ও বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা। সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদী-খালের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং কপোতাক্ষ, বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে না আনলে সাতক্ষীরার জলাবদ্ধতা দূর করা অসম্ভব। সামনেই বর্ষা মৌসুম। প্রতি বছর বর্ষা এলেই বেড়িবাঁধ ভাঙন আর জলাবদ্ধতায় মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষেত ভেসে যায়। আমরা আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাতক্ষীরার সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবদান এবং ভৌগোলিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এই ২১ দফা দাবি অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করবেন এবং আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই উপকূলের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। সাতক্ষীরার মানুষকে আর ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হিসেবে দেখতে চায় না দেশ।









